ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

প্রাথমিকে নিয়োগ

উল্লাসের উপলক্ষটি উৎকণ্ঠার হলো কেন

উল্লাসের উপলক্ষটি উৎকণ্ঠার হলো কেন
×
×

মাহফুজুর রহমান মানিক

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

যে দিনটা হওয়ার কথা ছিল সরকারের বিশাল অর্জনের, সেদিনটাই হয়ে গেল হাহাকারের। সরকার প্রশংসা পাওয়ার বদলে কুড়িয়েছে বদনাম। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষকের মধ্য থেকে বাদ পড়া শিক্ষকদের সামাজিক মাধ্যমে বেদনাদায়ক পোস্ট মানুষকে হতাশ ও বিস্মিত করেছে। ভেরিফিকেশনের নামে অনেককেই আটকে দেওয়া হলো। অথচ ১৫ মে তারিখেই লিখেছিলাম– ‘সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি নয়’। এমনকি তখন শিক্ষামন্ত্রীও নিশ্চিত করেছিলেন– সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকের কাউকে বাদ দেওয়া হবে না। সোমবার শিক্ষামন্ত্রী একই কথা বলেছেন। প্রশ্ন হলো, মাঝখানে ভেরিফিকেশনের নামে কেন হয়রানি করা? 

গাধা নাকি পানি ঘোলা করে খায়। শিক্ষা নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রতিবাদের মুখে সেখান থেকে ফিরে আসা দেখে সেই উপমাই সামনে আসছে। প্রাথমিকের এই শিক্ষকদের নিয়েও সময়ক্ষেপণ কম হয়নি। অবশেষে নিয়োগের সময় এসে সেই ভেরিফিকেশনের ফাঁদ। অথচ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে আগে এ ধরনের ভেরিফিকেশন ছিল না। ওদিকে বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। অনেক পদ খালি থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। 

এর আগে গত মাসে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা নিয়ে অনেক জল ঘোলা শেষে এনটিআরসির হাতেই ক্ষমতা থাকছে। তারও আগে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত থেকে সরকার পিছু হটে। এসএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বরে করার কথা থাকলেও অবশেষে সেখান থেকে সরকার ফিরে আসে। শিক্ষা নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তগুলোকে অনেকটা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো মনে হয়। 

তবে ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে যেভাবে প্রাথমিকের সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেল, তা ভয়ংকর প্রবণতা। দুঃখজনক হলেও সত্য, বঞ্চিত শিক্ষকদের আন্দোলনে নামতে হয়েছে। ইতোপূর্বে এই শিক্ষকদের দফায় দফায় আন্দোলন করতে হয়েছে। এর একটা কারণ, নিঃসন্দেহে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুপারিশকৃত। আমরা দেখেছি, ক্ষমতায় থাকতেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফল চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়, যাদের অল্প সময়েই নিয়োগের পূর্ব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত নিয়োগের চেষ্টা করে গেলেও বর্তমান সরকার সেখানে বিলম্ব করেছে। নিয়োগ ত্বরান্বিত করার জন্য তাই সুপারিশকৃতদের বারবার রাজপথে নামতে হয়েছে। এবার তারা নেমেছে ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার কারণে।

সরকারি চাকরিতে ভেরিফিকেশনের ফাঁদের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই সুপারিশকৃতদের সঙ্গে চাকরিপ্রার্থী অনেকেই প্রতিবাদে যুক্ত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে আন্দোলন হচ্ছে শুক্রবার থেকেই। জেলায় জেলায়ও প্রতিবাদ হয়েছে। প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন রাজনৈতিক দলসহ অনেকেই। কয়েক দিন ধরে সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পাচ্ছে শিক্ষক নিয়োগে বঞ্চনা ও প্রতিবাদের খবর।

ইতোপূর্বের লেখায় বলেছিলাম, পুলিশের কেবল দেখা উচিত চাকরিপ্রার্থীর অপরাধ আছে কিনা। না থাকলে তাঁকে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া উচিত। সেখানে এও বলেছি, চাকরির ভিত্তি হবে মেধা। যেহেতু প্রার্থীরা লিখিত ও ভাইভা শেষ করে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, এখানে তাঁকে আটকানোর সুযোগ নেই। তিনি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হন, তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। ‘বিসিএসের স্বপ্ন বনাম ভেরিফিকেশনের দুঃস্বপ্ন’ (সমকাল, ৬ জানুয়ারি ২০২৫)। 

আওয়ামী লীগের সময়ে সরকারি চাকরি থেকে ভেরিফিকেশনের নামে বাদ পড়ার যে অপসংস্কৃতি শুরু হয়; জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তা দেখা গেছে। এখনও যে অব্যাহত আছে– সুপারিশকৃত প্রাথমিক শিক্ষকদের বাদ পড়ার মাধ্যমে সেটি দেখছি। 

যদিও সরকারের কেউই তা স্বীকার করছেন না। এমনকি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ঠিকানাগত সমস্যার কারণে অনেকে নিয়োগপত্র পায়নি। তার অভিযোগ, নিয়োগপত্রপ্রাপ্তি নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। অথচ সমকালের অনুসন্ধানেই জানা গেছে, মূলত চার কারণে নিয়োগে প্রার্থীদের নাম বাদ পড়েছে– পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার যাচাই-বাছাই প্রতিবেদন নেতিবাচক; ডোপ টেস্টে সমস্যা; স্বাস্থ্য সনদ না থাকা ও শিক্ষা সনদে গরমিল থাকা। তবে যাচাই-বাছাই প্রতিবেদন নেতিবাচক থাকার সংখ্যাই বেশি। 

সরকারের কেউই যখন ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার বিষয়টি স্বীকার করতে চাইছেন না; তার মানে, ইতোমধ্যে তারা বাস্তবতা অনুধাবন করতে চেষ্টা করছেন। সোমবার শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন, নিয়োগপত্র না পাওয়া শিক্ষকদের ১ অক্টোবরের মধ্যে নিয়োগ দেওয়া হবে। যারা ওই সময়ের মধ্যে নিয়োগ পাবেন না, তাদের বিষয়েও কাজ করা হবে। বোঝাই যাচ্ছে, সরকার সবাইকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক।

সরকারের জন্য এ নিয়োগ শিক্ষণীয় হয়ে থাকুক। মনে রাখতে হবে, চাকরিপ্রার্থীরা তো বটেই, সাধারণ মানুষ এখন অনেক সচেতন। সরকারের মুখে এক কথা, কাজে ভিন্ন কিছু করে মানুষকে বোকা বানানোর সুযোগ নেই। এটাও মনে রাখা দরকার, চাকরিতে যোগ্যদের বাদ দেওয়ার চিন্তা যারা করছে, তারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকলেও সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী নন। সরকারকে বরং বিপদে ফেলার কাজই তারা করছেন। তা না হলে সরকারের এ অর্জন হাহাকারে পরিণত হতো না! আর শিক্ষাবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই পরিকল্পিতভাবে হওয়া উচিত। 

মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]

আরও পড়ুন

×