অন্যদৃষ্টি
কপোতাক্ষ বাঁচাবে কে?
মো. ইমদাদুল হক
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৬ | আপডেট: ০২ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
কপোতাক্ষ নদ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের অন্যতম বড় নদ। নদটি চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। কপোতাক্ষ নদের উৎপত্তি চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনার মাথাভাঙ্গা নদী থেকে। এটি পরে যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলায় ভৈরব ও কপোতাক্ষ দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার কাছে শিবসা নদীতে গিয়ে পতিত হয়েছে। এ নদটি একসময় ৫০০ মিটার চওড়া ছিল। এর দৈর্ঘ্য ২৩৮ কিলোমিটার। গভীরতা ৪৯০ ফুট।
কপোতাক্ষ নদ মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত। যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ী নদের তীরে মধুকবির জন্মস্থান। এই কপোতাক্ষ তীরে বসে তিনি কবিতা লিখতেন। এর স্রোতের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল।
২০০০ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি মধুপল্লিকে সরকার পার্ক ও জাদুঘরে রূপান্তর করে। যৌবনকালে এই নদের বুকে বড় বড় পাল তোলা নৌকা ও মালবাহী জাহাজ চলাচল করত। এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি মানুষের আয়ের পথ সুগম করেছিল।
পলি জমা, অপরিকল্পিত সেতু, পলিথিন, বর্জ্যসহ নানাভাবে দূষণ ও দখলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত। পার্শ্ববর্তী খালগুলো থেকে এখন আর এ নদে পানি প্রবেশ করতে পারে না। এক সময়ের খরস্রোতা কপোতাক্ষ এখন শীর্ণকায়, মৃতপ্রায়। খালের পানি প্রবেশ করতে না পারায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বৃহত্তর যশোর-খুলনার একটি বড় অংশ প্লাবিত হয়ে জলাবদ্ধতায় রূপ নিচ্ছে।
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে খুলনা বিভাগের কিছু অংশসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে এ সময় দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।
ইতোমধ্যে এ আশঙ্কার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। ফসলি জমি, মৎস্য খামার, রাস্তাঘাট, হাটবাজার, মানুষের বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। গবাদি পশু, নারী, প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ ও শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কপোতাক্ষ-তীরবর্তী লোকজন দিন দিন কর্মসংস্থান হারিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। কপোতাক্ষের নাব্য ফিরিয়ে পাশের খালগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারলে স্থানীয় মানুষের জানমালের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
২০১১ সালে কপোতাক্ষ নদ খনন কাজে সরকার ২৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু সেই খনন কাজ আজও শেষ হয়নি। সরকার কপোতাক্ষ নদের নাব্য ফিরিয়ে আনার জন্য বেশ কয়েকটি খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য– ‘কপোতাক্ষ নদ খনন (প্রথম পর্যায়)’ এবং ‘কপোতাক্ষ নদ খনন (দ্বিতীয় পর্যায়)’।
এই প্রকল্পগুলোর আওতায় নদের পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পানি প্রবাহ সচল রাখতে নদের বিভিন্ন অংশ থেকে পলি অপসারণ করে এর গভীরতা ও প্রশস্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
কপোতাক্ষ নদের মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর জন্য টিআরএম অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। টিআরএম পদ্ধতিতে জোয়ারের সময় নদের পানিকে নির্দিষ্ট বিলে প্রবেশ করানো হয়। এই পানি পলি বহন করে বিলে জমা হয়। ফলে নদের তলদেশ থেকে পলি সরে যায় এবং বিলের উচ্চতা বাড়ে। ভাটার সময় এই পানি আবার নদ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে ফিরে যায়, যা নদকে সচল রাখতে সাহায্য করে। যদিও টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কিছু সমস্যা দেখা যায়; তবে এটি নাব্য রক্ষায় একটি সফল উপায় হিসেবে প্রমাণিত।
নদের পাড় দখলমুক্ত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের অভিযান চোখে পড়ছে। নদের পাড়ের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য নদের দুই ধারে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু লোক দেখানোর মধ্যে যেন অভিযান কিংবা কর্মসূচি আটকে না থাকে। সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো যথার্থ বাস্তবায়িত হওয়া খুবই জরুরি।
মো. ইমদাদুল হক: সম্পাদক, অন্ত্যজ পরিষদ, সাতক্ষীরা
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- কপোতাক্ষ নদ