উচ্চারণের বিপরীতে
জাসদ কার্যালয়ে পুলিশি অভিযান যে বার্তা দেয়
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
শনিবার রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অন্তত ২৮০ জনকে আটক করে শাহজাহানপুর ও পল্টন থানায় নিয়ে যায়। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর– জাসদ কার্যালয়ে ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর গোপন বৈঠক’ করার খবর পেয়ে যুবদলের নেতাকর্মী সেখানে গিয়ে তাদের আটকে রেখে পুলিশকে খবর দেন।
জাসদের পক্ষ থেকে বলা হয়, সেখানে ছিল পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা। এতে দলের বিভিন্ন স্তরের প্রায় ৫০০ নেতা উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ পুরো অফিস ঘেরাও করে ৩০ জন নারী কর্মীসহ সবাইকে বিভিন্ন থানায় নিয়ে যায়। ঘটনাটি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কিছু লোকজন জাসদ কার্যালয়ে জড়ো হয়েছে ও নাশকতামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা করছে। সেই ভিত্তিতে সেখানে পুলিশ যায় ও অনেককে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদের পর ২৭ জন বাদে সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কাউকে হয়রানির উদ্দেশ্যে এটি করা হয়নি।’
পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার বলেছেন, “আওয়ামী লীগের লোকজনের গোপন বৈঠক করার অভিযোগে সেখানে অভিযান চালানো হয়। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয় তারা।” সোমবারের খবর, আটককৃতদের মধ্যে ২৭ জনকে আদালতে তোলা হলে জামিন নামঞ্জুর করা হয়; বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
জাসদ কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন নয়। সংগঠনটি প্রতিনিধি সভার জন্য পুলিশ বরাবর আবেদন করেছিল। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সভার আবেদন মানেই অনুমতি হয়ে যায় না। আবেদনের আড়ালে আওয়ামী লীগের বৈঠক চলছিল (সমকাল, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। আটক ২৫৩ জনকে ছেড়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়, জাসদের ছদ্মাবরণে আওয়ামী লীগের সভা নিয়ে পুলিশের দাবি সঠিক নয়। আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে আটকের পক্ষে পুলিশ যে যুক্তি দিয়েছে, তা-ও যুক্তিসংগত নয়। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিষিদ্ধ করবার কোনো সরকারি আদেশের তথ্য কারও জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত এই স্লোগান আওয়ামী লীগের একক বা দলীয় স্লোগানও নয়। কাজেই এই স্লোগান দিলে পুলিশ কাউকে কোন আইনের অধীনে গ্রেপ্তার করতে পারে, আমরা জানি না।
২.
‘ভুল’ তথ্যের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানে আরও কয়েকটি সত্য সামনে চলে আসে। জাসদ কার্যালয়ের সামনে পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়নসহ নেতাকর্মীর তৎপরতা ভিডিওচিত্রে দেখা যায়। নয়ন সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাসদ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। তাহলে এটাকে কীভাবে জাসদের কার্যালয় বলা যায়? যেখানে আওয়ামী লীগের স্লোগান হচ্ছে, সেখানেই যুবদল যাবে।’

ধরে নেওয়া যাক, ‘জয় বাংলা’ শুধুই আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তারপরও এই স্লোগান দেওয়ার ‘অপরাধে’ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আটক করবার দায়িত্ব যুবদলের নেতাকর্মীর হাতে কীভাবে এলো? দেশে নির্বাচিত সরকার রয়েছে; আইনের শাসন নিশ্চিত করবার দায়িত্ব সরকারের। সেখানে সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের নেতা বৈধ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি সভায় উপস্থিত হয়ে পুলিশ ডেকে অভিযানে অংশ নিচ্ছেন এবং স্লোগানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন– এটি আড়াই বছর ধরে চলমান মব সন্ত্রাসেরই আরেক রূপ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকালে আমরা দেখেছি যুবলীগ বা ছাত্রলীগের অযৌক্তিক প্রতাপ। ক্ষমতার রোদে পিঠ দিয়ে যার যা কাজ নয়, তা করা সহজ ও অনেক ক্ষেত্রে গোষ্ঠীতন্ত্রের চর্চা বটে; তবে তা দেশের গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার শাসনের জন্য ক্ষতিকর। আওয়ামী লীগ সন্ধানে জাসদের সভায় পুলিশ ডেকে যুবদলের অভিযান এবং হুঙ্কার ধ্বনি গণতন্ত্রের মহিমাকে ম্লান করে।
৩.
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখাও গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম কর্তব্য। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে এমন সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংকল্প করেছেন, যেখানে দলমত-জাতিধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বাস করতে পারে। তিনি রাষ্ট্র মেরামতের কথাও বলেছেন। বৈশ্বিক পরিসরে উচ্চারিত এই বক্তব্য প্রত্যাশা-জাগানিয়া। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘এ দেশে বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী ও সংশয়ী সব মানুষের সমান মর্যাদা ও সম্মান থাকবে।’
প্রধানমন্ত্রীর প্রগতিশীল বার্তা প্রশাসন ও দলের সব স্তরে পৌঁছুলে ভিন্নমতের ওপর আক্রমণ অব্যাহত থাকবার কারণ থাকে না। হেফাজতে নির্যাতন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, প্রান্তিক ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাহীনতা এবং মতপ্রকাশে বাধার যে কোনো অভিযোগই দ্রুততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে মীমাংসা করতে হবে। যে কোনো অভিযুক্ত ছয় মাসের বেশি বিনা জামিনে কারাবন্দি থাকতে পারেন না– এই বিধান সমুন্নত রেখে সমাজে ভিন্নমতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে পুলিশি অভিযান কিংবা ভিন্নমতের লোকজনকে হেনস্তার সিদ্ধান্ত অবশ্যই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নয়। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরিচর্যা প্রয়োজন। কোনো নেতাকর্মীর অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অঙ্কুরেই নিরুৎসাহিত না করলে শেষ পর্যন্ত তা দলের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ-সংক্রান্ত সরকারি যে কোনো সিদ্ধান্ত আরও বিবেচনাসম্মত হওয়া বিশেষ প্রয়োজন।
জাসদ কার্যালয়ে অভিযানের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, গোয়েন্দা তথ্য সঠিক ছিল না। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতামতের জন্য সমাজে জায়গা গড়ে তুলতে হবে। পুলিশের সঙ্গে সরকারি দলের নেতাকর্মীকে দেখা গেলে সমাজে অগণতান্ত্রিক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশকে নৈর্ব্যক্তিকভাবে কাজ সম্পাদন করবার পরিবেশ সরকারকে তৈরি করে দিতে হবে। সেখানে কোনো পক্ষেরই নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে আইনের মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে তাঁর ভাষণে আরও বলেছেন, ‘নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না।’ নাগরিকদের ক্ষমতার জন্য আইনের শাসনের কোনো বিকল্প নেই। রাজনীতিতে নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সুশাসনের নিশ্চয়তা তাকে ক্ষমতায়িত করে। অমীমাংসিত রাজনৈতিক বিষয়াদি যেমন আইনের সীমানায় যৌক্তিক পরিণতিতে নিয়ে আসতে হবে, তার আগে যেনতেন প্রকারে বিরুদ্ধমতের মানুষের মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া যাবে না; আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মব সন্ত্রাসের এলোপাতাড়ি বিস্তার এ দেশে হয়েছে। এরই সম্প্রসারিত রূপ– সহিংসতার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর সংযুক্তি। দাতব্য গৃহ থেকেই শুরু হয়– আপ্তবাক্যের সূত্র ধরে সরকার তার নিজ দলের নেতাকর্মীকে যাবতীয় সহিংসতা থেকে দূরে থাকবার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে তা শক্তভাবে কার্যকর করবে। গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
- জাসদ
- আটক