সামাজিক মাধ্যম
অমিতের ফেসবুক প্রোফাইল যে বার্তা দিয়ে গেল
জান্নাতুল রুহী
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর একটা বেসরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী অমিত ঘোষ স্কুলের নির্মাণাধীন ১১ তলা ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। সেসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান এই লেখার বিষয়বস্তুও নয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই খবরের মধ্যে যে বিষয়টা নজরে আসে, সেটা হলো অমিতের ফেসবুক প্রোফাইল। তার প্রোফাইলের বায়োতে লেখা: ‘০১/১১/২০০৭-১৩/০৯/২০২৬’-এর নিচের বাক্য: ‘স্ট্যান্ড প্রাউড। ইউ’আর লিমিটেড এডিশন। অনলি ওয়ান এভার ক্রিয়েটেড।’
একজন কিশোর নিজের প্রোফাইলে তার সম্পর্কে এটাই লিখে রেখেছিল। জন্মতারিখের সঙ্গে একটি মৃত্যুর তারিখ, আর নিজের জন্য একটা বয়ান। তার মৃত্যুর পর এই বিষয়টি এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাক্যটি থেকে বোঝা যায়, সে নিজেকে অনন্য হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। এটা একজন কিশোরের স্বাভাবিক প্রকাশের অংশও হতে পারে। কিন্তু একই প্রোফাইলে থাকা ‘০১/১১/২০০৭–১৩/০৯/২০২৬’ তারিখ দুটি ভিন্নভাবে ভাবায়। বিশেষ করে অমিতের মৃত্যুর পরে এই তথ্যটি এখন আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এই তারিখ কেন লেখা হয়েছিল, কখন লেখা হয়েছিল কিংবা এর পেছনে তার আসলে কী চিন্তা ছিল, তা জানা নেই। ফলে এটাকে ঘটনার পূর্বপরিকল্পনার প্রমাণ হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই।
কিন্তু ঘটনাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যগুলো শুধু সেই মুহূর্তেরই প্রকাশ নয়। কোনো একটি বায়ো, ছবি বা পোস্ট ভবিষ্যতেও থেকে যেতে পারে। আবার সময়ের সঙ্গে তার অর্থও পরিবর্তিত হতে পারে। এই ডিজিটাল চিহ্নগুলোর মধ্য দিয়েই তৈরি হয় আমাদের জিজিটাল পরিচয়।
অমিতের ফেসবুক বায়োতে থাকা তারিখটি মৃত্যুর আগে তার পরিচিতদের কাছে হয়তো নিছক একটি ব্যক্তিগত বয়ান ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই একই তথ্য আমাদের সামনে নতুন আরও একটি প্রশ্ন হয়ে হাজির হয়েছে: কিশোরেরা প্রতিদিন অনলাইনে নিজেদের সম্পর্কে নানান কিছু প্রকাশ করার সময়ে সেই প্রকাশগুলো আসলে তাদের পরিচয়ের কোন অংশ তৈরি করছে, সেটি সম্পর্কে তারা কি সচেতন?
শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার সম্পর্কে বললে আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়াদি। তাকে বলা হয়: ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করবে না, অপরিচিত কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে না, অচেনা লিংকে ক্লিক করবে না, ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে দূরে থাকবে, বেশি সময় ফোন ব্যবহার করবে না, ভুয়া তথ্য থেকে সতর্ক থাকতে হবে প্রভৃতি। এসব সতর্কতা অবশ্যই প্রয়োজনীয়।
কিন্তু অনলাইনে তুমি নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবে? এটা কখনোই আমাদের শেখানোর তালিকায় থাকে না। শিশুকে আমরা সামাজিক মাধ্যমে কী করা যাবে না– সেটা শেখাই। কিন্তু সেখানে সে কী হতে চায়; কী দেখাতে চায় এবং নিজের সম্পর্কে কী ধরনের পরিচয় তৈরি করতে চায়; সেই শিক্ষা কি দিই?
তাহলে শিশুকে কী শেখানো উচিত?
একই সঙ্গে তাদের এটাও বোঝানো দরকার– তোমার প্রোফাইলে শুধু তুমি কী দেখছ, তা নয়। তুমি কে, সেটিও প্রকাশ পায়। তাই নিজের আগ্রহ, পছন্দের বিষয়, শেখার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, নিজের তৈরি কাজ, কোনো অর্জন– এসবও তার ডিজিটাল পরিচয়ের অংশ হতে পারে। সে কী নিয়ে ভাবছে, কোন বিষয়ে কাজ করতে ভালোবাসে কিংবা ভবিষ্যতে কী করতে চায়, সেসবেরও ইতিবাচক প্রকাশ ঘটতে পারে সেখানে।
অর্থাৎ শিশুকে শুধু কনটেন্টের ভোক্তা হিসেবে নয়, কনটেন্ট উৎপাদক এবং নিজের পরিচয় সচেতনভাবে উপস্থাপনকারী হিসেবেও ভাবতে হবে।
তাই প্রয়োজন পথনির্দেশনা। শিশুর হাতে ফোন দেখলেই আমাদের প্রথম প্রশ্ন: কতক্ষণ ফোন ব্যবহার করছ? প্রশ্নটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। একই পরিমাণ সময়েই একজন শিশু গেম খেলতে পারে, আবার কেউ সেই সময়ে কোনো বিষয় শিখতে, নিজের কাজ তৈরি করতে কিংবা নিজের আগ্রহের বিষয়ে জানতে পারে। তাই অভিভাবকের প্রশ্ন শুধু ‘কতক্ষণ’-এ সীমাবদ্ধ না থেকে আরও প্রশ্ন হতে পারে: ফোনে কী করছ? কী শিখছ?, কী তৈরি করছ?, কী নিয়ে আগ্রহী হচ্ছো?
শিশুকে সামাজিক মাধ্যম থেকে সরিয়ে রাখা একমাত্র সমাধান নয়। তাকে শেখাতে হবে নিজের তৈরি করা ডিজিটাল চিহ্ন সম্পর্কে সচেতন হতে; নিজের আগ্রহ ও দক্ষতাকে প্রকাশ করতে এবং অনলাইনে নিজের পরিচয়টি কীভাবে নির্মাণ করছে, তা নিজে অনুধাবন করতে।
জান্নাতুল রুহী: সাংবাদিক ও লেখক
- বিষয় :
- সামাজিক মাধ্যম