শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির কথা বলা
নাগরিক নাট্যাঙ্গনের নাটক ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’
অপূর্ব কুমার কুন্ডু
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:২৪
ঝরনার জলধারার স্বাভাবিকতা তার প্রবহমানতায়। অসংখ্য খাল-বিল, নদী-নালা পেরিয়ে সমুদ্রে অবগাহনেই তার তৃপ্তি এবং মুক্তি। কিন্তু পাথরের প্রতিবন্ধকতায় চলতি পথ যদি হয় রুদ্ধ, মানবসৃষ্ট যান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতায় প্রবহমানতা যদি হয় আবদ্ধ, তবে ঝরনার অবদমিত বেঁচে থাকা প্রকৃতিবিরুদ্ধ এবং মুক্তির পথ যদি খুঁজে নিতে হয়–সে ক্ষেত্রে সংঘর্ষ অনিবার্য।
অনিবার্যের এ সাদৃশ্য মানবজীবনের প্রেক্ষাপটে চার্লি চ্যাপলিন দেখিয়েছেন ‘মডার্ন টাইমস’ চলচ্চিত্রে। আর্থিক অনিশ্চয়তা, যান্ত্রিক নিষ্পেষণ আর পুঁজিবাদের আগ্রাসনে ব্যক্তি মানুষ পরিণত হচ্ছেন একেকটি রোবটে। এ রোবটিক যান্ত্রিকজীবন যে শেষ পর্যন্ত মানবজীবনের লক্ষ্য-অভিমুখ কিংবা পরিণতি হতে পারে না; বরং অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও মানুষকে যে বাঁচতে হয় উৎকর্ষে, স্বাচ্ছন্দ্যে এবং মুক্তির বাতাবরণে–তার মর্মবাণী উচ্চারিত হয় চার্লি চ্যাপলিনের ‘মডার্ন টাইমস’-এ। অনেকটা সেই বিশ্বজনীন মুক্তির বার্তা উচ্চারণের মহৎ আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ল্যাসিক সাহিত্য ‘দুই পাখি’ কবিতা ও ‘রক্তকরবী’ নাটককে আশ্রয় করে, মুক্তি ও স্বাধীনতার সংশয় পেরিয়ে সমাধানের পথপরিক্রমার মঞ্চনাটক সৃজন এবং মঞ্চায়ন করেছেন নাগরিক নাট্যাঙ্গনের ভরকেন্দ্র অভিনেত্রী-নাট্যকার-নির্দেশক ষড়ৈশ্বর্য লাকী ইনাম। সম্প্রতি তাঁর নির্দেশিত, নাগরিক নাট্যাঙ্গন প্রযোজিত দলের ২৮তম প্রযোজনা ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’-এর উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হলো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল হলে।
প্রযোজনাটিতে দুই পাখি আছে, ‘রক্তকরবী’ আছে, আছে সূত্রধরের কথা তথা লাকী ইনামের শৈল্পিক দর্শন। ফলে বনের পাখির সান্নিধ্যে সোনার খাঁচায় আবদ্ধ পাখির উড়বার শক্তি হারিয়ে উড়তে পারবে কি পারবে না–এই দোদুল্যমানতা, ‘রক্তকরবী’ নাটকে দ্রোহের মধ্য দিয়ে যক্ষপুরীর রাজাকে অবমুক্ত করে নন্দিনীর যে মুক্তির বার্তা ঘোষণা, সেসবকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিটি প্রাণ এবং মানুষের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে তাকে তার মতো করে বাঁচতে দেওয়া, খাঁচা গড়া তথা অবরুদ্ধ করার মানসিকতাকে ভেঙে দেওয়া, মাথা উঁচু করে স্বাধীনভাবে মুক্তির আনন্দে নিজে বাঁচা এবং অপরকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচার যে শৈল্পিক দর্শন, তা নিয়েই নাটক ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’। প্রযোজনায় যেসব বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান, তার মধ্যে মঞ্চকে বিস্তৃতি ও গভীরতায় ব্যবহার করতে পারা অর্থবহ। বিস্তৃতিতে খাঁচাবন্দি পাখিকে পাওয়া যায়, আবার বনসমেত বনের পাখিকেও পাওয়া যায়। যক্ষপুরীর অবরুদ্ধ রাজাকে পাওয়া যায়, খনির শ্রমিকদের পাওয়া যায়, আবার নন্দিনীর মুক্ত বিশ্বকেও পাওয়া যায়। আলো নিজেই যেন থিয়েটার। পাতাল প্রবেশ আছে, স্থলে চলাচল আছে, আবার উড়ে চলবার অবকাশও আছে। কোরিওগ্রাফির ব্যঞ্জনায় মুহুর্মুহু যৌক্তিক দৃশ্য নির্মাণ, দৃশ্যের ভাঙন, দৃশ্যান্তরের অবাধ যাতায়াত আছে। আবহসংগীত সৃজন স্থান-কাল-পাত্রকে সজীব করে, জ্যান্ত করে। সংগীতের গায়কি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মনকে নাড়িয়ে দেয় এবং সে কারণে সুর-তাল-লয়-সংলাপনির্ভর প্রযোজনা দর্শক-শ্রোতার হৃদয়ে মুক্তির আনন্দ পাইয়ে দেয়।
তবে পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যেহেতু মঞ্চজুড়ে অভিনয় করতে হয়েছে, সংলাপ উচ্চারণ করতে হয়েছে এবং দর্শক-শ্রোতা যেহেতু ছিল হলজুড়ে, সেহেতু শব্দযন্ত্র এবং মাইক্রোফোন ব্যবহার যথাযথ হওয়ার নিশ্চয়তা দাবি করে। শিল্পকলায় আলো ভাড়া করতে হয় সব সময় যে নির্দেশকের ডিজাইনের প্রয়োজনে, এমনটা নয়। আলোর ঘাটতি আছে। তেমনি শব্দযন্ত্রের প্রয়োজনমতো উপকরণ আছে কিনা, সেটাও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। দলগত অভিনয়ের বর্তমান ক্ষয়িষ্ণুতার ক্রান্তিকালে অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলা-কুশলীসহ ৩৫ জনের উপস্থাপনায় যথাযথ শব্দযন্ত্রের উপস্থিতি এবং প্রক্ষেপণকারীর দক্ষতা থাকাটা থিয়েটারের অংশীদারিত্বের স্বার্থেই বড় প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্ল্যাসিক সাহিত্যের সংলাপ সব সময় পাহাড়ের মতো ভারী এবং গাম্ভীর্যময় হয়। ধ্যানরূপ নিমগ্নতায় তার রসাস্বাদন। কোনোরকম বিচ্ছিন্নতা এখানে কাম্য নয়। ফলে অভিনেতা-অভিনেত্রীর উচ্চারিত সংলাপ, গায়ক-গায়িকার গায়কি দূর-নিকটে বসা দর্শক-শ্রোতার কাছে সবটুকু শক্তি নিয়ে পৌঁছাবে–এটুকু চাওয়াতো যেতেই পারে।
টিমওয়ার্কের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয় দক্ষতা নিয়ে আলাদা করে লেখা না হলেও নেপথ্য কলাকুশলীর পরিশ্রমকে মূল্যায়ন না করে পারা যায় না। ঠান্ডু রায়হান ও জয়নাল আবেদিন পবনের আলো কথা কয়। বিশ্বজিৎ বাদলের আবহসংগীত মন জুড়ায়। আসমা দেবযানীর কণ্ঠ পুনরায় শুনতে মন চায়। শাওন আকন্দ ও রনি শেখ তরুণের মঞ্চ দর্শকের পছন্দ হয়েছে। পারিশা আফরোজের নৃত্যভঙ্গি এবং সুমন আহমেদের কোরিওগ্রাফি মনকে দোলা দেয়। সুর-তাল-লয়ে মানবমনকে দোলা দিয়ে, মানবমুক্তির, মননের মুক্তির আহ্বানের ডাক দিয়ে যায় ষড়ৈশ্বর্য লাকী ইনামের নাটক ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’।