ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

কূটনীতি

ঢাকা-দিল্লি তাড়াহুড়ো না করার মতৈক্য!

ঢাকা-দিল্লি তাড়াহুড়ো না করার মতৈক্য!
×
×

মোজাম্মেল হোসেন

মোজাম্মেল হোসেন

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫০ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

অনেক দিন পরে একটি বিষয়ে ঢাকা-দিল্লি একমত । সেটা হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতে দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য কোনো তাড়াহুড়ো নেই। উপযুক্ত সময়ে সফর হবে। 

কথাটা প্রথম বলেছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে– ‘সরকারপ্রধান পর্যায়ে সফরের জন্য তাড়াহুড়া করার কোনো কারণ নেই’। বলেছিলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ার পর উপযুক্ত সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করবেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে’ (সমকাল, ২২ আগস্ট ২০২৬)। 

এর মাসাধিককাল পরে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের বললেন, ‘ভারত সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমন্ত্রণ বহাল আছে। এটা নিয়ে মনে হচ্ছে না এবার কোনো তাড়াহুড়ার দরকার আছে’ (প্রথম আলো, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। তিনি বলেন, ‘যখন দুই প্রধানমন্ত্রী মনে করবেন যে সুবিধাজনক সময় হয়েছে, তখন সফরটি হবে।’

তবে দিল্লির তরফে তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ দেখানো হয়েছে এবং তাড়াহুড়ার ভাব নিয়ে দীনেশ ত্রিবেদীও ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ করেছেন সেই আগস্টে। 

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে যোগদান শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ফেরেন। পরের দিনই সংবাদমাধ্যম জানায়, সফরটির নতুন তারিখ নির্ধারণের জন্য দুই দেশ আলোচনা করছে। তবে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে খবরটি আসে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাতে। তাতে বলা হয়, সফরটি হতে পারে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে। এখন সফরটি বাস্তবে হওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনার বিষয়– শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনের প্রত্যর্পণের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর কীভাবে নিষ্পত্তি হবে। 

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনা দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শীতলতম পর্যায়ে নেমে আসে। এর মধ্যেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। ঢাকার পক্ষ থেকে দুই দেশের বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়। নয়াদিল্লি বলে, বিষয়টির আইনগত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে; নিষ্পত্তি সময়সাপেক্ষ। 

অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নয়াদিল্লি বলেছিল, ঢাকায় নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। ভারতের দিক থেকে সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ ছিল। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে নরেন্দ্র মোদি টেলিফোনে অভিনন্দন জানান। তারেক রহমানকে ভারত সফরের দুটি আমন্ত্রণও জানানো হয়। 

প্রথমত, ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকায় এসে ভারতীয় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। দ্বিতীয়ত, নয়াদিল্লিতে ১২-১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ‘আউটরিচ’ অধিবেশনে বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণপত্র আসে ২৩ জুলাই।

ব্রিকস হচ্ছে ক্রমবর্ধমানভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা দেশগুলোর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা জোট; উদ্যোক্তা দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ এখন মোট সদস্য ১১ এবং সহযোগী বা অংশীদার সংখ্যা ১০। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। ওদিকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশ বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতামূলক উদ্যোগ। সদস্য দেশগুলোর মধ্য থেকে পর্যায়ক্রমিক সভাপতিত্বের রীতিতে এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এ উদ্যোগের সভাপতি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে ব্রিকসে যোগদানের আমন্ত্রণ কার্যত নীরবে উপেক্ষা করেন। সম্মেলন শুরুর আগের দিন ১০ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের ব্যাখ্যা দেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। প্রধানমন্ত্রী উপযুক্ত সময়ে দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে যাবেন। 

ব্রিকসে আমন্ত্রণের অধ্যায় শেষ। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণটি ফেব্রুয়ারিতে এলেও পরবর্তী আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ মাসের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী ও সরকার সে-সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। মাঝে ২১-২৬ জুন তিনি এক যাত্রায় মালয়েশিয়া ও চীন সফর করে আসেন।

ভারতের দিক থেকে যদিও বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছিল। গত ছয় মাসে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে টানাপোড়েন দৃশ্যত কমেনি। শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে মাঝেমধ্যে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিয়ে যাওয়ায় টানাপোড়েন আরও বেড়ে যেতে থাকে। বিশেষত গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনা ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিলে ঢাকার দিক থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। ভারতের সাফাই ছিল– এটা বেসরকারি আয়োজন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত এবং সেখানে যা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে ভারত সরকার একমত নয়। এসবের মধ্যেও ভারতের তরফে তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নেওয়ার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছিল। এমনকি গত ২৩-২৫ আগস্ট এই সফরের সম্ভাবনা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা খবর প্রকাশিত হয়। তবে সফরটি হয়নি।  

৫ আগস্ট দিল্লিতে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহিদুল করিম একাধিক প্রেস ব্রিফিংয়ে পরিষ্কার করেন, তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি প্রয়োজন। সেই পরিবেশের মূল বিষয়– শেখ হাসিনাসহ দণ্ডপ্রাপ্ত নেতাদের এবং ইনকিলাব মঞ্চের নিহত নেতা ওসমান হাদির পলাতক খুনিদের প্রত্যর্পণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা ভারতকে দিতে হবে। 

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ছাড়া ভারতের সঙ্গে আর সব বিদ্যমান সমস্যা সমাধান ও সম্পর্কোন্নয়নের গতি স্তব্ধ হয়ে থাকবে– এমন ‘একক ইস্যুভিত্তিক কূটনীতি’ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন, তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর, বিস্তৃত সীমান্তে নিরাপত্তা ও শান্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, পর্যটনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রভৃতি ইস্যু রয়েছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও তাঁর কথা বলা বন্ধ রাখতে আলোচনায় বসেও চাপ দেওয়া যায়। একক ইস্যুতে আটকে থাকা এবং ব্রিকসে যোগ না দেওয়ার মতো ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনীতি বিচ্ছিন্ন ও নিষ্ক্রিয়তার নীতি বলে অভিহিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। 

এখন অপেক্ষা তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর কখন কীভাবে হয় এবং সম্পর্কের অচলাবস্থা অবসানের দুয়ার কীভাবে খোলে। দুপক্ষেরই ‘তাড়াহুড়ো নেই’ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কোন দেশ আগে চাবি ঘোরায়, তা দেখতে আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের আগ্রহ থাকবেই। 
   
মোজাম্মেল হোসেন: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
 

আরও পড়ুন

×