সমকালীন প্রসঙ্গ
প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নে রাষ্ট্র কেন অমনোযোগী
আজিজুর রাহমান
আজিজুর রাহমান
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
পুঁজিবাদী দেশগুলোতে জনগণের মত গ্রহণের নামে মাঝেমধ্যেই নির্বাচন নামক একটি খেলা হয়। কিন্তু এ খেলায় আসলেই কি একটি দেশের সর্বস্তরের মানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটে?
বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক। অতীতের কোনো নির্বাচনে কি প্রান্তিক চাষি, ক্ষেতমজুর, সবজি বিক্রেতা, চা বাগানের শ্রমিক, আদিবাসী (পাহাড়-সমতল) জনগোষ্ঠী, শিল্প শ্রমিক, রিকশা শ্রমিক, সুইপার-ক্লিনার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিম্নতম গ্রেডের কর্মচারী প্রমুখের মতের প্রতিফলন ঘটেছে? বিশেষত, পল্লি অঞ্চলের নিরক্ষর নারীসমাজ, যারা সর্বশেষ জরিপ (২০২৫) অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট নারীসমাজের ৭৯.৯%, তাদের মতামতের কোনো প্রতিফলন ঘটেছে কি? নিশ্চয়ই না, কারণ ধনিক-বণিক-ক্ষমতাশালীদের ওই সব নির্বাচনের মাধ্যমে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন, তারা ক্ষমতায় গিয়ে সব সময়ই তেলে মাথায় তেল দেন।
কারণ হিসেবে বলা যায়, বিরাজমান ব্যবস্থায় একটা জাতীয় নির্বাচন অনেক ব্যয়সাপেক্ষ। তাই প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে বড় লুটেরাদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য নিতে হয়। এ ছাড়া বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনী ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন স্তরের ছোট-বড় আমলা বা অফিসারের কাছ থেকে অনৈতিক সাহায্যও নিতে হয়। ফলে অনৈতিক সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতায় গিয়ে সর্বাগ্রে উপরোক্ত গোষ্ঠীগুলোকে খুশি করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের মতো দেশে নির্বাচনী ডামাডোলে অনেক মাসলম্যান বা মাস্তানের প্রয়োজন হয়, রাস্তায় মিছিল করার জন্যও লোকের প্রয়োজন হয়। আর এই মাসলম্যানরা প্রায়ই হয়ে থাকে কোনো ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি বা হত্যা মামলার আসামি। কাজেই সুশাসন পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তৃতীয়ত, এই ধনিক-বণিক-লুটেরা-আমলাদের সরকার দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক, সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক একটি সুষ্ঠু লেখাপড়ার ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত নিশ্চিত করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। অন্যদিকে, একটি দেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের যেখানে নিজ নিজ মাতৃভাষায় একটি পাঠ্যসূচি অনুসরণ করার কথা, সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত করে বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। ফলে একই দেশের বাসিন্দা হিসেবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো জাতীয় চেতনাবোধ গড়ে উঠছে না।
চতুর্থত, আমাদের স্বাস্থ্য খাত চরম অব্যবস্থাপনার শিকার। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে গ্রামীণ রোগীদের সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে সেবা নিতে গিয়ে প্রায়ই চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেতে হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সাধারণ মানুষ ঢাকার সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে প্রায়ই প্রয়োজনীয় সেবা পান না। তদুপরি রয়েছে হতদরিদ্র রোগীদের নিয়ে ‘দালাল’দের উৎপাত। কিন্তু এসব অব্যবস্থাপনার সংবাদ সাধারণ মানুষের দৃষ্টিগোচর হলেও সরকারি হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্তদের নজরে আসে না। এ ক্ষেত্রে লুটেরা ধনিক-বণিক-আমলাদের সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কী করছেন? অফিসিয়ালি উপরস্থ কর্তাব্যক্তিদের দায় থাকলেও তারা ব্যক্তি-গোষ্ঠীর স্বার্থ এবং সংকীর্ণ দলাদলির কাছে জিম্মি। তাই সাধারণ মানুষের কল্যাণের বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে যায়।
পঞ্চমত, দেশের সর্বত্র খুন, ধর্ষণ, অন্যের জমি-দোকানপাট দখল, জ্বালাও-পোড়াও ভাঙচুর, মব সন্ত্রাস ইত্যাদি বেপরোয়াভাবে চলছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০.৮৪ শতাংশ হচ্ছে নারী। মোট জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশ হলেও নারীসমাজ এ দেশে অত্যন্ত অবহেলিত ও নিষ্পেষিত; নারীরা রাস্তাঘাটে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন না, তাদের শিক্ষা-দীক্ষা এবং আয়-রোজগারের সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। সর্বোপরি, সমাজে নেতৃত্বদান এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দেশ পরিচালনায় অবদান রাখার সুযোগ নারীদের জন্য নেই বললেই চলে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে এভাবে (ইচ্ছাকৃতভাবে) পদদলিত করে রেখে আমরা কি কখনও সভ্যসমাজ বলে দাবি করতে পারব? সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে অবদমিত করে রেখেছি বলেই ধর্ষণ, হত্যা, বাল্যবিয়ে এবং বহুবিধ সমস্যা সুদীর্ঘকাল থেকে বিরাজ করছে।

পরিবহন খাতের চরম অব্যবস্থাপনা এবং বিশৃঙ্খলা দীর্ঘদিনের একটি ভয়াবহ সমস্যা। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পরিবহন খাতের মালিকরা বৈধ-অবৈধ সব পন্থাতেই রাস্তায় যানবাহন পরিচালনা করে থাকেন। যতটুকু জানা যায়, ধনকুবের অনৈতিক মালিকরা যানবাহনের ড্রাইভারদের সাধারণত কোনো বৈধ নিয়োগপত্র দেন না। এতে উভয়েরই সুবিধা। কোনো দুর্ঘটনার পর ড্রাইভার নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় এবং মালিক দাবি করেন যে, তাঁর পরিবহন পুলের কোনো ড্রাইভার দুর্ঘটনা ঘটায়নি। পরিবহন খাতের যে সমস্যাটি, বিশেষ করে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে জনদুর্ভোগের বড় কারণ, তা হচ্ছে সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন। এতে যেসব যানবাহন রাজধানী বা বড় শহরগুলোর রাস্তা দিয়ে চলার কথা নয়, সেগুলো অবাধে রাজপথ দিয়ে চলছে; এ ছাড়া যানবাহনের ধরন অনুযায়ী আলাদা লেনের ব্যবস্থাও নেই। এতে একদিকে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় যানজটের কবলে পড়ে এক ঘণ্টার জায়গায় প্রায়ই তিন-চার ঘণ্টা সময় নষ্ট করতে হয়, অন্যদিকে নিরীহ ট্রাফিক পুলিশকে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে গলদঘর্ম হতে হয়। কিন্তু যাত্রীদের দুর্ভোগ হ্রাসের কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা। অর্থাৎ বিচার বিভাগকে প্রকৃত অর্থেই রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে। এটি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সমস্যাতেই জনগণ ন্যায়বিচার পাবে না। সাধারণত কোনো সাধারণ নির্বাচন সামনে এলে কয়েক দিন ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ নিয়ে কথাবার্তা শোনা যায়; কিন্তু পরে একসময় সবাই চুপচাপ হয়ে যান। একটি অগণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতিবিদরা যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় আগ্রহী হবেন না, সেটি বোঝাই যায়। কিন্তু আমাদের দেশের বিচারকার্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চান কিনা, সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কারণ, ওনাদের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে জোরালো দাবি উত্থাপন করতে দেখা যাচ্ছে না।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে লুটেরা ধনিক-বণিকদের সরকার বদলের মাধ্যমে এ দেশের কিষান-কিষানি, প্রান্তিক চাষি, ক্ষেতমজুর, মাছচাষি, সবজি বিক্রেতা, চা বাগানের শ্রমিক, আদিবাসী (পাহাড়-সমতল) জনগোষ্ঠী, শিল্পকারখানার শ্রমিক, রিকশা শ্রমিক, সুইপার-ক্লিনার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিম্নতম গ্রেডের কর্মচারী, নারীসমাজ, বিশেষ করে পল্লি অঞ্চলের নিরক্ষর নারীসমাজের ভাগ্যের যে কোনো পরিবর্তন হবে না, এটি সহজেই অনুমেয়। প্রয়োজন সমাজ ব্যবস্থার বদল।
ড. আজিজুর রাহমান: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- আজিজুর রাহমান
- পুঁজিবাদ