ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

দূরের সাহিত্য

মানবায়িত জীবনের দ্বন্দ্ব-মধুর চিত্র

মানবায়িত জীবনের দ্বন্দ্ব-মধুর চিত্র
×
×

রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

মঙ্গলকাব্য মধ্যযুগের কবিদের এমন এক সৃষ্টি যেখানে উঠে এসেছে লৌকিক দেবতাদের মাহাত্ম্যকথা। তের থেকে শুরু করে আঠার শতকের কবি ভরতচন্দ্রের কাল পর্যন্ত বঙ্গসাহিত্যে যে বিশেষ শ্রেণীর ধর্ম বিষয়ক যে আখ্যান-কাব্য প্রচলিত ছিল, সেটি মূলত মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত। সৃষ্টিকালীন সময়ে মঙ্গলকাব্যগুলো পুরো বাংলাদেশে দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছিল। এখনও পল্লী অঞ্চলে মঙ্গলকাব্যের কোনো না কোনো দেব-দেবীর ঘটা করে পূজার পাশাপাশি গানে গানে তাদের মহিমাকীর্তন করা হয়ে থাকে। যে কারণে মঙ্গলকাব্যকে মধ্যযুগের বৃহৎ সাহিত্য পরিবারের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই মঙ্গলকাব্যের সঙ্গে লোকসংস্কৃতির যে যোগসূত্রÑ তা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন লেখক শমীমা সুলতানা। আর সেই গবেষণা অভিসন্দর্ভ বই আকারে প্রকাশ পেয়েছে ‘মঙ্গলকাব্যে লোকসংস্কৃতি’ নামে। লেখক তাঁর ‘মঙ্গলকাব্যে লোকসংস্কৃতি’ বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় মঙ্গলকাব্যগুলো এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দেব-মাহাত্ম্য প্রচারের পাশাপাশি বাঙালি জনজীবনের এক অনুদ্ঘাটিত দিকবে আমরা এখানে উন্মোচিত হতে দেখি। দেব-মাহাত্ম্যমূলক কাব্যধারায় মঙ্গলকাব্যেই প্রথম মানবায়িত জীবনের দ্ব›দ্ব-মধুর চিত্র ব্যাপকভাবে পাওয়া যায়, যা সমকালীন সমাজ-বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বিশিষ্ট। বইয়ের ভ‚মিকায় বলা লেখকের এই কথার প্রমাণিত সত্য হয়ে ধরা দেয় মঙ্গলকাব্য পাঠের মধ্যে দিয়ে। 
মঙ্গলকাব্য দৈবমাহাত্ম্য প্রচারের জন্য রচিত হলেও শেষ তাতে মানব মাহাত্ম্যই প্রধান্য অর্জন করেছে। কবিগণ তাদের চোখে দেখা তৎকালীন বাঙালির জীবনকেই উপস্থাপন করেছেন মঙ্গলকাব্যে। এসব কাব্য থেকে বাঙালির জাতীয় জীবনের দিনানুদৈনিক চিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। শিবের দারিদ্র্য-কল্পনায় দরিদ্র গৃহকর্তা ও বাঙালি পিতৃহৃদয়ের উৎকণ্ঠাই প্রকাশ পেয়েছে, শোকাতুর সনকার মাতৃহৃদয়ের নিত্য গৃহাঙ্গন থেকে চÐীমঙ্গলের ফুল্লরা, খুল্লনা, লহনা, ভঁড়–দত্ত, মুরারীশীল দুর্বলা, ধর্মমঙ্গলের লাউসেন, কর্পূর সেন, রঞ্জাবতী, মহামদ পাত্র, কানাড়া, কলিঙ্গা, লখা, মনসামঙ্গলের সনকা, বেহুলা, চাঁদ সদগার, অন্নদামঙ্গলের ঈশ্বর পাটানী, হীরা মালিনী, প্রমুখ চরিত্র সৃষ্টি করা হয়েছে, যাদের চিনে নিতে বাঙালি পাঠকের কোনো অসুবিধা হয় না।
একেকটি কাব্যে লোকউপাদানগুলো কেন এবং কিভাবে ব্যবহৃত হয়েছেÑ সেদিকে নজর দিলে দেখা যায়, মনসামঙ্গল কাব্যে মূলত পূর্ববঙ্গের সর্প-অধ্যুষিত অঙ্গল থেকে উঠে আসা। যে কারণে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনাচার, বিশ্বাস, সংস্কার মনসামঙ্গলে কাবে এক শিল্পিত রূপে লাভ করেছে। উপমা, রূপক, চিত্রকল্প প্রভৃতি অলংকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে কবিগণ চারপাশের পরিচিতি, সুলভ ও অনুপম প্রাকৃতিক উপকরণের আশ্রয় নিয়েছেন। আবার চÐীমঙ্গল কাব্যে জীবন্ত হয়ে উঠেছে নিন্মশ্রেণীর মানুষের অভাব-অনটনের দৈনন্দিন চিত্র। এ কাব্যে ব্যবহৃত উপমা, রূপক, চিত্রকলা, অনুপ্রাস প্রভৃতি অলংকারের প্রয়োগও বাস্তবঘেষাঁ। অন্যদিকে ধর্মমঙ্গল কাব্যের উপমাগুলো গতানুগতিক উপমান ও উপমেয়কে আশ্রয় করে সৃষ্টি করা হয়েছে। ‘মঙ্গলকাব্যে লোকসংস্কৃতি’ বইটিতে কাব্যের এসব উপকরণ নানা উদহারণের মধ্য দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন লেখক। বিবাহ-সংকক্রান্ত লোকবিশ্বাস ও আচার অনুষ্ঠান, ঘটক নিয়োগ, পাত্রী নির্বাচন, গোত্র, বিবাহে পণ, পাকাকথা ও লগ্নপত্র, বিবাহে দিনক্ষণ স্থিরকরণ এবং জ্যোতিষী ও গণকের ভ‚মিকা, বিবাহে নিমন্ত্রণ, অধিবাস, গায়ে হলুদ, মঙ্গল¯œান, মঙ্গলগীত, নান্দীমুখ শ্রাদ্ধ থেকে শুরু করে সহমরণ, সতীদাহ, মৃত্যুজনিত আচার-বিশ্বাস ও সংস্কারসহ লোকসংস্কৃতির নানা উপাদানে কাব্যগুলো কতটা ভরপুর হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট করা হয়েছে।  
‘মঙ্গলকাব্যের লোকসংস্কৃতি : আঙ্গিকগত পর্যালোচনা’-এ লেখক একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন যে, সময়ের ধারাবাহিকতায় সামাজিক প্রবর্র্তনায় মঙ্গলকাব্য একটি বিশেষ ধারায় প্রকাহিত হয়েছিল। প্রায় প্রত্যেক মঙ্গলকাব্যেরই একটি নির্দিষ্ট সাংগাঠনিক প্রবণতা ছিল, যা প্রায় সকল কবি অনুসরণ করেছেন। ফলে এখানে বিষয়ের বিবেচনায় বৈচিত্র্য সৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। পনের শতকে মঙ্গলকাব্যের যে কাঠামো লতরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তারই অসুরসরণ লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কবিদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার স্বাক্ষর থাকলেও মঙ্গলকাব্যের প্রথাগত অবয়ব নির্মাণের প্রবণতা থেকে কেউ বেড়িয়ে আসেননি। 
সব মিলিয়ে ‘মঙ্গলকাব্যে লোকসংস্কৃতি’ বইটি পাঠ করে একটি কথা স্বীকার না করলেই নয়, তাহলোÑ চারটি অধ্যায়ে বিভিক্ত এই বইয়ে লোকসংস্কৃতির সংজ্ঞা, উৎস, বিকাশ থেকে শুরু করে বাংলা কাব্যোর ধারায় মঙ্গলকাব্যের অবস্থান, প্রেক্ষাপট রচনাসহ ‘মনসামঙ্গল’, ‘চÐীমঙ্গল’, ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্যের বিষয় বৈচিত্র এবং প্রধান কবি নিয়ে যে আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে, তা দারুণ ভাবে সমৃদ্ধ করেছে এই বইটিকে। 

আরও পড়ুন

×