ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

চারদিক

পাহাড়ে নারীর জীবন

পাহাড়ে নারীর জীবন
×
×

অংসুই মারমা

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ে অনেক ধরনের গল্প বৃক্ষের পাতার মতো ছড়িয়ে রয়েছে। সেগুলো কখনও তুলে আনা হয় না। বনফুলের মতো সেগুলো একটা সময় ঝরে যায়। হারিয়ে যায়। অথচ এ অনুষঙ্গগুলো অপ্রাসঙ্গিক কিংবা কাল্পনিক নয়, বাস্তবসম্মত। 

বাংলা ভাষার অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অনেক লেখায় মেয়েদের আজীবন কুমারী থেকে যাওয়ার ঘটনা আমরা জানি। বিষয়টি নিয়ে পাহাড়ি সমাজে এ পর্যন্ত তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। মা-বাবা ও তাঁর নিজের জন্য তা এক বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। অনেক পাঠক এসব কাহিনিকে কথাসাহিত্যের অংশ হিসেবে কাল্পনিক ঘটনা মনে করেছেন। 
পরিসংখ্যান মতে, আমাদের দেশে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। সেই অনুপাত পাহাড়ের জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে বলে অনুমেয়। শুরুতেই একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। এ নিবন্ধকার কৈশোরে প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁর প্রতিবেশী এক আত্মীয়ের সঙ্গে তাঁর মায়ের খুব ভাব ছিল। তাঁর নাম উমা (ছদ্মনাম)। উমা ছিলেন সুকেশী, গৌরবর্ণা ও দীর্ঘকায়া। পাকিস্তান আমলে তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম মেট্রিকুলেট এবং সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। পারিবারিক অবস্থা ভালো এবং নামডাক ছিল। তারপরও তাঁর বিয়ে হয়নি। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোয় উপযুক্ত পাত্রও ছিল। পাড়ায় এ নিয়ে কত কানাঘুষা! তাঁর জন্য সম্বন্ধ ঠিক করে দিতে কেউ এগিয়ে আসেনি। 

তাঁর মা-বাবার কাছে যখন কেউ বলেছে, মেয়ের বিয়েটা দিয়ে দেন না কেন? তারা বলেছেন, ‘তোমরা একজন পাত্র ঠিক করে দাও। নেওয়ার লোক না পেলে আমরা কার হাতে তুলে দেব।’ মা-বাবার সে কী এক মর্মান্তিক অভিমত! তাদের অব্যক্ত মনোবেদনার কথা মনে গেঁথে গিয়েছিল সেই কৈশোরে। সেই গুণবতী আত্মীয় (উমা) সামাজিক বিড়ম্বনা এড়াতে লেখকের মায়ের মৃত্যুর পর কখনও গ্রামমুখী হননি। তাঁকে চিরকুমারী থেকে ইহধাম ত্যাগ করতে হয়েছে। ওই সময়ে পাড়ায় আরও তিনজন কুমারীকে দেখেছি, যারা বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারেননি। পাড়ার এক চিরকুমারীর শবদাহের সময় তাঁর পাশে স্বামীর প্রতীকস্বরূপ একটা কলাগাছ দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর ওজা কী আবোল-তাবোল মন্ত্র আওড়েছিল তা আর মনে নেই। এখন বুঝতে পারছি তাঁর সঙ্গে আমাদের সমাজ কী তামাশা না করেছিল! 
এখনও পাহাড়ি মেয়েদের কিছু অংশ বিয়ের পিঁড়িতে বসতে না পেরে কুমারী হিসেবে পুরো জীবন পার করে দিচ্ছেন। পানছড়ি থেকে নাইখ্যংছড়ি পর্যন্ত খোঁজখবর নিলে জানা যাবে, সেখানে অন্তত একটি পাড়ায় চার-পাঁচজন মেয়ের বিয়ে হয়নি। এর মধ্যে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মেয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিয়ে না হওয়া মেয়েদের সমস্যা কাটাতে এ পর্যন্ত কোনো বেসরকারি সংস্থা কাজ করেনি। কারণ এটি তাদের কাছে কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা নয়। অথচ পাহাড়ে সমাজপ্রেমিক, জাতিপ্রেমিক সেজে অযথা অনর্থ বিষয়কে ইস্যু করে মাঠ গরম করার লোকের অভাব নেই। 
পাহাড়ি সমাজে ঘটক পেশার কোনো লোক নেই। মারমার মতো বড় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ঘটক না থাকার বিষয়টি দেখা যায়। সমাজে প্রয়োজনীয় পেশার লোক না থাকায় সমাজ পরিক্রমায় পাহাড়িরা কত পিছিয়ে! 

জানি, অবিবাহিত পাহাড়ি নারীদের এমন সামাজিক ও ধর্মীয় যন্ত্রণা সহজে লাঘব হওয়ার নয়। তবে তাদের জন্য রাষ্ট্র কি এগিয়ে আসতে পারে না? উপযুক্ত প্রশিক্ষণের সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিশেষ কোনো উদ্যোগ নিলে অন্তত এ রকম নারী নিজের মতো করে টিকে থাকতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এগিয়ে আসতে পারে। এতে কুমারিত্বের বেদনা ঘুচবে না, কিন্তু তাঁর জীবনটা অর্থহীন হবে না তাঁর কাছে, সমাজেরও কাছে।

অংসুই মারমা: পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক একজন কর্মকর্তা, লেখক ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন

×