জ্ঞানান্দোলন
‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ এখনও প্রাসঙ্গিক
অমিত রঞ্জন দে
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বাংলার মুসলমান সমাজের একটি বড় অংশ আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সমকালীন জ্ঞানচর্চা থেকে পিছিয়ে ছিল। তাদের মন-মানসিকতা ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক রক্ষণশীলতায় পূর্ণ। এ রকম বাস্তবতায় এক দল শিক্ষিত মুসলিম তরুণ ও বুদ্ধিজীবী উপলব্ধি করেছিলেন– সমাজের পরিবর্তনের জন্য মানুষের চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকার মুসলিম হলে অধ্যাপক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’। কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হুসেন, আবুল ফজল, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবদুল কাদিরসহ এক দল প্রগতিশীল সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সংগঠনকে কেন্দ্র করে যুক্তিবাদী ও মুক্তচিন্তার যে ধারা গড়ে ওঠে, তা পরবর্তীকালে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে পরিচিত হয়।
আন্দোলনের বক্তব্য ছিল খুবই স্পষ্ট। জ্ঞান, যুক্তি ও স্বাধীন বিচারবোধের ওপর দাঁড়ানোর একটা সংকল্প তারা গ্রহণ করেন। ধর্মকে অস্বীকার না করে ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধ অনুশাসন ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তি ও মানবিকতা-সমৃদ্ধ অবস্থান নেওয়াই ছিল তাদের লক্ষ্য।
তাদের এই চিন্তাকে সমাজে ছড়িয়ে দিতে তারা ‘শিখা’ পত্রিকা বের করেন। শিখার একটি বিখ্যাত বাণী– ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। আন্দোলনের দর্শনকে এক বাক্যে ধারণ করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কোনো একক ব্যক্তির চিন্তার ফসল ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত চিন্তাবিদদের ভাবনা ও কর্মের মধ্য দিয়ে আন্দোলনটি বহুমাত্রিকতা লাভ করেছিল। কাজী আবদুল ওদুদ বাঙালি মুসলমান সমাজকে বিশ্বজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন ও সংস্কৃতির বৃহত্তর ধারার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মুক্তবিচার ও বিশ্বমানবতা। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবাদ ও স্বাধীন চিন্তার অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর অবস্থানের মূল কথা ছিল নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে সত্যকে যাচাই করতে হবে। আবুল হুসেন ছিলেন প্রচলিত কর্তৃত্ব ও সামাজিক বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার এক সাহসী কণ্ঠ। তাঁর লেখা ঘিরে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তা সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় প্রশ্ন করার কঠিনতাকেই তুলে ধরে। আবুল ফজল মুক্তচিন্তাকে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক জীবনবোধের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। আর মোতাহের হোসেন চৌধুরীর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ ও মানুষের মুক্তি। সাহিত্য ও দর্শনের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, বিবেক ও মননকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আবদুল কাদির সাহিত্য, গবেষণা ও সম্পাদনার মাধ্যমে উদার ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এবং তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত সাধনায় গড়ে ওঠা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসেন।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সাংগঠনিক তৎপরতা নানা বাধার মুখে ১৯৩০-এর দশকেই স্তিমিত হয়ে পড়লেও তার চিন্তার প্রভাব রয়ে যায়। তারা যে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা চর্চার যে বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা গড়ে তুলেছিলেন, তা পরবর্তীকালে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।
১৯৩০-এর দশকের শেষভাগে প্রগতি লেখকদের যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার বিকাশের সঙ্গে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের চিন্তার একটি অন্তর্নিহিত যোগসূত্র পরিলক্ষিত হয়। যে কারণে ১৯৪০ সালে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের প্রথম সম্মেলনের উদ্বোধক হিসেবে আমরা দেখতে পাই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা কাজী আবদুল ওদুদকে।
এমনকি আজও সেই সময়ে উত্থাপিত মৌলিক প্রশ্নগুলো আরও জরুরি হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এখন অজ্ঞতার পাশাপাশি আমাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহকে। গুজব ও অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, আর সামাজিক মাধ্যমে এর ধারাবাহিক প্রবাহ অনেক সময় মানুষকে নিজের পরিচিত মতামতের বৃত্তের মধ্যেই আটকে রাখছে। ফলে তথ্য পাওয়া যত সহজ হয়েছে, তথ্যের সত্যতা যাচাই ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা বা বিশ্লেষণের প্রয়োজন তত বেড়েছে।
এই জায়গাতেই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ঐতিহ্য আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। কোনো তথ্য পেলেই বিশ্বাস নয়– জানতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, উৎস যাচাই করতে হবে, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে হবে এবং মানুষের মর্যাদা ও কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। তা কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; পরিবার, সমাজ, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রশ্ন করার সাহস ও অনুসন্ধিৎসা তৈরি করা জরুরি। কারণ প্রশ্নহীনতা জ্ঞানচর্চাকে দুর্বল করে, আর ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখার প্রবণতা সমাজে সংলাপের পরিসর সংকুচিত করে। একটি সুস্থ সমাজ তা যেখানে মানুষ নিজের বিশ্বাসকে যেমন ধারণ করতে পারবে, তেমনি প্রয়োজন হলে সেই বিশ্বাসকে যুক্তির আলোয় পরীক্ষা করারও সুযোগ পাবে।
অমিত রঞ্জন দে: সাধারণ সম্পাদক, উদীচী
- বিষয় :
- মুক্তি