ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪-২৫
আলোকের ঝর্ণাধারা
ব্র্যাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪-২৫ এর সম্মানিত ও পুরস্কৃত লেখকবৃন্দের সঙ্গে আয়োজক এবং অতিথিবৃন্দ- ছবি :: মাহবুব হোসেন নবীন
হামিম কামাল
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৮ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
শেষ হয়ে আসছে আশ্বিন মাস, অর্থাৎ আকাশে অশ্বিনী নক্ষত্র তার বিভার সঙ্গে এখনও পৃথিবীর প্রভার যোগ ঘটিয়ে চলেছে। সুতরাং চাঁদ এখনও শারদীয় সুন্দর, বৃষ্টিও তাই। হাওয়ায় সাথিদের ডাক ভেসে আসছে, ভালোবাসার বিনিময়গুলো ঘটেছে অবাধ। এরই ধারাবাহিকতায় বোধ করি আমরা সাহিত্যের প্রতি নিবেদিত একটি সন্ধ্যাকে সার্থক হতে দেখলাম।
বেশ এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। রাস্তা ভিজল, মনও। এই বৃষ্টি বোধ হয় মনকে নরম করতে নেমেছিল। অনুষ্ঠান শুরু হতে ৬টার দেরি হয়নি। যেমনটা কথা ছিল।
স্থানটি বিশেষ। বিগত বেশ ক’টি আসরের মতো এবারও ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার অনুষ্ঠানের জন্য পরিচালক পর্ষদ পাঁচতারকা সোনারগাঁওয়ের দ্বিতীয় বলরুমটি বেছে নিয়েছে। বলরুমে ঢোকার আগে প্রশস্ত, আলোকিত করিডোরে দ্রুত হেঁটে যাওয়ার উপায় কোথায়? ২০১১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত যারা পুরস্কৃত, সম্মানিত, তাদের ছবি অনুক্রমে সাজিয়ে রাখা। ছবির মানুষেরা বাংলাদেশের কিংবদন্তিকুল এবং ভবিষ্যতের কর্ণধার। কিংবদন্তিদের অনেককে আমরা হারিয়েছি। বিগত দুটি বছর ছিল সুজনবিয়োগের বছর। হারানো গুণী সুজনদের প্রত্যেককে পুরস্কৃত করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি পর্ষদ। কিন্তু তাদের পদচারণার আশীর্বাদে অনুষ্ঠান ধন্য হয়েছিল। এ বছর আমরা অনেকের আশীর্বাদবঞ্চিত হয়েছি। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক, সমকালের উপসম্পাদক মাহবুব আজীজ শ্রদ্ধাভরে তাদের কথা স্মরণ করেছেন।
ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কারের আসরটি সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাহিত্য পুরস্কারের আসর। এর ব্যাপ্তি, বৈচিত্র্য, গাম্ভীর্য, উদযাপন সব ক’টি খাত কর্তৃপক্ষ সযত্নে পরিচর্যা করে। এবারও তাই হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সঙ্গে নৃত্যশিল্পী পূজা সেনগুপ্ত ও তার দলের অমন অপূর্ব নৃত্যনাট্য ‘দেখো– দেখো দেখো শুকতারা আঁখি মেলি চায়/ প্রভাতের কিনারায়।/ ডাক দিয়েছে রে, শিউলি ফুলেরে—/ আয় আয় আয়।’ এর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয়। পূজার নৃত্যদল তুরঙ্গমীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপনা পুরো মিলনায়তন আলোকিত করে তোলে। নাচের পর এলেন প্রিয়াঙ্কা গোপ, নজরুলগীতি নিয়ে। শিল্পী তাঁর নিরলস সাধনার ছাপ নজরুলের পাঁচটি গানে রাখলেন। নজরুলের প্রথম গানটিতে প্রিয়াঙ্কা কবিকে এবার নিজের কথায় সরব হতে বললেন। সবার কথা তো অনেক হলো। ‘কবি, সবার কথা কইলে, এবার নিজের কথা কহ।/ (কেন) নিখিল ভুবন অভিমানের আগুন দিয়ে দহ।’ আর শেষ গানে ছিল কোনো এক অনুপমার নাচের কথা, তার মুদ্রা ও মুদ্রাভঙ্গের বিদ্যুৎচ্ছটা। ‘ঐ জল্কে চলে লো কার ঝিয়ারি।/ রূপ চাপে না তার নীল শাড়ি।/ এমন মিঠি বিজলি দিঠি শেখালে তায় কে গো?/ রূপে ডুবু ডুবু রবির রঙ-ভরা ছবির, ছোঁয়াচ লেগেছে গো।’
২
মূলপর্ব হলো শুরু। ক্রম মেনে ২০২৪ সালের বিজয়ীদের নাম ঘোষিত হতে থাকল একে একে। ২০২৪-এ তরুণ সাহিত্যিক হিসেবে ‘জলমাকড়ের নৌকাবাইচ’ কবিতাগ্রন্থের জন্য স্বীকৃত হলেন কবি নিজাম বিশ্বাস। এরপর মননশীল শাখায় শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে পুরস্কৃত হলো ‘বিদ্যাসাগর বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’ গ্রন্থটি, স্বীকৃত হলেন এর লেখক আমাদের সময়ের অন্যতম গবেষক ও ঐতিহাসিক অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। এরপর সৃজনশীল শাখায় শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে ঘোষিত হলো উপন্যাস ‘সময় বহিয়া গেল’-এর নাম। স্বীকৃত হলেন এর লেখক বরেণ্য ঔপন্যাসিক আনোয়ারা সৈয়দ হক। সর্বশেষে, সাহিত্য ও দেশের প্রতি যাঁর আজীবনের অবদান স্মরণ করে, আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করতে পেরে পর্ষদ কৃতজ্ঞ হলো, তিনি সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
এরপর এলো ২০২৫-এর বিজয়ীদের নাম ঘোষণা পর্ব। প্রথমে ঘোষিত হলো শ্রেষ্ঠ তরুণ সাহিত্যিক হিসেবে নির্বাচিত কথাসাহিত্যিক মাহবুব ময়ূখ রিশাদের নাম। ঠিক আগের পর্বের সঙ্গে এখানে একটি ভিন্নতার সৃষ্টি হলো। বিজয়ী এই তরুণ সাহিত্যিক এক অতিদূর সমুদ্রের তীরে, বিশ্বের সর্বদক্ষিণের মহাদেশে অবস্থান করছেন। প্রতিনিধি হিসেবে পুরস্কার নিতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন তাঁর সহধর্মিণী ইফফাত খান রূম্পা। এরপর ঘোষিত হলো মননশীল শাখার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম, আত্মজৈবনিক স্মৃতিকথা–‘পালকের চিহ্নগুলো’ এবং স্বীকৃত হলেন এর লেখক কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান। এরপর উচ্চারিত হলো সৃজনশীল শাখায় শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত গল্পগ্রন্থ ‘মানচিত্র’-এর নাম এবং এরই সূত্রে মঞ্চে এলেন কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার। সব শেষে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদানের জন্য উচ্চারিত হলো সেলিনা হোসেনের নাম।
এই পর্যায়ে একটি অভিনব ঘটনা ঘটে। মঞ্চে তখন উপবিষ্ট ছিলেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ, সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, ব্র্যাংক ব্যাংক লিমিটেডের সহ-প্রধান ফারুক মঈনউদ্দীন, নির্বাহী প্রধান সৈয়দ আবদুল মোমেন, বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। আজীবন সম্মাননা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে নাম ঘোষিত হলো, কিন্তু সেলিনা হোসেন অসুস্থতাবশত মঞ্চে উঠতে পারলেন না। তখন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক উপসম্পাদক মাহবুব আজীজ উপবিষ্ট পর্ষদকে মঞ্চ থেকে নেমে দর্শকের সারিতে উপবিষ্ট সেলিনা হোসেনের কাছে যেতে বিনীত অনুরোধ করলেন। মঞ্চের অতিথিরা নেমে এলেন। উত্তরীয়, সনদ, চেক ও পদক হাতে পৌঁছে গেলেন সেলিনা হোসেনের টেবিলে। জ্বলে উঠল ঝাড়বাতি।
মিলনায়তনপূর্ণ অভ্যাগতরা সবাই দাঁড়িয়ে সেলিনা হোসেনকে অভিবাদন জানালেন। সব মিলিয়ে একটি অনির্বচনীয় মুহূর্ত তৈরি হলো।
যে আলো ছিল মঞ্চের দিকে, সে আলো ঘুরে গেল দর্শক সারিতে এবং সেলিনা হোসেন সেখানে নক্ষত্রপ্রতিম।
৩
সাহিত্য পুরস্কারের ২০২৪ ও ২০২৫ পর্বের আহ্বানে যথাক্রমে ৩৯০ ও ৪৩০টি গ্রন্থ জমা পড়ে। সেখানে থেকে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর মোট চৌত্রিশটি গ্রন্থ বিচারকমণ্ডলীর কাছে পাঠানো হয়। প্রাথমিক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু লেখকের রচনাশক্তিই প্রাসঙ্গিক ছিল না। সেই বিচারে লেখককে অবিসংবাদিত হতে হয়েছে তো বটেই, পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনে তিনি কতখানি সচল, দেশের আইন, ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও জেন্ডার নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাশীলতাও ছিল মানদণ্ড রূপে বিদ্যমান। মূল বিচারকার্যে আন্তর্জাতিক বিচারমান রক্ষার্থে বিচারকমণ্ডলী; আবিদ আনোয়ার, খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, বেগম আকতার
কামাল ও ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সর্বাত্মক চেষ্টা করে গেছেন।
নামগুলো ঘোষণার পর অনুষ্ঠানের মূলপর্ব সমাপ্তিতে গড়ায়। শেষ পর্বে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা ও পরিকল্পনার কথা জানান ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ও লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন। একই ধারণা প্রকাশ করেন অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর সৈয়দ আবদুল মোমেন। বিচারপ্রক্রিয়ার সার্বিক কলা ও কুশলকথা জানান ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। তিনি বিজয়ী গ্রন্থগুলোর বিশেষত্ব নিয়েও খানিক আলাপ করেন। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সমাপনী বক্তব্য রাখেন সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। দর্শকসারিতে উপবিষ্ট যে অতিথিবর্গ অনুষ্ঠানের জ্যোতিকে বহুগুণে বাড়িয়েছেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন ২০২৩ এর আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই, জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সমকালের উপদেষ্টা সম্পাদক ও নাগরিক ঐক্যর সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, প্রকৃতিবিদ ইনাম আল হক, কথাসাহিত্যিক ও মনোচিকিৎসক মোহিত কামাল, কবি বিমল গুহ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, চ্যানেল আইয়ের পরিচালক শাইখ সিরাজ, দৈনিক বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, কথাসাহিত্যিক ও দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকসহ আরও বহু গুণী কবি, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ, রাজনীতিক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ীক ব্যক্তিত্ব। আপ্যায়নপর্বের পর অভ্যাগতরা যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, দায়িত্ব শিথিল হয়ে আসায় ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছিলেন পর্দার পেছনের মানুষেরা। সহকারী সম্পাদক হাসান জাকিরের নেতৃত্বে অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী জ্যৈষ্ঠ সহসম্পাদক, সহসম্পাদকবৃন্দ, মঞ্চের সহযোগিনী, শব্দকুশলীবৃন্দ, সব শেষে “তোমারে সেবিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধুলি”— সেই পরিচারক কর্মীবৃন্দ সামনে এলেন। সাহিত্যিকদের এই পুনর্মিলনীতে সুহৃদের সমাবেশে কারও কারও ভেতর স্বল্প পরিচয়েই গড়ে উঠেছিল বন্ধুতা। তাদের চোখে শিগগির দেখা হওয়ার প্রত্যয় খেলে গেল।