জ্বালানি
বায়োগ্যাসের পরের ধাপ এবং বাণিজ্যিক বায়োমিথেন
শেখ আফনান বিরাহীম
শেখ আফনান বিরাহীম
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে বায়োগ্যাস নতুন নয়। নতুন প্রশ্ন হলো, কয়েক দশকের ছোট ও বিচ্ছিন্ন বায়োগ্যাস ব্যবস্থাগুলোকে আমরা কি একটি বাণিজ্যিক বায়োমিথেন শিল্পে রূপ দিতে পারি? প্রশ্নটি এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় দুই হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন; এর মধ্যে প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট এসেছে আমদানীকৃত এলএনজি থেকে এবং এক হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে। সরকারি হিসাবে একই সময়ে চাহিদা ছিল প্রায় তিন হাজার ৮৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসের সীমাবদ্ধতা ও আমদানিনির্ভরতার এই বাস্তবতায় নতুন উৎস খোঁজা জরুরি। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে গবাদি পশুর বর্জ্য, পোলট্রি লিটার, খাদ্যবর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশের বড় অংশ অপচয় হয়; অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় এগুলো পরিবেশগত সমস্যাও সৃষ্টি করে থাকে।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত ৬৮ হাজারের বেশি বায়োগ্যাস প্লান্টে অর্থায়ন করেছে। অর্থাৎ জৈব বর্জ্য থেকে গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে বায়োগ্যাস আর বায়োমিথেন এক নয়। বায়োগ্যাসে মিথেনের পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড, পানি ও অন্যান্য অমিশ্রণ থাকে। এগুলো সরিয়ে গ্যাস পরিশোধন ও মানোন্নয়ন করলে বায়োমিথেন পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বায়োমিথেনকে প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উপযুক্ত মান নিশ্চিত হলে এটি বিদ্যমান গ্যাস অবকাঠামো, শিল্প এবং প্রাকৃতিক গ্যাসচালিত যানবাহনেও ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে রাজশাহীর ইফাত বায়ো-সিএনজি প্লান্ট লিমিটেড বর্জ্য থেকে সিএনজি ও জৈব সার উৎপাদনের কথা জানিয়েছিল; তবে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অভাবে বাণিজ্যিক বিক্রি শুরু করতে পারেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বাংলাদেশে সিলিন্ডারজাত কমপ্রেসড বায়োগ্যাস ও টেকসই সার তৈরির প্রদর্শনীভিত্তিক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি একেবারে অনুপস্থিত নয়; কিন্তু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ এখনও বড় ও সুসংগঠিত বাণিজ্যিক বাজারে রূপ নেয়নি।
প্রধান বাধা তাই শুধু প্রযুক্তি নয়; বাজার, কাঁচামাল সরবরাহ, অর্থায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয়। বড় পরিসরে বায়োমিথেন উৎপাদনের জন্য বহু খামার থেকে নিয়মিত কাঁচামাল সংগ্রহ, নির্ভরযোগ্য পরিবহন, কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণ, গ্যাস পরিশোধন, মান নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা দরকার। উৎপাদিত গ্যাস কে কিনবে, কী দামে কিনবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্রয় নিশ্চিত হবে কিনা, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক, সংগ্রাহক, প্লান্ট, অর্থদাতা ও গ্যাস ক্রেতাকে একই ব্যবস্থায় যুক্ত না করা গেলে শুধু নতুন প্লান্ট স্থাপন করে কাঙ্ক্ষিত বাজার তৈরি হবে না।
প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন–পিকেএসএফের স্মার্ট প্রকল্পের আওতায় ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি দল সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও মুন্সীগঞ্জের দুগ্ধ এলাকায় সমাজভিত্তিক বায়োগ্যাস প্লান্টের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। পিকেএসএফ ও তার অংশীদার সংস্থাগুলোর বিস্তৃত মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি ভবিষ্যৎ প্রকল্পে কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করার কার্যকর ভিত্তি হতে পারে। একই সঙ্গে স্রেডা জানিয়েছে, জাতীয় বায়োগ্যাস গাইডলাইন অনুমোদনের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং এটি খাতটির বাণিজ্যিক প্রসারে সহায়ক হতে পারে। এখন শুধু প্রয়োজন এই প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহকে বাণিজ্যিক বায়োমিথেনের দিকে আরও সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার।
বাস্তবে মডেলটি উপজেলাভিত্তিক হতে পারে। একটি দুগ্ধ ও পোলট্রি-ঘন এলাকায় কয়েকশ খামার থেকে প্রতিদিন গোবর ও অন্যান্য উপযুক্ত জৈব বর্জ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। স্থানীয় সংগ্রাহক তা নির্দিষ্ট সংগ্রহ কেন্দ্রে আনবেন। ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থায় সরবরাহের পরিমাণ নথিবদ্ধ হবে এবং কৃষক বা সরবরাহকারী মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ পাবেন। সেখান থেকে কাঁচামাল যাবে কেন্দ্রীয় বায়োগ্যাস প্লান্টে। উৎপাদিত বায়োগ্যাস পরিশোধন ও মানোন্নয়ন করে বায়োমিথেন বা বায়ো-সিএনজি তৈরি করা যাবে এবং তা নিকটবর্তী শিল্প, পরিবহন খাত বা অন্য উপযুক্ত ক্রেতার কাছে বিক্রি করা সম্ভব হবে। অবশিষ্ট পুষ্টিসমৃদ্ধ জৈব পদার্থ প্রক্রিয়াজাত করে সার হিসেবেও বাজারজাত করা যেতে পারে। এতে গ্যাস ও প্রক্রিয়াজাত জৈব সার থেকে দুটি সম্ভাব্য আয়ধারা তৈরি হতে পারে।
জাতীয় অর্থনীতির লাভ শুধু অতিরিক্ত গ্যাসে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালে জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহের অস্থিরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। দেশীয় বায়োমিথেনের কার্যকর বাজার তৈরি হলে এলএনজি-নির্ভরতা আংশিক কমানো, গ্রামীণ আয় বাড়ানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং জৈব সারের নতুন সরবরাহ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এটিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্লান্ট ও সরবরাহব্যবস্থায় মিথেনের অনিয়ন্ত্রিত নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ না করলে এর পরিবেশগত সুবিধার একটি অংশ নষ্ট হতে পারে।
তাই এখনই দেশজুড়ে নতুন প্লান্ট তৈরি না করে প্রথমে ১০ থেকে ২০টি উচ্চ সম্ভাবনাময় দুগ্ধ ও পোলট্রি এলাকায় পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি প্রকল্পকে অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে–নিয়মিত ও সাশ্রয়ীভাবে পর্যাপ্ত কাঁচামাল পাওয়া যায় কিনা; গ্যাস ও সার বিক্রি করে প্রকল্পটি আর্থিকভাবে টেকসই হয় কিনা; এবং কৃষক ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য যথেষ্ট আয় তৈরি হয় কিনা। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ক্রেতা, গ্যাসের দাম, পরিবহন ব্যয় ও মিথেন নিঃসরণের মাত্রাও পরিমাপ করতে হবে। পরে সফল প্রকল্পগুলো থেকে পাওয়া বাস্তব তথ্য থেকে মূল্যনীতি, দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়ব্যবস্থা, অর্থায়ন ও জাতীয় সম্প্রসারণের কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তাই শুধু আরও বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন নয়; প্রয়োজন বায়োগ্যাসের পরের ধাপে যাওয়া। গ্রামের বর্জ্যকে যদি কৃষকের আয়, স্থানীয় উদ্যোগ, অর্থায়ন ও জ্বালানি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে বায়োমিথেন বাংলাদেশের দেশীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি নতুন ও বাস্তবসম্মত স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।
শেখ আফনান বিরাহীম: গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অব কম্পিউটিং সায়েন্সে অধ্যয়নরত