ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

নারী এমপির পদত্যাগের রাজনৈতিক তাৎপর্য

নারী এমপির পদত্যাগের রাজনৈতিক তাৎপর্য
×
×

খুশী কবির

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে দেখা ও পদত্যাগ করেছেন এবং বিকেলের মধ্যেই তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপনও জারি হয়েছে (সমকাল অনলাইন, ১ অক্টোবর ২০২৬)।

আমরা কয়েকদিন ধরে সংবাদমাধ্যমে দেখেছি, রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংসদ সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে তাঁর প্রেস সচিব বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছিলেন।

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা কেবল একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত পরিসরের সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি ইত্যাদি বিষয় সামনে এনেছে। বস্তুত রাজনৈতিক দল কিংবা ব্যক্তিবর্গের বদলেই ক্ষমতার রূপ আর আচরণের পরিবর্তন হয় কিনা– এমন প্রশ্ন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনার শুরু থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাথমিক অবস্থায় তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। দলের পক্ষ থেকেও তখন বিষয়টি কিছুটা এড়িয়ে গিয়ে পরে দেখা হবে গোছের একটি দায়সারা মনোভাব ব্যক্ত করা হয়। কিন্তু জনপরিসরে যখন এটি নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা এবং সংবাদমাধ্যমে লেখালেখির ঝড় উঠল, তখন সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দল শেষ পর্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হলো। 

এতে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট– প্রথমত, যে অপরাধ বা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, তা কোনো ভিত্তিহীন গুঞ্জন ছিল না; পদত্যাগের ঘটনা তার পরোক্ষ প্রমাণ বহন করে। দ্বিতীয়ত, সংবাদমাধ্যমের আলোচনা এবং তীব্র জনমতের তোপের মুখে কেবল দল কিংবা ব্যক্তি সুসংহত হওয়া বা সিদ্ধান্তের তাগিদ অনুভব করেছে। 
সংসদ সদস্য পদ থেকে তাঁর এই সরে দাঁড়ানো বা দল থেকে নেওয়া এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে প্রথম দর্শনে রাজনৈতিক শিষ্টাচার কিংবা ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। কিন্তু গভীরভাবে ভেবে দেখলে প্রশ্ন জাগে– এটাই কি যথেষ্ট? 

আজ দেশের গ্রামীণ অঞ্চল থেকে শুরু করে নগরজীবন পর্যন্ত দখলের রাজনীতি, জমি-সম্পদ কিংবা ব্যবসাক্ষেত্র থেকে উচ্ছেদের নৈরাজ্য যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তাতে শুধু একজন ব্যক্তির পদত্যাগ পুরো সংকটের সমাধান করতে পারে না। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি রাজনীতিতে জবাবদিহির যে সার্বিক অভাব তৈরি হয়েছে, তারই একটি প্রকাশ মাত্র। 
বর্তমানে ক্ষমতাসীন পদে কিংবা ক্ষমতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বলয়ে থাকা দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর উচ্চ পর্যায়ের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। দল ও নেতাকর্মীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ থাকা অত্যন্ত জরুরি, যেখানে স্পষ্ট লেখা থাকবে– পাবলিক পদে থেকে বা দলের প্রতিনিধিত্ব করে কী ধরনের আচরণ ও ব্যবহার হওয়া উচিত, আর কী করা যাবে না। সেই স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার জন্ম হচ্ছে। যখনই কেউ ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখনই যেন যে কোনো মূল্যে স্বৈরাচারী উপায়ে দখলদারিত্ব বজায় রাখার এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। 

এটিও স্বীকার করা প্রয়োজন, অসংলগ্ন কিংবা উস্কানিমূলক আচরণ শুধু একক কোনো দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিরোধী দল কিংবা ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা অন্যান্য পক্ষের নেতাদের আচরণে প্রায়ই দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেখা যায়। 

অতি সম্প্রতি অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে দেখা গেছে পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি ও আত্মহত্যার ঘটনার জের ধরে দল থেকে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে স্বপদে বহাল থাকেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে জেলেও নিয়ে যাওয়া হয়। এ ধরনের প্রবণতা নির্দেশ করে যে, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি উভয় ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিদ্যমান, যা আইনশৃঙ্খলা ও মানুষের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়কে আরও প্রকট করে তুলছে। 

বর্তমানে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা। মানুষ যখন দেখতে পায় যে তাদের প্রতিনিধিরাই বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন; দখলদারিত্বে ইন্ধন দিচ্ছেন কিংবা অন্যায়ের আশ্রয় নিচ্ছেন, তখন সাধারণ নাগরিকের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর থেকে বিশ্বাস ও আস্থা উঠে যায়। 
প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও এখন নড়বড়ে। তারা অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে দায়সারা মনোভাব দেখাচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ের অন্যায়গুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া এবং রাজনৈতিক নীতি-নৈতিকতা ছাড়া কেবল সরকার কিংবা দল বদল করে এই জট ছাড়ানো কোনোভাবে সম্ভব নয়। 

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের কাছে ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক আচরণ। কিন্তু ক্ষমতার মসনদে বসলেই যদি কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব জনগণ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে; নাগরিক সমাজের উদ্বেগ কানে না তোলে কিংবা কোনো পরামর্শ বা সংলাপে বসতে অনাগ্রহ দেখায়, তবে সেই শাসনকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন বলা যায় না। কেবল দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে অরাজকতা, মব সন্ত্রাস এবং প্রাতিষ্ঠানিক নৈরাজ্য ঠেকানো সম্ভব হবে না। 

এখন সময় এসেছে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ভেতরকার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার। বেআইনি আচরণ ও পদক্ষেপের দায় নিয়ে একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে প্রয়োজন পুরো শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক চর্চার একটি সুসংগঠিত পরিবর্তন। 
যে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী থেকে নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা উচিত জনগণ কোনো স্বৈরাচারী বা দখলদারভিত্তিক আচরণকে দীর্ঘ মেয়াদে সহ্য করে না। ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত থেকে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা; দখলদারি বন্ধে প্রশাসনিক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখাই পারে বর্তমান সংকট থেকে দেশকে মুক্তি দিতে। অন্যথায় কেবল মুখ বদলাবে, ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন আসবে না।

খুশী কবির: মানবাধিকারকর্মী; সমন্বয়ক, নিজেরা করি
 

আরও পড়ুন

×