সাদা কালো
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ কৌশলের পুনরাবৃত্তি
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৩২ | আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীতে দুই দিনেরও কম সময়ে চার স্থানে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর, দখলচেষ্টা ও লুটপাটের ঘটনার পর সরকার একটু নড়েচড়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে দুই শতাধিক দুর্বৃত্ত মিরপুরে ৫০ বছরের পুরোনো এক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর শনিবার দিনরাতে আরও তিনটি স্থানে লুটপাট ও দখলের লক্ষ্যে সশস্ত্র হামলা চলে। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টায় ওই হামলা হয় আদাবর শ্যামলী হাউজিংয়ে ৮ তলা বাড়ি দখলের চেষ্টায়। বেলা ১১টার দিকে অনুরূপ ঘটনা ঘটে মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যানে। আর রাত ১১টার দিকে হামলা হয় ইসিবি চত্বরে নিউগিনি প্রপার্টিজে। হামলাগুলো ছিল সংঘবদ্ধ এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটনাস্থল ছিল সংশ্লিষ্ট থানার কাছাকাছি। স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলের চেষ্টা হয় পুলিশের উপস্থিতিতে। তারপরও সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে ‘বেপরোয়া’ অপরাধীরা ‘শঙ্কাহীন’ চিত্তে অপরাধ করে কেটে পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে এক প্রকার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, সবকটিতেই আঙুল ওঠে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীর দিকে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলচেষ্টায় তো অভিযোগের তীর যায় সরাসরি স্থানীয় সংরক্ষিত আসনের বিএনপিদলীয় এমপির দিকে।
বিএনপির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং খুন-খারাবির অভিযোগ ইদানীং উঠেছে, তা নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটার পরপরই বিশেষত মাঠ পর্যায়ের বিএনপি নেতাকর্মীদের একটা অংশ এসবে জড়িয়ে যায়। মূলত আগের দেড় দশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের যে মৌরসিপাট্টা ছিল, সেটা চলে আসে বিএনপি নেতাকর্মীর দখলে। এমনকি তারা এতেও সন্তুষ্ট না থেকে তাদের অপরাধবৃত্ত বাড়িয়ে নতুন নতুন দখল ও দুর্বৃত্তপনায় যুক্ত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব অভিযোগের পাহাড় জমা হলে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি সরকারকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানালেও নিজেরা রাষ্ট্রক্ষমতা পেয়ে সেই আহ্বানের কথা বেমালুম ভুলে যান। অন্যদিকে সীমাহীন দ্রব্যমূল্য, ভঙ্গুর অর্থনীতি মেরামতের কোনো দিশা না থাকার সঙ্গে বিদ্যুৎ-জ্বালানির তীব্র সংকট যুক্ত হয় এর সঙ্গে। ফলে মানুষের নিরাপত্তাহীনতার বোধ সত্যিই গভীর হয়।
সরকারের মাত্র সাত মাসের মাথায় মানুষ যদি ভরসা হারায়, তা আখেরে সরকারের জন্য সুখকর হয় না। বিগত ৫৫ বছরে এর ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। খুব বেশি পেছনে যেতে হবে না। ২০০১ সালের সর্বশেষ বিএনপি সরকারও নির্বাচিত হয়েছিল আজকের মতো বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে। তখন অবশ্য আজকের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও ছিল সে জোট সরকারে। ক্ষমতায় আসার কিছু দিনেরই মধ্যে আজকের মতোই বিএনপি নেতাকর্মীর একাংশ সন্ত্রাস, দখল ইত্যাদিতে যুক্ত হয়। তাদের আশীর্বাদপুষ্ট নানা নামের ভয়ংকর অপরাধীরাও জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০০২ সালের অক্টোবরে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হয়, যেখানে সরকারি দলের লোকদের সঙ্গে তৎকালীন বিরোধী দলেরও অনেকে প্রাণ হারায়। পরিণামে তীব্র সমালোচনার মুখে ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে সে অভিযান বন্ধ করতে হয়। স্মরণ করিয়ে দেওয়া অত্যুক্তি হবে না, বহুল আলোচিত-সমালোচিত ১/১১ সরকার বিএনপি-জামায়াতের সেই শাসনের জের ধরেই এসেছিল।
বিএনপি অন্তত সিনিয়র নেতাদের সেই শাসনামলের অস্বস্তিকর স্মৃতি মনে থাকার কথা। সম্ভবত সে কারণেই সরকারের মধ্যে বিদ্যমান শোচনীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে, যদিও মাত্র কিছুদিন আগেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তাঁর একাধিক সহকর্মী এ নিয়ে কথা উঠলেই বলতেন, জননিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে তো ভালোই; বিগত আওয়ামী আমলের চেয়ে ভালো।
প্রসঙ্গত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আওয়ামী আমলে জনঅসন্তোষ কম না থাকলেও অন্তর্বর্তী আমলে তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তো বটেই; পুলিশের সংরক্ষিত তথ্য ব্যবহার করেও তা প্রমাণ করা যায়। আর জননিরাপত্তার সেই ভঙ্গুর দশা এখন কী অবস্থায় আছে, ওপরের ঘটনাবলিই তা বলে দেয়।
চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার পুলিশ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত অপরাধ পর্যালোচনা সভায় কিছু বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে– দলীয় পরিচয়ে যারা চাঁদাবাজি, দখল ও অপরাধমূলক কাজে জড়াচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতামত নিতে হবে না। অপরাধে সম্পৃক্ত হলেই গ্রেপ্তার করা হবে; দলীয় পদ বা পরিচয় দেখা হবে না। অন্যদিকে একই দিনে সচিবালয়ে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংকালে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে যৌথ বাহিনী নামানো হতে পারে।
প্রশ্ন হলো, খোদ প্রধানমন্ত্রী গত মে মাসে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে দলীয় মানসিকতার ঊর্ধ্বে থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ পুলিশকে দিয়েছিলেন। একই অঙ্গীকার বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও আছে। প্রধানমন্ত্রীর সেই নির্দেশ এতদিন কার্যকর হলো না কেন?

আর বিএনপি যে নিজেদের সর্বশেষ শাসনামলের নির্মোহ মূল্যায়ন করেনি– তার প্রমাণ দলটি যৌথ বাহিনী নামিয়ে অপরাধ দমনে ২০০৩ সালের সেই ব্যর্থ কৌশল আবারও প্রয়োগের কথা ভাবছে। ২০০৩ সাল বাদ যাক; অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়েই সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে। তারও কি মূল্যায়ন করেছে বর্তমান সরকার?
আসলে দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে কাজ করলে যে কোনো বাহিনীর পক্ষেই জননিরাপত্তা অন্তত সন্তোষজনক মাত্রায় নিশ্চিত করা সম্ভব। এটাও স্বীকার করতে হবে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দেশ যে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে কোনো বাহিনীর পক্ষে পেশাদারিত্ব বজায় রাখাও কঠিন। অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যখন মব সন্ত্রাস প্রায় সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ল, যার শিকার পুলিশ বাহিনীও হয়েছে; তখন বলা হলো, নির্বাচিত সরকার এলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও কি এসেছে?
মনে আছে নিশ্চয়, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানকে এক দল শিক্ষার্থী তাঁর প্রশাসনে ‘দোসর’ আছে– এমন অভিযোগ করলে তিনি পাল্টা তাদের বললেন, ‘ওরা তোমার গ্রামেও আছে, কিছু করতে পেরেছ এদের?’ ড. ইউনূসের সেই কথার প্রতিধ্বনি এখনও শোনা যায় সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপিদের কণ্ঠে। এভাবে মবতন্ত্রকে উস্কে দিয়ে সমাজকে স্থিতিশীল করা তো দূরের কথা, পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীকেও দায়িত্বশীল করা যায় না। কোনো দেশে কোনোকালেই মবতন্ত্র নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকেনি; এখানেও শুধু আওয়ামী নেতাকর্মীরা তাদের লক্ষ্যবস্তু নয়। এমনকি জয় বাংলা স্লোগানকে টার্গেট করেও তারা ক্ষান্ত নয়। উদারমনা নারী ও সংস্কৃতিকর্মীরাও তাদের হাতে হেনস্তা হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট মববাজকে ধরতে গিয়ে রাষ্ট্রের কোন বাহিনীর সদস্য তার রুটিরুজি হারানোর ঝুঁকি নেবে?
ফলে বিদ্যমান জননিরাপত্তা সংকটের মাত্রা এমনকি অতীতের কোনো আমলের সঙ্গেই তুলনীয় নয়। এর সমাধান চাইলে মবতন্ত্রের রাশ টেনে ধরতে হবে। তার আগে সব মত-পথের মানুষকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে দিতে হবে।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন