ফিলিস্তিন-ইসরায়েল
জাতিসংঘে ওয়াকআউট: কী বার্তা দিল বিশ্ব?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভাষণ শুরু করতেই বিভিন্ন দেশের বহু প্রতিনিধি আসন ছেড়ে বেরিয়ে যান।
মো. আবু তালেব
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:৩০
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চ। এখানে কথা বলেন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানরা। এখানে উচ্চারিত হয় যুদ্ধ ও শান্তির কথা। বলা হয় মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের কথা। বলা হয় মানুষের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা। ২৪ সেপ্টেম্বর সেই মঞ্চে দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভাষণ শুরু করতেই বিভিন্ন দেশের বহু প্রতিনিধি আসন ছেড়ে বেরিয়ে যান। কয়েক মুহূর্তে সাধারণ পরিষদের হলের অনেক আসন ফাঁকা হয়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে বড় একটি কূটনৈতিক বার্তা। প্রশ্ন হলো–সেই বার্তা কী?
খালি চেয়ারও কথা বলে। কূটনীতিতে প্রতিটি শব্দের মূল্য আছে। আবার নীরবতারও মূল্য আছে। কখনও কখনও একটি খালি চেয়ার দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়েও বেশি কিছু বলে। নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় খালি হয়ে যাওয়া আসনগুলো সেই নীরব বার্তাই দিয়েছে। ইসরায়েল অবশ্য এই ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখেছে। নেতানিয়াহু ওয়াকআউটকারীদের তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে আত্মরক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। গাজায় গণহত্যার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন। অর্থাৎ একই ঘটনা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য দুই রকম। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
গাজার বাস্তবতা উপেক্ষা করা কঠিন। এই মতবিরোধের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ গাজার মানবিক পরিস্থিতি। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের ১৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় প্রায় দুই কোটি নয়, প্রায় ২১ লাখ মানুষের অধিকাংশই বাস্তুচ্যুত। অনেক মানুষ এখনও নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার সংকটে আছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ১২ শতাংশ গাজাবাসী পরিবারের খাদ্য গ্রহণের মান ছিল দুর্বল। ৭৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে তাদের আয় কমেছে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিবার সংকট মোকাবিলায় কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করছে। খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখে পৌঁছেছে। বাসস্থানের চিত্রও ভয়াবহ। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের আগস্টের হিসাবে, গাজার প্রায় ১ দশমিক ৯৮ মিলিয়ন মানুষ, অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রায় ৯৪ শতাংশ, আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় অ-খাদ্য সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে ছিল। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশ মানুষ গুরুতর বা বিপর্যয়কর আশ্রয় সংকটে ছিল। এগুলো কেবল সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার। একজন শিশু। একজন মা। একজন বৃদ্ধ। একজন আহত মানুষ। তাই কূটনৈতিক মঞ্চে গাজার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২৪ সেপ্টেম্বর বলেছেন, গাজার পরিস্থিতি এখনও অসহনীয়। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলি হামলায় গড়ে প্রতিদিন চারজন মানুষ নিহত হচ্ছেন। তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু। তিনি মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন রক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। এ বক্তব্যের তাৎপর্য গভীর।
কারণ যুদ্ধের মধ্যেও কিছু সীমা থাকে। বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করতে হয়। শিশুদের রক্ষা করতে হয়। হাসপাতাল ও মানবিক স্থাপনা রক্ষা করতে হয়। ত্রাণ পৌঁছাতে দিতে হয়। এগুলো কোনো পক্ষের রাজনৈতিক দাবি নয়। এগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক প্রশ্ন।
ওয়াকআউট কি সমাধান? অবশ্যই নয়। ওয়াকআউট একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা দিতে পারে। এতে যুদ্ধ থামে না। ক্ষুধার্ত মানুষের পেটে খাবার যায় না। ধ্বংস হওয়া হাসপাতাল পুনর্নির্মিত হয় না। বাস্তুচ্যুত পরিবার ঘরে ফিরতে পারে না। তাই ওয়াকআউটের পরের কাজ আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বনেতাদের এখন কথা বলতে হবে। শুধু কথা বললেই হবে না। প্রথম কাজ হওয়া উচিত বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় কাজ মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করা। তৃতীয় কাজ জিম্মি ও আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। চতুর্থ কাজ যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা। পঞ্চম কাজ হলো এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন–উভয় জনগণের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হয়।
জাতিসংঘের সামনে বড় পরীক্ষা। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার প্রত্যয়ে। সেই জাতিসংঘের সামনেই আজ একাধিক যুদ্ধ। ইউক্রেন। গাজা। মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত উত্তেজনা। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত। এই বাস্তবতায় জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় পরীক্ষার মুখে। বিশ্বের মানুষ জানতে চায়, জাতিসংঘ কি কেবল বক্তব্যের জায়গা? নাকি এটি বাস্তব সংকটে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে? জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র আছে। এত বিশাল একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চের শক্তি তার সংখ্যায় নয়। শক্তি তার নৈতিক ও কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতায়। সেই গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে হলে একই মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। মিত্রের ক্ষেত্রেও। প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও। শক্তিশালী দেশের ক্ষেত্রে। দুর্বল দেশের ক্ষেত্রেও।
বাংলাদেশের জন্যও বার্তা আছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছে। তাই জাতিসংঘের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি পরিচিত ভিত্তি হলো আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন। এই নীতির জায়গা থেকে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত স্পষ্ট এবং ভারসাম্যপূর্ণ। বাংলাদেশকে বলতে হবে, বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি গ্রহণযোগ্য নয়। মানবিক সহায়তায় বাধা গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে বেসামরিক জিম্মি করা বা নির্বিচারে সহিংসতাও গ্রহণযোগ্য নয়। মানবতার প্রশ্নে দ্বৈত মানদণ্ড চলতে পারে না।
খালি চেয়ার থেকে খোলা প্রশ্ন। নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় যে চেয়ারগুলো খালি হয়েছে, সেগুলো আসলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশ্ব কি গাজার মানুষের কষ্ট দেখছে? আন্তর্জাতিক আইন কি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হবে? জাতিসংঘ কি যুদ্ধ থামাতে আরও কার্যকর ভূমিকা নেবে? ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মানুষের জন্য কি একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধান তৈরি হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ওয়াকআউট দিয়ে পাওয়া যাবে না। উত্তর দিতে হবে কার্যকর কূটনীতি দিয়ে। দিতে হবে মানবিক সহায়তা দিয়ে। দিতে হবে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ দিয়ে। দিতে হবে রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ দিয়ে। জাতিসংঘে ওয়াকআউট তাই শেষ কথা নয়। এটি একটি সংকেত। বিশ্বের একটি বড় অংশ যে গাজা প্রশ্নে আর নীরব থাকতে চাইছে না, সেটিই হয়তো এ ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কিন্তু প্রতিবাদের পর দায়িত্ব আরও বড়। খালি চেয়ার যদি সত্যি কোনো বার্তা দিয়ে থাকে, তবে সেই বার্তাকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে হবে। কারণ জাতিসংঘের মঞ্চে বক্তৃতা অনেক হতে পারে। যুদ্ধ থামাতে পারে কেবল কার্যকর সিদ্ধান্ত। মানুষকে বাঁচাতে পারে কেবল মানবিক পদক্ষেপ। স্থায়ী শান্তি আনতে পারে কেবল ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক সমাধান। বিশ্ব এখন সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
ড. মো. আবু তালেব: অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)