প্রতিবেশী
সিইসির কারণে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থাই ঝুঁকিতে
শশী থারুর
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার ঘিরে বিতর্ক দিন দিন বাড়ছে। এতে জনবিক্ষোভ, সংসদীয় সংঘাত, জোট রাজনীতির সমীকরণ, আইনি চ্যালেঞ্জ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার এক জটিল মেলবন্ধন সামনে এসেছে। এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন স্তর থেকে আসা নজিরবিহীন চাপ, যা একজন সাংবিধানিক প্রধান কীভাবে জনসমক্ষে ওঠা প্রশ্ন বা ট্রলিং সামলাবেন, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। এটি আরেকটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি জবাবদিহির সুযোগ দেয়, নাকি অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি দুর্ভেদ্য বাধা তৈরি করে?
জনগণের অসন্তোষ মাঠে-ঘাটে ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারী, ছাত্র সংগঠন এবং প্রধান রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে সবচাইতে উদ্যমী দল কংগ্রেসের সংগঠিত প্রতিবাদের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই আন্দোলনগুলোর লক্ষ্য হলো দেশের প্রধান প্রধান শহরে জনমত গড়ে তোলা। কংগ্রেস চলতি সপ্তাহেই সিইসির বিরুদ্ধে ৯৩০টি প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে এবং সামনে আরও আন্দোলন রয়েছে। মাঠ পর্যায়ের এই উদ্দীপনার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে বিরোধী জোটের রাজনৈতিক তৎপরতা। বিরোধী নেতারা কেবল সিইসির অবিলম্বে পদত্যাগই দাবি করেননি; ক্ষমতাসীন দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে ফৌজদারি মামলারও আহ্বান জানিয়েছেন।
সংসদে বিরোধী আইনপ্রণেতারা সিইসির অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সংসদীয় পথগুলো ব্যবহারের চেষ্টা করবেন। এর আগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে তাঁকে সরানোর জন্য দেওয়া নোটিশ উভয় কক্ষের স্পিকার ও চেয়ারম্যান খারিজ করে দিয়েছিলেন। তবে এখন কংগ্রেসের সংসদ সদস্যরা ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের সঙ্গে নিয়ে নতুন করে অভিশংসনের নোটিশ প্রস্তুত করছেন। তবে সিইসিকে অপসারণের সাংবিধানিক শর্ত অত্যন্ত কঠিন। এটি ইচ্ছাকৃতভাবেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অভিশংসন পদ্ধতির আদলে তৈরি করা হয়েছে। ২০২৩ সালের চিফ ইলেকশন কমিশনার অ্যান্ড আদার ইলেকশন কমিশনার্স অ্যাক্টের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন কমিশনার রাষ্ট্রপতির কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে সরে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু তাঁকে বরখাস্ত করতে হলে সংসদীয় নেতৃত্বের কাছে আবেদন গ্রহণ এবং উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট প্রয়োজন, যা সরকারের সমর্থন ছাড়া কার্যত অসম্ভব।
যেহেতু বর্তমান সরকার টিকে থাকার জন্য এই শরিকদের ওপর নির্ভরশীল, তাই তাদের প্রকাশ্যে তোলা প্রশ্নগুলো সেই প্রশাসনিক সুরক্ষা দেয়ালকে ধসিয়ে দিতে পারে, যা নির্বাহী বিভাগ সাধারণত সিইসির মতো সাংবিধানিক পদে নিযুক্ত ব্যক্তিকে দিয়ে থাকে। ধর্মেন্দ্র প্রধানের মতো প্রভাবশালী বিজেপি নেতাকে যদি দল অনায়াসে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, তবে জ্ঞানেশ কুমারের মতো একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে ঝেড়ে ফেলা আরও সহজ হবে, যদি তাঁর বিতর্কগুলো সরকারের অতিরিক্ত বোঝায় পরিণত হয়।
পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়ে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী বার্তা দিচ্ছে– সংসদের হট্টগোল, রাজপথের আন্দোলন বা সংবাদ সম্মেলন দিয়ে নির্বাহী সিদ্ধান্ত বা পদত্যাগ করানো যাবে না। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সিইসির পদত্যাগ বিরোধীদের জন্য বড় জয় হিসেবে গণ্য হবে, যা অতীতের নির্বাচনগুলোর ওপর প্রশ্ন তুলবে এবং আসন্ন রাজ্য নির্বাচনগুলোর আগে অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। বিজেপির এই অনমনীয় মনোভাব দলীয় কর্মী ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের আশ্বস্ত করে– সাময়িক সংবাদের ঝড়ে সরকার কাউকে বলির পাঁঠা না বানিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের পাশে থাকবে।
তবুও সিইসি হিসেবে জ্ঞানেশ কুমারের বহাল থাকা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করছে, যা ছাড়া আমাদের পুরো নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকে। মাত্র কয়েক বছর আগেও এই ভারতীয় নির্বাচন কমিশন পুরো বিশ্বের জন্য একটি রোল মডেল ছিল। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়নশীল ও উদীয়মান গণতন্ত্রের দেশগুলো কীভাবে তাদের নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করবে, তার পরামর্শ নিতে এই কমিশনের কাছে যেত। আর আজ যে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ রেকর্ড ১৩ কোটি ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে এবং একটি বুথকে মাত্র একজন ভোটারের জন্য নির্ধারণের মতো বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে, তাদের কার্যকলাপে বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধিক সম্মানিত গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের সুনাম প্রহসনে পরিণত হয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনগুলোর কথা মাথায় রেখে কর্তৃপক্ষের উচিত এই বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়ায় স্থগিতাদেশ দেওয়া, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের রেকর্ড জনসমক্ষে আনা এবং সফটওয়্যার পরিবর্তন ও নাম কাটার একটি স্বাধীন নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা। এসব উদ্বেগের বিশ্বাসযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধারাবাহিক নির্বাচন সেই গণতন্ত্রের সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।
শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী; দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- শশী থারুর