ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

সমাজ

খাদ্য সংস্কৃতির রূপান্তর কোথায় নিয়ে যাচ্ছে

খাদ্য সংস্কৃতির রূপান্তর কোথায় নিয়ে যাচ্ছে
×

জাহেদ আহমেদ

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৩

বাংলাদেশের খাদ্য সংস্কৃতি একসময় ছিল আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই স্বাভাবিক অংশ। বাড়ির উঠানে শুকানো মসলা, মৌসুমি সবজি, তাজা মাছ, দেশি মাংস, ঘরে তৈরি আচার, পিঠা কিংবা ধীরে ধীরে রান্না করা আঞ্চলিক পদ– সবকিছুর মধ্যে ছিল আমাদের খাবারের নিজস্ব পরিচয়। একটি খাবারের স্বাদ শুধু মসলার ওপর নির্ভর করত না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত উপকরণের সতেজতা, রান্নার সময়, পদ্ধতি এবং পারিবারিক ঐতিহ্য।

সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। খাবারের সুযোগ বেড়েছে, বেড়েছে বৈচিত্র্যও। কিন্তু ভালো খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা কি একইভাবে বেড়েছে? শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, কম সময়ে খাবার তৈরির প্রয়োজন, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা এবং মানুষের পরিবর্তিত রুচি আমাদের খাদ্যাভ্যাসকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। তাজা উপকরণ ও ঘরোয়া রান্নার পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে রেডি-টু-কুক, ফ্রোজেন, ইনস্ট্যান্ট ও বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবার।

তবে আধুনিক খাবার বা প্রক্রিয়াজাত খাবারকে সমস্যা হিসেবে দেখি না। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই খাবার সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারও খাদ্যব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন খাবারের মান, নিরাপত্তা ও প্রকৃত উপকরণের চেয়ে কম খরচে বেশি লাভ করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

দেশে এখন অনেক খাবার এমনভাবে বাজারজাত হচ্ছে, যেখানে ভোক্তার পক্ষে খাবারের প্রকৃত উপকরণ বা মান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া কঠিন। কোথাও অতিরিক্ত রং, কোথাও নিম্নমানের উপকরণ, কোথাও কৃত্রিম স্বাদ কিংবা দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ওপর নির্ভরতা দেখা যায়। আবার কিছু খাবারের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী নামটি ঠিকই আছে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার মূল উপকরণ ও রান্নার পদ্ধতি এতটাই বদলে গেছে যে খাবারটির নিজস্ব চরিত্রই আর আগের মতো নেই।
সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি।

অবশ্য এর দায় শুধু ব্যবসায়ীদের নয়। একজন ভোক্তা যখন বাজারে গিয়ে কম দামে বেশি খাবার চান, ব্যবসায়ীরাও সেই চাহিদা অনুযায়ী খাবার তৈরি করবেন। কিন্তু দাম কমানোর প্রতিযোগিতায় যদি উপকরণের মান কমতে থাকে, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন ভোক্তাই। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পেশাদার রান্নাঘরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি বিষয় খুব কাছ থেকে দেখেছি। একটি দেশের নিজস্ব খাবারকে সম্মান করার অর্থ শুধু পুরোনো রেসিপি সংরক্ষণ করা নয়। ভালো উপকরণ নির্বাচন, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, সঠিক রান্নার পদ্ধতি এবং মানসম্মত পরিবেশনও সেই সংস্কৃতির অংশ।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের ক্ষেত্রেও আমাদের এই জায়গাগুলোতে আরও মনোযোগ দেওয়া দরকার।

আমাদের আঞ্চলিক খাবারগুলোকে রেস্তোরাঁয় ফিরিয়ে আনতে হবে। এখানে শেফদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। একজন শেফ শুধু রান্না করেন না; তিনি খাবারের সংস্কৃতিরও একজন বাহক। নতুন প্রজন্মের কাছে ভালো উপকরণ, সঠিক রান্না এবং আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের গল্প পৌঁছে দেওয়াও তাঁর কাজের অংশ। একই দায়িত্ব রয়েছে রেস্তোরাঁ মালিক ও খাদ্য ব্যবসায়ীদের। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ভোক্তার। আমরা যদি শুধু কম দাম, বেশি পরিমাণ কিংবা বাহ্যিক আকর্ষণ দেখে খাবার বেছে নিই, তাহলে বাজারও সেদিকে যাবে। আমাদের জানতে হবে– আমরা কী খাচ্ছি, কী দিয়ে খাবারটি তৈরি হচ্ছে এবং সম্ভব হলে উপকরণগুলো কোথা থেকে আসছে।

দেশের খাদ্য সংস্কৃতি এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন থামানো সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। খাবার বদলাবে, রান্নার পদ্ধতি বদলাবে, নতুন প্রযুক্তি আসবে, নতুন স্বাদও যুক্ত হবে। কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের খাবারের নিজস্বতা, নিরাপত্তা ও মানকেও ধরে রাখতে হবে। আমরা আধুনিক খাবার খাব; নতুন স্বাদ গ্রহণ ও নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করব। একই সঙ্গে তাজা উপকরণ, আঞ্চলিক রান্না, ঘরোয়া স্বাদ এবং খাদ্য নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি দেশের খাবার শুধু একটি পণ্য নয়। খাবারের মধ্যে থাকে সেই দেশের ইতিহাস, মাটি, কৃষি, নদী, উৎসব, পরিবার এবং প্রজন্মের স্মৃতি। তাই প্রশ্ন শুধু আমরা কী খাচ্ছি– তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের খাবারকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি?

জাহেদ আহমেদ: সুশেফ, কট অ্যান্ড কাবল আইরিশ ট্রাডিশনাল রেস্টুরেন্ট

আরও পড়ুন

×