জন্মদিন
ত্বকীর জন্মদিনে বেদনার ফুল
তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী (১৯৯৫-২০১৩)
রওনক রেহানা
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১০
আজ ত্বকীর জন্মদিন। ৩১ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর ত্বকীর জন্ম। কালের প্রবাহে ত্বকীর বয়স বেড়ে চললেও বয়স তার আটকে আছে ১৭ বছর ৫ মাসের বৃত্তে। পিটার প্যানের মতো ত্বকীর বয়স আর বাড়বে না কোনোদিন। তবে পিটার প্যান চিরদিন কিশোর হয়ে থাকার জন্য পণ করেছিল; কিন্তু ত্বকী তা চায়নি। ত্বকী বড় হতে চেয়েছিল; অনেক বড়। সবকিছু ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছিল।
জন্মদিন হয় আনন্দের; ফুল, কেক, উপহার, শুভেচ্ছা, অভিবাদন– অনেক কিছু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু না। ত্বকীর জন্মদিন আমাদের জন্য কোনো আনন্দের বার্তা বয়ে আনে না। এ আমাদের জন্য হৃদয় খুঁড়ে বেদনাকে জাগিয়ে তোলার একটি দিন।
ত্বকী তার একটি কবিতায় লিখেছিল– ‘সমগ্র মানবজাতি আজ এক কাতারে দাঁড়াবে,/ হিংসা বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে,/ জলাঞ্জলি দিয়ে হিসেব কষা,/ ছড়িয়ে দেবে ভালোবাসার গান-/ বলবে মানুষ চাই সমানে সমান।’ বিনম্র একটি সমাজে বসে সমতার সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল ত্বকী। কিন্তু সমাজ কতটা বিনম্র, দুঃস্বপ্নের, কতটা দুঃসময় বয়ে চলেছে– এ ধারণা হয়তো ওর ছিল না।
ডাকঘরের কিশোর অমল দইওয়ালা হতে চেয়েছিল; পারেনি। শৈশব-কৈশোরে বিচিত্র স্বপ্ন এসে ভিড় করে। ত্বকী শৈশবে আর্মি হতে চাইল। ওর মনে হয়েছিল, এরা খুব সাহসী। দেশ-বিদেশে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ওর বাবা জলপাই ছাপের জ্যাকেট ও ট্রাউজার এনে দিয়েছিল। পেয়ে আনন্দ আর ধরে না। শৈশবের স্বপ্ন দ্রুত বদলে যায়। পরে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদায় নিল।
ত্বকী একটা ছড়া প্রায়ই শুনতে চাইত– ‘মন্দরা ছিল মন্দরা আছে থাকবেও চিরকাল, তবুও ভালোর ছোঁয়া লেগে শুভ হোক আগামীকাল।’ আমি যখনই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘মানুষ’ কবিতা থেকে আবৃত্তি করতাম– ‘মানুষ বড় কাঁদছে তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও’– তখন প্রতিবারই আমার পাশে দাঁড়িয়ে আমার শিশুসন্তান আপন মনেই বলে চলত– ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও তোমাকে দাঁড়াতেই হবে’।
এখন আমার কণ্ঠ থেকে কোনো ছড়া, কবিতা বা গান বেরোয় না; কণ্ঠ বিবর্ণ হয়ে আসে। কিন্তু আমার চোখের জলে কোনো স্মৃতি মুছে যায়নি। ত্বকীর সঙ্গের প্রতিটি স্মৃতি, প্রতিটি মুহূর্ত থেকে আমি ফিরে পেতে চাই বর্তমান ও ভবিষ্যতে ত্বকীর সঙ্গে আমার জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষায়, যা হয়তো আর কোনোদিন হবার নয়।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ পাঠাগার থেকে বই আনার পথে দুর্বৃত্তরা ত্বকীকে তুলে নিয়ে গেল শহরের পরিচিত আল্লামা ইকবাল রোডের একটি টর্চার সেলে। সেখানেই নির্মমভাবে হত্যা করে সে রাতেই তারা ত্বকীর লাশ ভাসিয়ে দেয় শীতলক্ষ্যা নদীতে। কিন্তু ১৪ বছর হতে চলল; আজও অভিযোগপত্রটি তৈরি হলো না। সরকার যায়, সরকার আসে; বিচার হয় না। এখানে সংবিধান মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে না; স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা দিতে পারে না। মৃত্যু হলে বিচার পাওয়ার অধিকার পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারে না। প্রতিনিয়ত সংবিধান লঙ্ঘনের অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এখানে অপরাধীরা প্রতিনিয়ত সরকারের প্রশ্রয় পায়। সবকিছু জানার পরও রাষ্ট্র, সরকার অপরাধীদের পক্ষ নেয়; হত্যাকারীদের পাশে দাঁড়ায়। সবকিছু উদ্ঘাটনের পরও বিচার আটকে থাকে। আমরা কি এমনই স্বাধীন দেশ চেয়েছিলাম? একেই কি আমরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বলব?
নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ত্বকীর এ-লেভেল পরীক্ষার প্রথম পর্বের ফল প্রকাশিত হলো। পদার্থবিজ্ঞানে বিশ্বের সর্বোচ্চ নম্বর, রসায়নে দেশের সর্বোচ্চ নম্বর পেল। এর আগে ও-লেভেল পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে দেশের সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ‘ডেইলি স্টার’ পুরস্কার নিতে গিয়ে পরিচিতি প্রকাশে জীবনের লক্ষ্যে লিখেছিল– ‘সততাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে লালন করব।’ জীবনের পরিসীমা যেখানে এতই ছোট সেখানে লক্ষ্য কেবলই মুখ থুবড়ে পড়ে। চেনা দেশ, চেনা চারপাশ অচেনা হয়ে যায়। দুঃখের জমি কতটা আবাদ করা যায়? সেখানে ফুল কখনও ফোটে, কখনও ফোটে না। কিন্তু মানুষ তো স্বপ্ন ছাড়া বাঁচে না। ত্বকীর জন্মদিনে তাই একগুচ্ছ দুঃখের ফুল।
রওনক রেহানা: তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মা
- বিষয় :
- জন্মদিন