সুর চড়াচ্ছে পাখি, আমরা কি শুনছি?
[ ওপরে বামে] হিমালয়ের স্ত্রী মোনাল, [ডানে] পুরুষ মোনাল এবং নিচে বাংলাদেশের হাওরের পাখি সাম্পান
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
হিমালয়ের ঢালে ভোরের শুরুতে একসময় সবার আগে বাজত মোনালের শিস। এখন তার আগে পৌঁছে যায় গাড়ির হর্ন। পর্যটকের ভিড় আর ইঞ্জিনের গোঙানির ভেতর পাখিটি আর পুরোনো গলায় ডাকছে না। নিজের কথা শোনাতে তাকে সুর চড়াতে হচ্ছে। ভারতের উত্তরাখণ্ডের একদল গবেষক পাঁচ বছর ধরে দুটি আলাদা গবেষণা চালিয়ে এই খবর দিয়েছেন।
প্রশ্নটা তাই আমাদের দিকেও ফেরে। ঢাকার শালিক, হাওরের হাঁস কিংবা সুন্দরবনের প্যারাপাখির জীবনে কী বদলাচ্ছে? খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, আমাদের সামনে চোখে দেখা কিছু অভিজ্ঞতা আছে, গবেষণা প্রায় নেই।
পাহাড়ের রংধনু
মোনাল ফেজান্ট গোত্রের পাখি। ওড়ার চেয়ে মাটিতে চরে বেড়াতেই সে স্বচ্ছন্দ। শক্ত ঠোঁটে ঝরাপাতা খুঁড়ে খোঁজে শিকড়, কন্দ, বীজ আর পোকা। পুরুষ পাখির গায়ে সবুজ, নীল, বেগুনি আর তামাটে রঙের ধাতব ঝিলিক। স্ত্রী পাখি বাদামি আর সাদায় সাদামাটা। নেপালের জাতীয় পাখি সে, নাম ডাঁফে। উত্তরাখণ্ডের রাজ্যপাখিও।
তার চলার গণ্ডি সরু। শীতে নামে নিচের বনে, গরমে ওঠে গাছের সীমা পেরিয়ে উঁচু তৃণভূমিতে। গবেষক দলের প্রধান রাজীব লোচন বিবিসিকে বলেছেন, এ কারণেই মোনালকে বেছে নেওয়া। এমন বাঁধা ঠিকানার পাখি বিপদে পড়লে বুঝতে হবে, আশপাশের অন্য পাখিরাও ভালো নেই।
যন্ত্রে ধরা পড়ল চড়া সুর
গবেষণাটি হয়েছে কেদারনাথ কস্তুরী মৃগ অভয়ারণ্যের দুই উপত্যকায়। চোপতায় সারাবছর পর্যটক আর গাড়ির ভিড়, মদমহেশ্বর তুলনায় নিরিবিলি। হেমবতী নন্দন বহুগুণা গাড়োয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজীব লোচন, দীনেশ কুমার শর্মা ও আনন্দ কুমার ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এক বছর সেখানে রেকর্ডার বসিয়ে রাখেন। জমা হয় মোনালের সাত শতাধিক ডাক।
ফল পরিষ্কার। কোলাহলের চোপতায় মোনাল ডাকছে উঁচু কম্পাঙ্কে, ডাকও ছোট হয়ে এসেছে। গাড়ি আর ভিড়ের শব্দ ভারী, নিচু সুরের। তার নিচে চাপা না পড়তে পাখি নিজের সুর ওপরে তুলছে। বদলটা মানুষের কানে ধরা পড়ার মতো নয়, যন্ত্রে পড়েছে।
রাজীব লোচন সাবধান করেছেন, প্রজাতিটির গলা স্থায়ীভাবে বদলে গেছে বলার সময় আসেনি। তবু স্বস্তির জায়গা কম। ডাকই পাখির ভাষা। এর মধ্য দিয়ে সে সঙ্গী খোঁজে, প্রতিদ্বন্দ্বীকে সীমানা চেনায়। ভাষায় টান পড়লে প্রজননেও টান পড়ে।
ঢাকার পাখির গলাও চাপা
ঢাকার পাখির কপাল এর চেয়ে ভালো নয়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ২০২২ সালের প্রতিবেদনে ঢাকা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শব্দদূষিত শহর, মাত্রা ১১৯ ডেসিবেল। অথচ সহনীয় সীমা পঞ্চাশের ঘরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আশিকুর রহমান সমী বলেন, ‘হর্ন, জেনারেটর আর নির্মাণযন্ত্রের শব্দে পাখির ডাক চাপা পড়ছে। অনেক পাখি চেনা জায়গা ছেড়ে চলে গেছে। কার্জন হলে একসময় যত পাখি দেখতাম, এর বড় অংশ এখন নেই। গাছে ঘেরা জায়গারই যদি এই দশা হয়, বাকি শহরের কথা সহজেই বোঝা যায়।’
বদল কেবল গলায় নয়, বাসাতেও। পিচ আর টাইলসে মাটি ঢেকে যাওয়ায় খড়-ঘাস মেলে না। পাখি বাসা বাঁধছে পলিথিন, সুতলি আর প্লাস্টিকের টুকরায়। সমীর কথায়, ‘শখ করে নয়, বাধ্য হয়ে। প্লাস্টিকের বাসায় গরম আটকে থাকে, সুতায় ছানার পা জড়িয়ে যায়। যে বাসা ছানাকে আগলে রাখার কথা, সেটাই বিপদ হয়ে উঠছে।’ বাসযোগ্য শহরে অন্তত ২০ শতাংশ সবুজ দরকার, ঢাকায় আছে সাড়ে ৮ শতাংশেরও কম।
ওপরে ওঠার শেষ কোথায়
উত্তরাখণ্ডের দ্বিতীয় গবেষণা মোনালের ঠিকানা নিয়ে। জলবায়ু মডেল ধরে উত্তরাখণ্ড ও হিমাচলে পাখিটির বাসযোগ্য এলাকার ভবিষ্যৎ কষা হয়েছে। সব চিত্রেই ২১০০ সাল নাগাদ সেই এলাকা ছোট হবে, অস্থির হবে। বরফ গলে ওপরে ঘাস জন্মাচ্ছে, মোনাল সেদিকে উঠছে। নিচ থেকে ঠেলছে তৃণভূমিতে মানুষের দখল। কিন্তু পাহাড় যত ওপরে তত সরু। জায়গা টুকরো হলে দলগুলোর মেলামেশা কমবে, প্রজনন কমবে।
আইইউসিএনের লাল তালিকায় মোনাল এখনও ‘ন্যূনতম উদ্বেগের’ প্রজাতি। গবেষণা দুটি মনে করিয়ে দেয়, সংখ্যা কমার আগেই একটি প্রাণীর জীবন বদলে যেতে পারে।
খেতে আসা আর সংসার পাতা এক নয়
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক সোজা কথা বলেন, ‘পাখির স্বভাব বদলাচ্ছে কিনা, জিজ্ঞেস করলে বলি, জানি না। এটা বিনয় নয়। এ দেশে এ নিয়ে গবেষণাই হয়নি।’
চোখে দেখা একটা বদল অবশ্য তিনি মানেন। সুন্দরবনের গোশালিক মানুষকে চার-পাঁচ ফুটের মধ্যে ঘেঁষতে দেয় না। শহরের গোশালিক পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও নড়ে না। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে পালানোর দূরত্ব। শহরে সেই দূরত্ব কমেছে, কারণ পাখি মানুষে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এটুকুতে ভরসা নেই। ‘ভাগাড়ের চিল খেতে এসে আমাকে দশ ফুটের মধ্যে আসতে দিচ্ছে। কিন্তু সে কি সেখানে বাসা বাঁধবে? খেতে আসা আর সংসার পাতা এক কথা নয়।’
শকুনের উদাহরণ টানেন তিনি– ‘ডাইক্লোফেনাক যে শকুন মারছে, সেটা নিশ্চিত জানা গিয়েছিল বলেই ওষুধটি নিষিদ্ধ করা গেছে, পতন ঠেকানো গেছে। শত্রুকে চিনেছিলাম বলে লড়াই জিতেছি। প্যারাপাখি কেন কমছে, জানি না। অনুমানে প্রবন্ধ লেখা যায়, বন বাঁচানো যায় না।’ পৃথিবীতে হয়তো তিনশর মতো প্রাপ্তবয়স্ক প্যারাপাখি টিকে আছে, তার বড় অংশ বাংলাদেশের অংশের সুন্দরবনে।
সমীও একই ফাঁকের কথা বলেন। হাতেগোনা তিন-চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাখিবিদ্যা পড়ার সুযোগ আছে। স্বাধীন গবেষকেরা নিজের খরচে মাঠে নামেন, কিন্তু সে কাজ নীতিতে জায়গা পায় না। হতাশ হয়ে অনেকে পেশাই বদলে ফেলেন। বন বিভাগের কাজ আটকে থাকে প্রকল্পের মেয়াদে। প্রকল্প শেষ, কাজও শেষ। অথচ আইইউসিএনের ২০১৫ সালের মূল্যায়নে দেশে ৫৬৬ প্রজাতির পাখির হিসাব মেলে, গত এক শতকে হারিয়েছে ১৯টি। সমী চান প্রকল্পের মেয়াদে না বাঁধা দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, শহরের নকশায় দেশি গাছ আর জলাশয়ের জায়গা, আর শব্দদূষণ আইনের বাস্তব প্রয়োগ।
হাওরেও একই প্রশ্ন
পাহাড়ের জায়গায় হাওর বসালে মোনালের গল্প আমাদের হয়ে যায়। টাঙ্গুয়ার হাওরে কয়েক বছরে শতাধিক হাউসবোট নেমেছে। নিরিবিলি জলায় ঢুকেছে ইঞ্জিনের শব্দ, মাইকের গান। চলতি বছরের আগস্টে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন হাওরের সংকটাপন্ন এলাকায় হাউসবোট চলাচল বন্ধ করেছে। বন্দুক বা বিষটোপ ছাড়াও পাখির ঘর অনিরাপদ হয়। শব্দ আর ভিড় দিয়েও হয়।
উত্তরাখণ্ডের গবেষকরা পর্যটন বন্ধ করতে বলছেন না। পাহাড়ি মানুষের রুটি-রুজি পর্যটনে বাঁধা, হাওরের মাঝির সংসারও তাই। প্রশ্ন হলো, একটি জায়গা কতটা ভিড় আর শব্দ সইতে পারে, সেই হিসাব কেউ করছে কিনা।
আইপিসিসির প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক অঞ্জল প্রকাশ বলেছেন, মোনালের ডাকে কান পাতলে শোনা যায়, হিমালয় একটু জায়গা, একটু নীরবতা আর একটু যত্ন চাইছে। আমাদের হাওর, চর আর বনও একই কথা বলছে। শুধু তাদের গলা এখনও আমাদের কোলাহল ছাপিয়ে উঠতে পারেনি।
- বিষয় :
- পাখি