ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

নৃ-মুখ

সুজলা-সুফলা দেশে ঘৃণার বাড়বাড়ন্ত

সুজলা-সুফলা দেশে ঘৃণার বাড়বাড়ন্ত
×
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৩ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৩

বাংলাদেশ যেন ঘৃণা চাষাবাদের উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর শিকার হচ্ছে কখনও নারী, কখনও ভিন্নধর্মী মানুষ, কখনও সংখ্যাগুরু মানুষের ধর্ম ইসলামেরই তুলনামূলক নরমপন্থি ধারা মাজার-দরগার অনুসারীরা। এই ঘৃণার প্রকাশ ঘটানো হচ্ছে মব সহিংসতার মাধ্যমে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর ইমান-আকিদা রক্ষা কমিটির ব্যানারে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’র কবর, বাড়ি ও দরবার শরিফে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর পরের ঘটনা আরও ভয়াবহ। কিছুদিন আগে মারা যাওয়া নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে সেই হামলাকারীরা। 

বাংলাদেশে গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে মাজার-দরগা ভাঙাভাঙির এক প্রকার মহোৎসব চলছে। গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগ দরবার শরিফে হামলা ও আগুন দেওয়া হয়। তার পর থেকেই একের পর এক আক্রান্ত হতে থাকেন মাজারপন্থিরা এবং দেশের আরও কিছু মাজারে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পাশাপাশি বহু মাজারে গানবাজনাও বন্ধ করে দেওয়া হয়, যদিও গানবাজনা মাজারপন্থিদের প্রার্থনার অন্যতম মাধ্যম। গাজীপুরে একটি মাজার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এ সময়ে। 

মৃত ব্যক্তির লাশ তুলে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা এই প্রথম হলেও ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় বুড়িমারী স্থলবন্দরে একটি মসজিদে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল শহীদুন্নবী জুয়েলকে। এরও আগে ২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সাধনপুর গ্রামের শীলপাড়ায় সংখ্যালঘু পরিবারের ১১ জনকে ঘরে আটকে বাইরে থেকে তালা দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তবে এমন ধর্মীয় ‘বাড়াবাড়ি’ ও ‘উন্মাদনা’ সাম্প্রতিক সময়ে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম পাঁচ মাসেই ভাঙা হয়েছে ৪০টি মাজার। কারও কারও মতে, এ সংখ্যা ইতোমধ্যে ১০০ ছাড়িয়েছে।

লোকসংস্কৃতির গবেষকদের দাবি, সারাদেশে তিন হাজারেরও বেশি মাজার রয়েছে। বহু মাজার কয়েকশ বছর ধরে আছে। এই ভূখণ্ডে পীর, সুফি, দরবেশ, আউলিয়াদের কেন্দ্র করে যে জ্ঞানভান্ডার গড়ে উঠেছে, তা পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক জ্ঞানের বিপরীতে প্রাচ্যকে হাজির করার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে। বাংলাদেশসহ এ উপমহাদেশের সুফি সাধকরা পাশ্চাত্যের জ্ঞানকাণ্ডে এক ভিন্ন ধারার অভিঘাত তৈরি করেছেন, যা আমাদের সম্পদ। বাংলাদেশের সৌন্দর্য এটাই যে, এ দেশের সাধারণ মানুষ অসাম্প্রদায়িক। তারা অনেকেই সমন্বয়বাদী। এই মাজার-দরগা-আখড়া বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মিলনের জায়গা। আমাদের সমাজের বুনট তৈরির ক্ষেত্রে এগুলোর অবদান বিশাল, যা নষ্ট হলে আজকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান যে দুর্দশায় পড়েছে, আমাদেরও সেই নিয়তি বরণ করতে হবে।

প্রশ্ন হতে পারে, সরকার কী করছে? আমরা দেখেছি, গত এক বছরে বিশেষ করে ঘটনা ঘটার পরই এর ‘নিন্দা’ জানিয়ে সরকারের ‘ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ জাতীয় বিবৃতি হাজির হয়। গোয়ালন্দের ঘটনাতেও সরকার নিন্দা প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে। 

সামাজিক মাধ্যমে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় দেখে ঘটনার কয়েকদিন পর সরকার কিছু অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে বটে। কিন্তু গোয়ালন্দে তো সেই দিনের ঘটনা হুট করে ঘটেনি। আগের কয়েকদিন ধরে সেটির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। সরকার কি তা ঠেকাতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েছিল? নিলে তো ওই জঘন্য ঘটনা ঘটতই না। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের মধ্যস্থতায় এটি নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক ও আলোচনা হলেও বিষয়টি কার্যত কথিত ‘তৌহিদি জনতার’ ওপরেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। 

ঘৃণা ও সহিংসতা প্রত্যাখ্যান করে ঐক্যবদ্ধভাবে ন্যায়বিচার ও মানবতার আদর্শকে সমুন্নত রাখার জন্য সকল নাগরিককে সচেষ্ট থাকতে বলছে সরকার। কিন্তু ঘৃণা ও সহিংসতা দূর করার জন্য বিবৃতি বাদে সরকারের পক্ষ থেকে কী কী করা হয়েছে? কার্যত কিছুই করেনি তারা। 

লক্ষণীয়, সেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন স্থাপনা এবং মাজার ভাঙার কাজটি প্রায় সর্বক্ষেত্রে ঘোষণা দিয়ে করা হয়েছে। কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে, প্রস্তুতি নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।

অনেক জায়গায় একটি আক্রমণেই ঘৃণার প্রকাশ শেষ হয়নি। এ সময়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘৃণার এতটাই বাম্পার ফলন ফলেছে; বহু স্থাপনায় দফায় দফায় আক্রমণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রায় সব বিষয়ে সরকার ছিল চুপ। সরকার এসব বিষয়ে কখনও তাদের দায় স্বীকার করেনি। বরং বিভিন্নভাবে ‘তৌহিদি জনতা’, বিক্ষুব্ধ জনতা, প্রেশার গ্রুপ, জনরোষ হিসেবে হাজির করে সহিংসতার বৈধতা দিয়েছে এবং নিজেকে দায়মুক্তি ‘বিবৃতি’র ঘেরাটোপে বন্দি করেছে। 

কখনও নিশ্চুপ থেকে, কখনও বিবৃতি দিয়ে, কখনও হালকা ‘বকে’ দিয়ে সরকার ঘৃণা ফেরি করা মবকে সহিংসতা চালিয়ে যেতে ‘অনিচ্ছাকৃত’ভাবেই আশকারা দিয়েছে। একে যদি ঘৃণা চাষাবাদে সার দিয়ে দ্রুত ঘৃণার ফসল ফলাতে সহায়তা করা বলা হয়, তাহলে ভুল হবে না। 
মাজারের অনুসারীরা সাধারণত ঘৃণায় বিশ্বাস করেন না। তাই তারা হয়তো পাল্টা হামলা করছেন না। তবে যত বেশি মাজার, দরগা, আখড়া আক্রান্ত হবে ততই বৃহত্তর সমাজে ভুল বার্তা যাবে। অসহিষ্ণুতা উৎসাহিত হবে। এ দেশের মানুষকে দিয়ে জোর করে কিছু করানো যায় না। জোর করলেই বিপরীত ফল দেখা দেয়। আর লাশ পোড়ানোর মতো হিংস্রতা দিয়ে সমাজে যে পরিবেশ তৈরির পাঁয়তারা হলো, তা একদিন বুমেরাং হলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×