ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প
এসএমই বিকাশে বড় বাধা সরকার নির্ধারিত সংজ্ঞা
ক্ষুদ্র শিল্পের নামে যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেগুলো অনেকটাই বড় শিল্প
আবু তাহের খান
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:২০
দেশে বিদ্যমান শিল্পনীতির (জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২) দ্বিতীয় অধ্যায়ে এর ১৩টি উদ্দেশ্যের মধ্যে ৩ নম্বরে, অর্থাৎ একেবারে প্রথম দিকেই উল্লেখ করা হয়েছে– এর অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিকশিত করার সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। সরকারের পক্ষ থেকে নিঃসন্দেহে এটি উত্তম ঘোষণা বা অঙ্গীকার। তবে শুনতে রূঢ় শোনালেও বলতে হয়, আমাদের রাজনীতিকরা জনসভায় বক্তৃতা করার সময় যেমন এমন অনেক কিছু বলেন, যা শুধু বলার জন্য বলা, শিল্পনীতির এ ঘোষণাও অনেকটা তেমনি। এ দাবির প্রমাণ এ শিল্পনীতিতেই রয়েছে। এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে উদ্দেশ্য হিসেবে যা বলা হয়েছে, তৃতীয় অধ্যায়ে গিয়ে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (সিএমএসএমই) সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে ঠিক তার বিপরীত চেতনা ধারণ করে। বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিনিয়োগ সীমা হবে যথাক্রমে ৭৫ লাখ থেকে ১৫ কোটি টাকা এবং ১৫ কোটি থেকে ৩০ কোটি টাকা, যা সিএমএসএমই খাতের বিকাশের পথে একটি বড় বাধা।
ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগের নিম্নসীমা ও ঊর্ধ্বসীমার মধ্যে যদি এত বিশাল পার্থক্য থাকে, আর সে অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে যদি ক্ষুদ্র শিল্পে অর্থায়ন করতে বলা হয়, তাহলে ব্যাংক তার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা ও কর্মকৌশলগত সুবিধার কারণে ৭৫ লাখ টাকার কাছাকাছি মূলধনসম্পন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে, নাকি তা ১৫ কোটি টাকার কাছাকাছি মূলধনসম্পন্ন প্রকল্পে করবে? নিঃসন্দেহে শেষোক্ত ধরনের প্রকল্পে করবে এবং বাস্তবে সেটিই ঘটছে। ক্ষুদ্র শিল্পের নামে ১৫ কোটি টাকার নিকটবর্তী সীমার প্রকল্পকে অর্থায়ন করতে গিয়ে ৮০/৯০/১০০ লাখ টাকার কাছাকাছি সীমার প্রকল্প আড়ালেই থেকে যাচ্ছে; অর্থাৎ প্রকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প তেমন কোনো বিবেচনাই পাচ্ছে না। ক্ষুদ্র শিল্পের নামে যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামোর বিবেচনায় সেগুলো আসলে অনেকটাই বড় শিল্প। বাস্তবে এগুলোকে কোনোভাবে ক্ষুদ্র শিল্প বলার অবকাশ নেই। বিষয়টি একইভাবে প্রযোজ্য সরকার নির্ধারিত সংজ্ঞাধীন মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রেও। মাঝারি শিল্প বিবেচনায় ১৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা বিনিয়োগসীমার যেসব প্রকল্পে ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোও আসলে নিশ্চিতভাবে বড় শিল্প।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শিল্পনীতিতে এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতমূলক সংজ্ঞা কেন নির্ধারণ করা হলো? ধারণা করা যায়, এটি করা হয়েছে মূলত নিম্নোক্ত চারটি কারণে। এক. বৃহৎ শিল্পের তুলনায় সিএমএসএমইর জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হ্রাসকৃত সুদহার, কর ও শুল্ক ছাড় এবং অন্য যেসব অগ্রাধিকারমূলক সুযোগ-সুবিধার বিধান রাখা হয়েছে, সিএমএসএমই উদ্যোক্তা পরিচয়ে বড় শিল্পের মালিকেরা যেন সেসব সুযোগ-সুবিধা অকাতরে ভোগ করতে পারেন, সে সুযোগ করে দেওয়া। দুই. বিশেষ শ্রেণিকে বাড়তি সুবিধাদানের হীন উদ্দেশ্যে সেবামূলক কর্মকাণ্ডকে শিল্প হিসেবে গণ্য করার প্রেক্ষিতে সৃষ্ট সুযোগ যাতে সেবা খাতের আরও বেশি সংখ্যক উদ্যোক্তা কুক্ষিগত করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা। তিন. দেশের বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ভিন্ন ভিন্ন নামে বহুসংখ্যক আলাদা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে স্বল্প সুদে, কর-শুল্ক কম দিয়ে ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে নিজেদের মুনাফার পরিমাণ একচেটিয়াভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারেন, সে কৌশলকে সহযোগিতা করা। চার. সেবা খাতে বেশি পরিমাণে চলতি মূলধন বিনিয়োগের সহজ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংশ্লষ্টদের একচেটিয়া মুনাফা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া।
শিল্পনীতিতে শিল্পের সংজ্ঞাকে সিএমএসএমইর জন্য প্রতিকূল করে তোলার পেছনে উপরোক্ত বিষয় ছাড়াও বেশ কিছু কারণ রয়েছে। তবে এ খাতের গড়পড়তা বা তার চেয়ে নিম্ন বিনিয়োগসীমার উদ্যোক্তাদের বঞ্চিত ও নিরাশ করে তোলবার জন্য উপরোক্ত কারণগুলোই যথেষ্ট। কিন্তু এরপরও বছরের পর বছর ধরে এ খাতকে অগ্রাধিকারদানের কথিত ঘোষণা বা অঙ্গীকারের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ এ সংজ্ঞা ২০০১ সালের পর থেকে আজ ২৫ বছর ধরে একনাগাড়ে অব্যাহত আছে। এ সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় একাধিকবার রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্ত শিল্পনীতিতে শিল্পের চাতুর্যপূর্ণ সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সিএমএসএমই খাতের নাম ভাঙিয়ে তাদের প্রাপ্য সুবিধাগুলোকে বিত্তবান উদ্যোক্তাদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দেওয়ার নীতির কোনোই পরিবর্তন ঘটেনি। ঘটেনি এ কারণে যে কার্যত এই বিত্তবান উদ্যোক্তারাই সামনে বা আড়ালে থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশীদার। এরা সরকারের ভেতরে থেকে যেমন ক্ষমতাবান, তার চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান তারা সরকারের বাইরে থেকে। কারণ ভেতরে থেকে শোষণ বা সুবিধা কুক্ষিগত করলে সে কাজগুলো সহজেই মানুষের চোখে পড়ে। কিন্তু আড়ালেরটা সাধারণ মানুষ সরাসরি দেখতে পায় না বলে সেখানে লুটেরা হয়ে ওঠার সুযোগ অনেক অনেক বেশি। এবং বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নীতির (মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, আমদানি-রপ্তানি নীতি, ব্যাংকিং, শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্যনীতি ইত্যাদি) ক্ষেত্রে সেই একই অবস্থা।
বস্তুত শিল্পনীতিতে উল্লিখিত শিল্পের চতুর সংজ্ঞার ফাঁক গলিয়ে ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট বড় উদ্যোক্তারা বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতাহীন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার স্বার্থ লুটে খাচ্ছে। তদুপরি এরা আবার নানা সংগঠন-সমিতির নামে যথেষ্ট সংগঠিতও। এদের এসব কায়েমি স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কখনও কোনো সরকার যদি ভালো কোনো পরিবর্তন আনতেও চায়, তাহলেও এদের বাধা ও প্রতিরোধের মুখে শেষ পর্যন্ত তা আর কার্যকর করা সম্ভব হয় না। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া ও এম সাইফুর রহমান দুজনেই এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েও বড় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর বাধার মুখে কার্যক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত আর কিছুই করতে পারেননি। তাদের এ ধরনের উদ্যোগের মুখে বড় ব্যবসায়ীরা তখন একযোগে ও সমস্বরে আওয়াজ তুলেছিলেন যে এ জাতীয় উদ্যোগের ফলে দেশে ব্যবসায়ের পরিবেশ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। উল্লিখিত দুই সাবেক অর্থমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হতে চেয়েছিলেন এবং সেখানেই ছিল ওইসব ব্যবসায়ীর মূল আপত্তি (এখানে সব ব্যবসায়ীকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে না। দেশে অনেক সৎ ও নীতিবান ব্যবসায়ীও রয়েছেন। তবে তাদের সংখ্যা কম এবং দিন দিন তা আরও কমে যাচ্ছে)।
সিএমএসএমই খাতকে যদি প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য দূরীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাতিয়ার ও কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে হয় তাহলে সর্বাগ্রে যে কাজগুলো করতে হবে তা হচ্ছে: এক. পণ্য উৎপাদকদের এলাকা ও গুচ্ছের (ক্লাস্টার) ভিত্তিতে সংগঠিত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা গ্রহণ, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে দরকষাকষির যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। দুই. উদ্যোক্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নীতি ও সিদ্ধান্ত প্রণয়ন এবং বিদ্যমান ভ্রান্তিপূর্ণ নীতি ও সিদ্ধান্ত সংশোধনের ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ ও মতামতকে যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিতে বাধ্য হয়, সে জন্য সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে ব্যাপকভিত্তিক জনমত গড়ে তুলতে হবে। তিন. সিএমএসএমই খাতের অধিকাংশ উদ্যোক্তা তাদের অধিকার ও বঞ্চনার বিষয়গুলো সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নন। দেশের নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের উচিত হবে এসব বিষয়ে তাদের সচেতন করে তোলা ও আনুষঙ্গিক তথ্যাদি তাদের নাগালের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া। চার. সরকারি ও বেসরকারি খাতের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সচেতন, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উচিত হবে নিজেদের পেশাদারিত্ব বহাল রাখার পাশাপাশি সিএমএসএমই খাতের অসহায় উদ্যোক্তাদের প্রতি ন্যায্য ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সেবা প্রদান করা। এবং পাঁচ. সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার শপথ নিয়ে যারা সরকারের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের উচিত হবে সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন’– এই অঙ্গীকারের আলোকে শিল্পনীতিতে শিল্পের সংজ্ঞা সংশোধনপূর্বক সিএমএসএমই খাতের বিকাশ ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), শিল্প মন্ত্রণালয়; অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি
- বিষয় :
- শিল্প খাত
- ক্ষুদ্রশিল্প