ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সমাজ

‘ফার্মের মুরগি’ বনাম আত্মনির্ভরশীলতা

‘ফার্মের মুরগি’ বনাম আত্মনির্ভরশীলতা
×
×

শিল্পী রহমান

শিল্পী রহমান

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৪ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা তখন স্কুলে পড়ি; একবার আমাদের পাড়ার একজনের বাড়িতে চুরি হয়েছিল। পরদিন সকালে পাড়াজুড়ে উত্তেজনাময় গল্প। চোর নাকি রাত ৩টার পর এসেছিল, অথচ বাড়ির কেউ কিছুই টের পায়নি। বড়রা বলাবলি করছিলেন, বাড়ির সবাই নাকি ‘মরণঘুমে’ ছিল। পুরো বাড়ি খালি করে সবকিছু নিয়ে গেছে, অথচ কেউ কোনো আওয়াজ শোনেনি।

পরে জেনেছিলাম, চোর ক্লোরোফর্ম বা এ জাতীয় কিছু ব্যবহার করে সবাইকে গভীর ঘুমে নিমজ্জিত করে তারপর চুরি করেছিল। চোর আর ডাকাতের মধ্যেও একটা পার্থক্য ছিল। চোর রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে চুরি করত। আর ডাকাত ছিল প্রকাশ্য– দিনের বেলাতেও মানুষের কাছ থেকে জিনিস কেড়ে নিতে পারত। অস্ত্র ব্যবহার করত মূলত ভয় দেখানোর জন্য। তখনও অপরাধ ছিল, কিন্তু সেই অপরাধের একটা সীমারেখা ছিল।

এখন ১০ টাকা নিয়ে বচসা হলে বা না বলে ভাত খেলে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। চকলেট বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে শিশুকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের কথা আমরা জেনেছি। 

অপ্রতিমের কথা লিখতে আমি দেরি করে ফেলেছি। এরপর আরও একজনের অকালমৃত্যু হলো। এমন অনেক অপরাধের কথা লিখে শেষ করতে পারি না; আরেকটা অপরাধের খবর চলে আসে। 

আমরা সন্তানদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে তিরস্কার করেছি। এটা নিয়ে অনেক হইচইও হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাদের নিরাপদ একটা সমাজ দিতে পেরেছি?

সত্তর-আশির দশকে একা একা হেঁটে স্কুলে গিয়েছি আমরা; রিকশায় করে একাই কলেজে গিয়েছি। কোথায় আছি, কেমন আছি, কখন ফিরব– এসব জানার কোনো প্রযুক্তি ছিল না তখন। তারপরও বাবা-মা নিশ্চিন্ত থাকতেন। কারণ একটা বিশ্বাস ছিল– সন্তান ফিরে আসবে।

সামনের দোকানের চাচা, পাড়ার বড় ভাই বা আপা অথবা কোনো মুরুব্বি এলাকার সন্তানদের দেখে রাখবেন; প্রতিবেশী প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াবেন– একটা অলিখিত দায়িত্ববোধ ছিল সবার মনে। এখন তা নেই। মানুষ দূরে দাঁড়িয়ে ভিডিও করলেও ঝাঁপিয়ে পড়ে সাহায্য করতে আসে না। পাড়ার বড় ভাইদের তো অপ্রতিমকে নিরাপদে রাখার কথা ছিল। দুঃখজনক– রক্ষকই ভক্ষক হয়ে গেছে।

আমি সন্তানদের সারাক্ষণ কোলের মধ্যে আগলে রেখে বড় করার পক্ষপাতী নই। আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক সন্তানকে আত্মনির্ভরশীল হতে হবে; ভালো-মন্দ বিচারের বুদ্ধি থাকতে হবে। পৃথিবীকে চিনতে হবে; নিজ পায়ে দাঁড়াতে হবে। ফার্মের মুরগি বানানোর ঘোর বিরোধী আমি। কিন্তু যখন তুচ্ছ ঘটনায় মানুষ খুন হয়ে যায়, তখন কোন ভরসায় বাবা-মা তার সন্তানকে একা ছাড়বেন? সেই নিরাপত্তা তো দিতে হবে!

এসব ঘটনা শোনার পর কোনো বাবা-মা যদি সন্তানকে চোখের আড়াল করতে ভয় পান, তাদের কি দোষ দেওয়া যায়? কিংবা তাদের কি সত্যিই ‘ফার্মের মুরগি’ বলে তিরস্কার করা যায়? যায় না। আমরা তাদের স্বাধীনতা দিতে চাই; মুক্ত মাঠে ছেড়ে দিতে চাই; ধুলোবালিতে খেলে বড় হবে ওরা– এমন স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। তার আগে তাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি চাই।

আমার কাছে এই সংকটের পেছনে মাদক, বিশেষ করে ইয়াবার বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে হয়। কারণ ইয়াবা মানুষকে অমানুষে পরিণত করে। অনিয়ন্ত্রিত রাগ এবং অনিয়ন্ত্রিত যৌন চাহিদার কারণে দেশজুড়ে ধর্ষণ ও খুনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। একটি সুস্থ সমাজ পেতে হলে এটা বন্ধ করতে হবে। এর সঙ্গে আরও অনেক সামাজিক কারণ জড়িয়ে আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। যেমন– পারিবারিক শিক্ষা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, সহিংসতার সংস্কৃতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অপরাধের ন্যায়বিচার ও প্রতিরোধের দুর্বলতা– সবকিছু নিয়ে আমাদের কথা বলতে হবে। শুধু কথা বললেই হবে না; প্রতিকার চাই! 

কারণ আমরা এমন একটি দেশ চাই না, যেখানে সন্তানকে বড় করার অর্থ হবে তাকে সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখা। আমরা এমন একটা দেশ চাই, যেখানে একটা শিশু বিকেলে খেলতে বের হলে মা বারবার ফোন করে বলবেন না, ‘কোথায় আছিস? কখন ফিরবি?’

যেখানে স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হলে বাবা-মায়ের বুক ধড়ফড় করবে না। যেখানে প্রতিবেশী মানে শুধু পাশের বাড়ির মানুষ নয়। প্রয়োজনে ভিডিও করা বাদ দিয়ে নিজ সন্তানের মতো অন্যের সন্তানকেও আগলে রাখা একজন মানুষ।

বলা হয়, একটা সন্তানকে বড় করতে পুরো একটা গ্রাম লাগে। আমাদের সেই গ্রামটা আবার তৈরি করতে হবে। মা-বাবা একা পারবেন না। স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রও একা পারবে না। আমাদের সবাইকে মিলে এমন এক সমাজ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিশুরা ভয় নয়; নিরাপত্তা নিয়ে বড় হবে। যেখানে রাগ বা হিংসার চেয়ে বিবেক শক্তিশালী হবে; যেখানে মানুষের জীবনের মূল্য থাকবে। যেখানে অপরাধী হওয়ার আগে মানুষ একবার হলেও ভাববে– ‘ও-ও তো কারও সন্তান’ অথবা ‘এই অপরাধ করলে আমার শাস্তি হবে’। আমরা আমাদের সন্তানদের পৃথিবী থেকে লুকিয়ে রাখতে চাই না। আমরা চাই তারা পৃথিবীকে নির্ভয়ে চিনুক; একা স্কুলে যাক; বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলে মাঠে খেলুক; নিজের মতো বড় হোক।

সন্তানের নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়। এটা কোনো দল, শ্রেণি, ধর্ম বা জাতির বিষয় নয়। কোনো পরিবারের একার দায়িত্বও নয়। এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। আসুন, আমরা আবার সেই সমাজ তৈরি করি, যেখানে একটি সন্তানকে বড় করতে সত্যিই পুরো গ্রাম পাশে থাকে। সন্তানের নিরাপত্তাই হোক দেশের নাম্বার ওয়ান প্রায়োরিটি।

শিল্পী রহমান: কাউন্সেলর, অস্ট্রেলিয়া

আরও পড়ুন

×