ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সামাজিক মাধ্যম

শৈশব কি শুধু আটলান্টিকের ওপারে

শৈশব কি শুধু আটলান্টিকের ওপারে
×
×

গৌতম মণ্ডল

গৌতম মণ্ডল

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৬ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সোশ্যাল মিডিয়া নামের অদৃশ্য সুতোর বন্ধনে যখন গোটা বিশ্ব, তখন আটলান্টিকের ওপারে অন্যরকম এক আইনি লড়াই। শৈশব বাঁচানোর সেই লড়াই আমাদের আলো দেখায়। ‘সোশ্যাল মিডিয়া শিশুবান্ধব হয়ে উঠছে’– এমন ভাবতে শেখায়। কিন্তু আশার সেই আলোয় দাঁড়িয়েও নিজের অন্ধকারটুকু ভুলে থাকার সুযোগ আছে? 

প্রশ্নটা মাথায় বেশ কিছুদিন। উত্তর খুঁজতে গিয়ে উল্টো প্রশ্নের সংখ্যা বেড়েছে। হিসাব মেলেনি, মিলছে না। বরং অস্বস্তির দেয়ালটা উঁচু হয়েছে। সামনে এসেছে গ্লোবাল সাউথের বাস্তবতা।
২০২৩ সালের অক্টোবরের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল কোর্টে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা প্ল্যাটফর্মসের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। ৩৩টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল জোট হয়ে মামলাটি করেন। পরে বাদীর সংখ্যা কমে হয় ২৯। গেল আগস্টে ওকল্যান্ডের ফেডারেল কোর্টে শুরু হয় আলোচিত সেই মামলার বিচার কার্যক্রম।

অভিযোগগুলো অবশ্য পুরোনো। তবে গুরুতর একটি অভিযোগ হলো, তরুণ প্রজন্মকে নিজের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে মেটা এমনভাবে অ্যাপসের নকশা করেছে, যা এক পর্যায়ে তাদের দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার মতো মানসিক সমস্যায় ঠেলে দিচ্ছে। অনুমতি ছাড়া ১৩ বছরের কম বয়সীদের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও আনা হয়েছে মামলায়। তবে আদালতে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেটার আইনজীবী।

ধারণা করা হয়েছিল, মামলার এই পর্যায়ের বিচার কার্যক্রম চলবে কয়েক সপ্তাহ। সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয় আছে অনেক। কিন্তু চার দিন পরই গত ২৬ আগস্ট একটি সমঝোতায় পৌঁছে বাদী-বিবাদীপক্ষ। মজার ব্যাপার, আদালতে দায় স্বীকার না করলেও ১৮ বিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছে মার্ক জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান মেটা প্ল্যাটফর্মস। আগামী ১০ বছরে এই অর্থ ভাগ করে দেওয়া হবে বাদী অঙ্গরাজ্যকে। পাশাপাশি ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের ফিচারে বড় পরিবর্তন আনতেও সম্মত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি। কেউ কেউ বলছেন, সমঝোতাটি ‘নজিরবিহীন’। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহারকারীদের অভ্যাস বদলে দিতে এই প্রথম ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের মূল ফিচারে বড় পরিবর্তন আসছে।

সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, শিশু-কিশোরদের জন্য রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম। ব্যতিক্রম হতে পারে কেবল অভিভাবকের সম্মতিতে। আর ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীরা প্রতিদিন অ্যাপ দুটি চালাতে পারবে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা। স্কুলের সময়ে অর্থাৎ সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে নোটিফিকেশন; লাইক-রিঅ্যাকশন সাইন দেখা যাবে না। মেটা বলেছে, এসব ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অভিভাবকদের নজরদারির সুযোগ বাড়বে। 

ফোর-এইচ মডেলের অভিযোগ

গবেষণা বা অনুসন্ধানের জন্য নয়; ব্যক্তিগত আগ্রহের জায়গা থেকেই নজর রাখছিলাম ওকল্যান্ডের মামলার দিকে। উভয় পক্ষের আইনজীবী ছাড়াও চার দিনের শুনানিতে মনস্তত্ত্ববিদ ও মেটার সাবেক কর্মীর কথা শোনেন আদালত। আটলান্টিকের এপার থেকে তাদের সেই কথা শুনে ‘বিস্মিত হয়েছি’ বলব না। কারণ যুক্তিতর্কে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তার অধিকাংশই কমবেশি জানা, যদিও কিছু তথ্য নতুন। 

সোশ্যাল মিডিয়া আগের জায়গায় নেই– এটি নতুন কথা নয়। এর ভেতর অ্যালগরিদম ‘খেলা করে’; সেটিও জানা। প্রযুক্তিবিদরা বলেন, ডিজিটাল দুনিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্য কারিগর হলো অ্যালগরিদম। এটিই মানুষের আচরণ ও পছন্দ দেখে কনটেন্ট সাজায়; মনোযোগ ধরে রাখার কৌশল নির্ধারণ করে। 

ক্যালিফোর্নিয়ার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মেগান ও’নিল বলেছেন, মেটার ব্যবসায়িক কৌশলকে ‘ফোর-এইচ’ দিয়ে বোঝানো যায়– ‘হুক, হোল্ড, হারভেস্ট ও হাইড’। শুনানিতে তিনি বলেন, ‘‘মেটা প্রথমে ব্যবহারকারীদের তার জালে টেনে আনে বা ‘হুক’ করে। তারপর যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখে বা ‘হোল্ড’ করে। এরপর তাদের তথ্য সংগ্রহ বা ‘হারভেস্ট’ করে। সব শেষে আসল সত্যটা গোপন বা ‘হাইড’ করে।” মডেলটি শিশুদের ক্ষেত্রে দারুণ কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি (দ্য গার্ডিয়ান, ২২ আগস্ট ২০২৬)।

খেয়াল করেছি, শুনানিতে ‘স্টার উইটনেস’ বা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন মেটার সাবেক নিরাপত্তা প্রকৌশলী আর্তুরো বেজার। ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দুই মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেন তিনি। নিজের কিশোরী মেয়েকে ইনস্টাগ্রামে যৌন প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনা জুরিদের সামনে তুলে ধরেন এ প্রযুক্তিবিদ। দাবি করেন, সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের অভ্যন্তরীণ রিপোর্টিং ব্যবস্থায় এমন ঘটনার যথাযথ প্রতিকার পাওয়া কঠিন। শিশুদের নিরাপত্তা প্রশ্নে মেটা অনেক সময় ‘ডোন্ট আস্ক, ডোন্ট টেল’ নীতি অনুসরণ করে বলেও অভিযোগ করেন বেজার। শুধু তাই নয়, এসব উদ্বেগের বিষয়ে মেটার ভেতর আগে থেকেই আলোচনা ছিল বলে আদালতে জানান তিনি। 

আর্তুরো বেজারের এই সাক্ষ্য নিয়ে জোর আপত্তি রয়েছে। তবে মেটার আইনজীবী পল শ্মিট আদালতে বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে অনেকে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন– এতে কোনো দ্বিমত নেই। তবে সমস্যাগুলো সমাধানের টুলসও রয়েছে।’ মেটা ১৩ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেয় না এবং এরই মধ্যে এমন ১০ লাখের বেশি অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করার দাবি করেন তিনি (দি আইরিশ টাইমস, ১৮ আগস্ট ২০২৬)।

অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ যা-ই উঠুক, এই মামলার দীর্ঘ ধারাবাহিকতার বিবরণ অবশ্যই আমার আজকের আলোচনার মূল বিষয় নয়। বরং সোশ্যাল মিডিয়ার এই জামানায় শৈশব কতটা নাজুক, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তাকাতে চাই সে বাস্তবতার দিকে।

তাহলে আমাদের শিশুরা কোথায়?
ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে চার দিনের শুনানি ৬০ কিলোমিটার দূরে সিলিকন ভ্যালির ভেতরে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে তার সবটা হয়তো বাইরে আসেনি। তবে ওই আইনি ঝড়ের ঢেউ আটলান্টিক পেরিয়ে যখন বঙ্গোপসাগরের কূলে এসে পড়ে, তখন একটি প্রশ্নই ওঠে– আমাদের শিশুদের ভাগ্যে তাহলে কী রয়েছে? 

যুক্তরাষ্ট্রে যা বিলিয়ন ডলারের আইনি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য তা কি কোনো অর্থ বহন করে? আমাদের দেশেও তো শৈশব ফেরাতে এখন ঘরে-বাইরে নানা আয়োজন, ‘আন্দোলন’। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো আমরাও তো অনেক কিছু হারিয়ে ফেলছি সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমে! তাহলে শৈশবের সুরক্ষা কেন শুধু আটলান্টিকের ওপারে? কেন নয় ভোলার মনপুরার চরে? উত্তর না মিললেও প্রশ্নগুলো জোরালোভাবে উঠছে।

মেটা ও অ্যালফাবেটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্লোবাল নর্থ ও গ্লোবাল সাউথের শিশুদের নিরাপত্তার মানদণ্ড (যেমন প্যারেন্টাল কন্ট্রোল) বাস্তবে কতটা সমান– সে প্রশ্নও করছেন কেউ কেউ। এমন অনেক প্রশ্নের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ার দরজায় প্রহরী বসানোর মতো বাস্তবতা আমাদের সামনে। 

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট খোলা ও রাখায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে অস্ট্রেলিয়া। শিশুদের সরাসরি শাস্তি দেওয়ার বদলে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বয়সসীমা কার্যকরের দায়িত্ব দিয়েছে দেশটি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। আইন করে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার কথা বলেছে যুক্তরাজ্য। কানাডা সরকারও সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব করেছে। সব মিলিয়ে গোটা পৃথিবী এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে ‘প্রযুক্তির আলো জ্বালিয়ে’ তার উত্তাপ থেকে বাঁচতে যেন নতুন দেয়াল তুলতে হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞাই কি সমাধান?
শিশুদের সুরক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাকে সহজ সমাধান মনে হতে পারে। কিন্তু উৎসুক মনকে শুধু আইনের বেড়াজালে আটকে রাখা কঠিন। অস্ট্রেলিয়ায় বয়সসীমা কার্যকর করার পর বয়স যাচাই পদ্ধতি, ভুয়া তথ্য ব্যবহার ও বিকল্প প্ল্যাটফর্মে চলে যাওয়ার মতো নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দেশটির সাংবিধানিক পরিষদ মনে করে, এমন নিষেধাজ্ঞা শিশু-কিশোরদের মতপ্রকাশ ও যোগাযোগ স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ (রয়টার্স, ১৪ আগস্ট ২০২৬)।

তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট থাকবে কিনা– প্রশ্নটি শুধু সেখানে নয়। বরং তারা সেখানে কী দেখছে, কেন দেখছে এবং কে তাদের সামনে সেই কনটেন্ট পৌঁছে দিচ্ছে– আসল প্রশ্নটি এখানে। অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা, অ্যাপসের নকশা, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা তৈরির দিকে না তাকিয়ে কেবল বয়সসীমা বেঁধে দিলে বিষয়টি ‘জানালা খোলা রেখে দরজা বন্ধ করার’ মতোই হবে। তাতে হয়তো আত্মতৃপ্তি মিলবে; ডিজিটাল দুনিয়ায় শিশুদের উড়ে বেড়ানোর খোলা আকাশ তৈরি হবে না। 

তারা পাচ্ছেন ‘নাইট-টাইম বার’
ওকল্যান্ডের আদালতে ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতাকে মেটার আইনি পরাজয় বলা যাবে না। এটি জরিমানা নয়। নিছক আর্থিক লেনদেন হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। কেননা, এর সঙ্গে পরিবর্তনের অনেক অঙ্গীকার যুক্ত। ঘটনাটির আসল তাৎপর্য হয়তো এখানেই; অর্থের অঙ্কে নয়।

মার্কিন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আদালতের দ্বারস্থ হতে পেরেছেন, তাদের শিশুরা পাচ্ছে এক ধরনের ‘নাইট-টাইম বার’ বা রাত্রিকালীন সুরক্ষা। একই বাস্তবতা কিন্তু আমাদেরও। আমাদের সন্তানরাও আটকে থাকছে সোশ্যাল মিডিয়ার জালে, যেখানে একটি ক্লিকের পেছনে লুকিয়ে থাকছে আরেকটি ক্লিক। স্ক্রলে স্ক্রলে ফুরিয়ে যাচ্ছে শৈশব। স্ক্রিনের নীল আলো থেকে ফিরিয়ে তাদের বাস্তব জীবনের উষ্ণতা দিতে ‘রাত্রিকালীন’ বা ‘দিবাকালীন’– কোনো সুরক্ষাই কিন্তু আমাদের নেই! 

দায়িত্ব কি কেবল মেটার 
২০১৫ থেকে ২০১৯ সময়ে নেদারল্যান্ডসে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ইউজ অ্যান্ড হেলথ রিলেটেড কোয়ালিটি অব লাইফ অ্যামাং অ্যাডোলেসেন্টস’ শিরোনামে একটি গবেষণা হয়। তিন হাজার ৩৯৭ শিশুর ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, তাদের ৭২.৬ শতাংশ একই সঙ্গে তিন বা তার চেয়ে বেশি সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে (জেএমআইআর মেন্টাল হেলথ জার্নাল, অক্টোবর ২০২২)। যদি তাই-ই হয়, তাহলে সুরক্ষার দায়িত্ব কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।

মেটা যদি সত্যিই পরিবর্তনের পথে হাঁটে; তবে এক্স, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মেরও দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। যদি সেটি না হয়, তাহলে সত্যিকার পরিবর্তন কতটুকু সম্ভব– সে সংশয় রয়েই যায়। সুরক্ষা টুলস বাস্তবায়নে তাই একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা বা ‘ইন্টিগ্রেটেড অ্যাপ্রোচ’-এর কথা উঠছে। তা ছাড়া একটি প্ল্যাটফর্মের শক্ত টুলসও অন্য প্ল্যাটফর্মের অনিরাপদ অ্যালগরিদমে হারিয়ে যাবে, যেটা খুবই স্বাভাবিক। তাই প্রতিযোগিতা হোক উদ্ভাবনে; শিশুদের নিরাপত্তায় নয়।

শেষের কথা
প্রযুক্তির গতি আমরা থামাতে পারব না; সেটি উচিতও নয়। কিন্তু প্রযুক্তির অন্ধকার গলি থেকে শৈশবকে ফেরানোর লড়াইটা জরুরি। এ লড়াই কোনো নির্দিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়, বরং এমন এক ডিজিটাল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে মানুষের মনোযোগকে পণ্য বানানো হয়েছে; ব্যক্তিগত তথ্য হয়ে উঠেছে সম্পদ; আর অ্যালগরিদম হয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্য শক্তি।

এ কথা ঠিক, এককভাবে সিলিকন ভ্যালির সামনে দাঁড়ানো আমাদের জন্য কঠিন। প্রচলিত ডেটা সুরক্ষা আইনও হয়তো এই জটিল বাস্তবতা সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেখিয়েছে, ‘জেনারেল ডেটা প্রটেকশন রেগুলেশন’-এর মতো আঞ্চলিক সুরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়া তথা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো একদিন এমন একটি অভিন্ন সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলবে– সেটি নিশ্চয়ই অবাস্তব নয়। সময়ের দাবিও হয়তো সেদিকেই।

শৈশব কোনো ভূখণ্ডের সম্পত্তি নয়; সীমানাও মানে না। গ্লোবাল নর্থের শিশুরা যদি ডিজিটাল সুরক্ষা পায়, তবে গ্লোবাল সাউথের শিশুদেরও সেটি অধিকার। আর প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ যদি সবার হয়, তবে তার নিরাপত্তার দায়িত্বও সবার। তাই প্রশ্নটা শুধু ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা মেটাকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা পৃথিবীর সব প্রান্তের শিশু-কিশোরদের শৈশব বাঁচানোর।

গৌতম মণ্ডল: ইনচার্জ অব অনলাইন, সমকাল
[email protected]

আরও পড়ুন

×