ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

মাটির নিচে টমের নতুন অভিযান

মাটির নিচে টমের নতুন অভিযান
×
×

‘ডিগার’ সিনেমায় টম ক্রুজ

মীর সামী

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

টম ক্রুজকে পর্দায় দেখলেই দর্শকের চোখ যেন অবধারিতভাবে খুঁজতে থাকে বিপজ্জনক কোনো দৃশ্য। কখন ছুটবে গাড়ি? কখন আকাশ থেকে ঝাঁপ দেবেন তিনি? ‘মিশন: ইম্পসিবল’ কিংবা ‘টপ গান’–দীর্ঘ অভিনয়জীবনে এমন অসংখ্য মুহূর্ত তৈরি করেছেন, যেখানে অভিনেতার চেয়ে তাঁর স্টান্টম্যানসুলভ দুঃসাহসই বেশি আলোচনায় এসেছে। এবার সেই পরিচিত ছক থেকে বেরিয়ে এলেন হলিউডের এই তারকা। তাঁর নতুন সিনেমা ‘ডিগার’-এ নেই অসম্ভব কোনো মিশন, নেই বিশ্বজুড়ে ছুটে বেড়ানো গুপ্তচরের গল্প, নেই চোখ ধাঁধানো মোটরসাইকেল ধাওয়া। এবার তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র গল্প।

অস্কারজয়ী নির্মাতা আলেহান্দ্রো গনজালেস ইনারিতুর ‘ডিগার’ সিনেমায় টম ক্রুজ অভিনয় করেছেন ডিগার রকওয়েল চরিত্রে। তিনি একজন ধনী ও ক্ষমতাবান তেল ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই মানুষটি জানেন কীভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হয়। এবার সেই সাম্রাজ্য বিপদের মুখে। নিজের তৈরি এক বিপর্যয় সামলে উঠতে হবে তাঁকে। একই সঙ্গে রক্ষা করতে হবে সম্পদ, প্রভাব এবং বহুদিন ধরে গড়ে তোলা ক্ষমতার কাঠামোও। তবে ‘ডিগার’-এর আসল চমক চরিত্র কিংবা তার পেশায় নয়, গল্পের ভেতরে। এটি এমন এক আখ্যান, যা প্রথম দেখায় এক রকম মনে হলেও ধীরে ধীরে তার চেহারা বদলে যায়। একটি ঘটনা থেকে আরেকটি ঘটনা, একটি ধারণা থেকে আরেকটি ধারণার দিকে নিয়ে যাবে দর্শককে। গল্পের গতিপথ যত এগোবে, ততই বদলাবে আগের ধারণা। যখন মনে হবে রহস্যের সমাধান বুঝে ফেলেছেন, ঠিক তখনই সামনে আসবে নতুন কোনো মোড়। চিত্রনাট্যের এই বৈশিষ্ট্য শুধু দর্শকদের নয়, অভিনয়শিল্পীদেরও বিস্মিত করেছে। মার্কিন গণমাধ্যমে টম ক্রুজ জানিয়েছেন, চিত্রনাট্যের ২০ থেকে ৩০ পৃষ্ঠা পড়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, গল্পটি হঠাৎ সম্পূর্ণ অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। কাহিনির ভেতরের স্তরগুলো বোঝার জন্য তাঁকে চিত্রনাট্য একাধিকবার পড়তে হয়েছে। তার ওপর নির্মাতা শুরুতে তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, পর্দায় প্রথমে যা দেখা যাবে, গল্প আসলে তা নয়।

টম ক্রুজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য চিত্রনাট্য এসেছে। অ্যাকশন, থ্রিলার, ড্রামা কিংবা সায়েন্স ফিকশন–বিভিন্ন ঘরানায় নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি। কিন্তু ‘ডিগার’-এর মতো কিছু আগে পড়েননি বলেও জানিয়েছেন এই অভিনেতা। ডিগার রকওয়েলকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে প্রথমে টমকে নিজের শরীরী ভাষা বদলাতে হয়েছে। এমনকি মেকআপ ও প্রস্থেটিকের মাধ্যমে চেহারাতে আনতে হয়েছে আমূল পরিবর্তন। শুরুতে প্রতিদিন তাঁর মেকআপে সময় লাগত প্রায় ছয় ঘণ্টা। এত দীর্ঘ সময়ের প্রক্রিয়া কমিয়ে আনার জন্য মেকআপ বিভাগের সঙ্গে কাজ করেন অভিনেতা নিজেই। নিয়মিত অনুশীলন ও সময় ধরে নানা ধরনের কাজের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সেই সময় নামিয়ে আনা হয় এক ঘণ্টারও নিচে। শুধু চরিত্রের চেহারা বদল নয়, সিনেমাটির শুটিং-অভিজ্ঞতাও টম ক্রুজের জন্য ছিল ভিন্ন রকম। ইনারিতুর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অভিনেতাকে নিজের পরিচিত অভিনয়-পদ্ধতির বাইরে যেতে হয়েছে। চরিত্রের শরীরী ভাষা, কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ ও সংলাপ বলার ছন্দ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন তিনি। বিশেষ করে ডিগার রকওয়েলের কণ্ঠস্বর কেমন হবে, কীভাবে একই সংলাপে হাস্যরস, নাটকীয়তা ও আবেগ একসঙ্গে ফুটিয়ে তোলা যায়–এসব নিয়ে আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। চরিত্রটি যেন শুধু কথায় নয়, হাঁটা, দাঁড়ানো, তাকানো কিংবা সামান্য নড়াচড়ার মধ্য দিয়েও নিজের উপস্থিতি জানান দেয়–সেদিকেও ছিল নির্মাতা ও অভিনেতার বিশেষ নজর। 

জানা গেছে, শুটিংয়ের অন্যতম কঠিন ও আলোচিত অংশ ছিল প্রায় ১০ মিনিটের একটি দীর্ঘ মনোলগ। দৃশ্যটি শুধু দীর্ঘ সংলাপের কারণে কঠিন ছিল না; একই সঙ্গে ক্যামেরার গতিবিধি, টম ক্রুজের শরীরী অভিব্যক্তি, চোখের দৃষ্টি, হাত-পায়ের নড়াচড়া এবং সংলাপের গতি–সব নির্দিষ্ট ছন্দে রাখতে হয়েছে। নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক এমানুয়েল লুবেজকির সঙ্গে টম ক্রুজ এই অংশটি নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। দৃশ্যটি চিত্রায়ণের পরে নির্মাতা জানান, এই দৃশ্যের প্রতিটি মুহূর্তের পেছনে ছিল ব্যাপক প্রস্তুতি ও অনুশীলন। ফলে ক্রুজের জন্য এটি শুধু অভিনয়ের পরীক্ষা ছিল না; ক্যামেরার সঙ্গে নিজের সম্পর্ককেও যেন নতুন করে আবিষ্কারের মতো। 

সিনেমাটি ভিস্তাভিশন প্রযুক্তিতে ধারণ করা হয়েছে। ইনারিতু ও লুবেজকি এমনভাবে ক্যামেরা ও লেন্স ব্যবহার করেছেন, যাতে দর্শকের চোখকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে না রেখে পুরো ফ্রেমের ভেতর ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দেওয়া যায়। ক্রুজও এই প্রক্রিয়ায় মুগ্ধ ছিলেন। তাঁর কাছে ভিস্তাভিশনের ক্যামেরায় ফিল্ম চলার শব্দ, পুরোনো ধাঁচের লেন্সের ব্যবহার এবং হাতে তৈরি দৃশ্যের ভিজ্যুয়াল টেক্সচার–সবই ছিল সিনেমা তৈরির বিশেষ অভিজ্ঞতা। আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে পুরোনো চলচ্চিত্র নির্মাণের সেই স্পর্শ তাঁকে আলাদা করে আকৃষ্ট করেছে। ‘ডিগার’ সিনেমার বেশির ভাগ সেটও হাতে তৈরি করা হয়েছিল। দেয়াল, আসবাব, রং, নানা ধরনের বস্তু ও টেক্সচার প্রতিটি উপাদান যেন গল্পকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে, সেদিকেও বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন নির্মাতা। এই জায়গাতে ইনারিতুর সঙ্গে টম ক্রুজের কাজের সম্পর্কটি হয়ে উঠেছিল বিশেষ। দুজনের কাজের ধরন আলাদা হলেও সিনেমা নিয়ে তাদের ভাবনার জায়গায় তৈরি হয়েছিল শক্তিশালী বোঝাপড়া। ইনারিতুর ভাষায়, একই দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজ করতে পারা অনেকটা ভালো দাম্পত্যের মতো–দুজন মানুষ যেন একই দিকে তাকিয়ে আছেন। এই বোঝাপড়ার পেছনে ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি, পারস্পরিক আস্থা এবং প্রতিটি দৃশ্যকে নতুন করে আবিষ্কারের চেষ্টা।

‘ডিগার’ সিনেমাটি তৈরির ধারণা নিয়ে ইনারিতু প্রায় ৯ বছর কাজ করেছেন। গল্পের প্রয়োজনে আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলেও গবেষণা করেছেন তিনি। চিত্রনাট্য একাধিকবার বদলেছে, হয়েছে দীর্ঘ প্রি-প্রোডাকশন। ফলে ক্যামেরা চালুর আগেই চরিত্র ও দৃশ্যের ভাষা নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। এ কারণে ‘ডিগার’-এর শুটিং টম ক্রুজের কাছে কেবল আরেকটি সিনেমায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল না; বরং দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অর্জিত অভিজ্ঞতা নিয়েও নতুন করে শেখার সুযোগ। ৬৪ বছর বয়সেও টম ক্রুজ এমন একটি চরিত্রে নিজেকে ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করেছেন, যেখানে তাঁর চেনা নায়ক নেই। নেই সেই অবধারিত দৌড়, নেই অসম্ভব কোনো স্টান্ট কিংবা পৃথিবী বাঁচানোর মিশন। আছে একজন অদ্ভুত, ক্ষমতাবান, উচ্চাভিলাষী এবং সংকটে পড়া মানুষ। এমন এক মানুষ, যার সাম্রাজ্য যত বড়, বিপদও তত গভীর। সেই বিপদের ভেতর দিয়েই এবার দর্শককে নিয়ে যাবেন টম ক্রুজ পৃথিবীর ওপর দিয়ে নয়, গল্পের আরও গভীরে, মাটির নিচে। 

আরও পড়ুন

×