সুকান্তের স্মৃতিতে অনন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি
রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘একটা পাতলা এক্সারসাইজ বুকের পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা এক গোছা কবিতা। শক্ত শক্ত ভারী শব্দ। তার মানে সবাই জানে না। ছন্দে বিলক্ষণ পাকা হাতের ছাপ। খাতাটা আমাদের হাতে হাতে ঘুরতে থাকে। যার কাছে যায় সেই অবাক হয়। বলে, এর পেছনে বড়দের কারো হাত আছে। মনোজ লুকিয়ে লুকিয়ে বেনামীতে কবিতা লেখে নাকি? খাতাটা তার কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি। মনোজ কিন্তু প্রবলভাবে মাথা নেড়ে অস্বীকার করে। বলে, দেখছো না নাম লেখা আছে। ও আমার খুড়তুতো ভাই। ক্লাস এইটে পড়ে। শুনে আমরা বিশ্বাস করিনি। হেদুয়ার ধারে এক চায়ের দোকানে ছিল আমাদের দিন-দুপুরের আড্ডা। মনোজ একদিন সেখানে সটান তার ভাইকে এনে হাজির করে। শরীরে যত্ন নেই। রোগা ময়লা চেহারা। মোটা ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা সলজ্জ হাসি। মুখচোরা হলে কি হয়– তার চোখ দুটো যেন সমস্তক্ষণ ডেকে ডেকে কথা বলছে। যে তার চোখের দিকে তাকাবে সেই বুঝবে এমন কিছু সে দেখতে পাচ্ছে, যা আর কারো চোখে পড়ে না। তাকে দেখলে ভালো না বেসে পারা যায় না। আমরাও তাই সুকান্তকে সেইদিনই ভালোবেসে ফেললাম।’– কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই লেখা থেকে স্পষ্ট প্রথম সাক্ষাতেই সুকান্ত ভট্টাচার্যের নামের অতি সাধারণ এক কিশোরের মাঝে তিনি কাব্যের জগতের এক মহিরুহের ছায়া খুঁজে পেয়েছিলেন। পরে তাঁর অনুমান সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছিল।
খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘কবিও পেয়ে গেছে নতুন যুগ’ লেখার মধ্য দিয়ে সুকান্ত সম্পর্কে এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, ‘লাজুক মুখচোরা বলে সে পরিচিত ছিল, আমি তার ভেতরের হলকা মাঝে মাঝে অনুভব করতাম তার শান্ত-স্বল্প কথায়, তার কবিতায়।’ শুধু তাই নয়, সুকান্ত যে অন্য আট-দশজন কবি থেকে আলাদা হয়ে উঠেবেন, অনবদ্য সৃষ্টিতে জন্মের শতবর্ষ পড়েও প্রাসাঙ্গিক থাকবেন, তার আভাসও মিলেছে সাহিত্য জগতের আরও কয়েকজন কীর্তিমানের কাছ থেকে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘সুকান্ত’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমার যতটুকু পড়াশোনা আছে তাতে আমার মনে হয়েছে যে সাধারণ মানুষের প্রাণের গ্লানি সহজ মর্যাদায় প্রথম বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে সুকান্তের কাব্যে। সাধারণ মানুষের জীবন সমবেদনায় অন্তর্দৃষ্টিতে দেখবার যে শক্তি সুকান্তের কাব্যের প্রতি ছত্রে অনুরণিত হয়েছে, সে শক্তি সুকান্ত লাইব্রেরি বিহারিণী সরস্বতীর কাছে পায়নি, সে শক্তি সুকান্ত লাভ করেছিলেন জীবনের পাঠশালায় যার অধিষ্ঠান মাঠে-গ্রামে, বস্তিতে-মিলে-রাজপথে।’ সুকান্ত ভট্টাচার্যের সম্পর্কে প্রথিতযশা লেখক, সাতিহ্যিকদের কলম থেকে উঠে আসা এমন অনেক জানা-অজানা তথ্য স্থান পেয়েছে ‘সুকান্ত ভট্টাচার্য : জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি’ বইটিতে। এটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন মোরশেদ শফিউল হাসান ও মাইনুর নাহার। যার ভূমিকায় সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পর্কে সেই সত্যিটা তুলে আনা হয়েছে, যা আজও বিস্ময়জাগানিয়া। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘একুশ বছরের আয়ুষ্কালে সাহিত্যচর্চায় জন্য সুকান্ত সময় পেয়েছেছিলেন মাত্র ছয় থেকে সাত বছর। কিন্তু এই অত্যল্প সময়ের সাধনা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। বিশ্বসাহিত্যে এমন উদাহরণ হয়তো দুর্লভ নয়। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় প্রতিভা দ্বিতীয় আরেকজন নেই।’ এ কথার বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে বইয়ে স্থান পাওয়া শতবার্ষিকী স্মরণে সিরাজুল
ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক, সুভাষ দে, সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, মোবাশ্বেরা খানম বশরা, সোহরাব হাসান, ভীষ্মদেব চৌধুরী প্রমুখের লেখা থেকে। এ ছাড়াও বইটিতে পুনর্মুদ্রণ হিসেবে স্থান পেয়েছে সুকান্তকে নিয়ে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, মণীন্দ্র রায়, অরুণ মিত্র, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতাগুচ্ছ। পাশাপাশি স্থান পেয়েছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মুজফ্ফর আহমদ, বিষ্ণু দে, রণেশ দশগুপ্ত, আহমদ শরীফ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আনিসুজ্জামান, আবদুল মান্নান সৈয়দসহ আরও কয়েকজন লেখক, সাহিত্যিকের প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও আলোচনা। এ ছাড়াও আছে আফসান চৌধুরী, মোহীত উল আলম, আবেদীন কাদের ও মাইনুর নাহারের অনূদিত কবিতা। সব মিলিয়ে সুকান্ত ভট্টচার্য ও তাঁর সৃষ্টিকে জানার জন্য এই বইটি পাঠকদের জন্য হয়ে উঠেছে এক অনন্য আয়োজন। v
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি