প্রতিবেশী
ভারতের নির্বাচন কমিশন জনগণের আস্থা হারিয়েছে
কাশিফ ইসলাম
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত মাসে গোপন সূত্রের বরাতে অভ্যন্তরীণ কিছু ইমেইল সংগ্রহ করে দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নিশ্চিত করেছে– ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার মূলত একাই কমিশন চালাচ্ছিলেন। তা ছাড়া বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারকে ধারাবাহিকভাবে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। এই খবর সামনে আসতেই ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম তোলপাড় শুরু হয়।
বিগত ১০ মাসে বাকি দুই কমিশনার লিখিতভাবে অন্তত ১৪ বার তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া নিয়ে আপত্তি জমা পড়া, অনুমোদন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক নিয়োগ এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তালিকা হালনাগাদের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এমনকি একটি ইমেইলে তারা এ নিয়েও আক্ষেপ জানান, একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা তারা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখে জানতে পেরেছিলেন!
কয়েক বছর ধরেই যেখানে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছিল, সেই প্রেক্ষাপটে দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এই তথ্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিরোধী দলগুলো বারবার অভিযোগ তুলেছিল, নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির হয়ে কাজ করছে। যেমন নির্বাচনের ভাষণগুলোতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অন্যান্য শীর্ষ বিজেপি নেতার উস্কানিমূলক বা বিতর্কিত বক্তব্যের বিরুদ্ধে কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আবার বিজেপি যখন বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক দল ভেঙে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করে, তখনও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয় কমিশন। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও এনসিপি এবং পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে কমিশন অত্যন্ত দ্রুত ও আগ্রহের সঙ্গে মূল দল খারিজ করে আসা উপদলগুলোকে স্বীকৃতি দেয় এবং মূল দলের নাম ও প্রতীক তাদের বরাদ্দ দেয়।
সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন-এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচি নিয়ে। দেশজুড়ে এই ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়াকে বিরোধী দলগুলো গণহারে ভোটার ছেঁটে ফেলার চক্রান্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। কমিশনের তিন সদস্যের ক্ষমতা সমান এবং সাধারণত সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে বা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এটি কমিশনের কার্যক্রমে পক্ষপাতিত্ব এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঠেকানোর জন্য তৈরি একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
ভারতের নির্বাচন কমিশনকে একটি অরাজনৈতিক এবং সরকার থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থা হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত মূলত পরিস্থিতি এমনটাই ছিল। তখন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করত এবং সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখত। তবে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রতিষ্ঠিত প্রথায় বদল আসতে শুরু করে।
কমিশনারদের বাছাইয়ের জন্য গঠিত তিন সদস্যের প্যানেলে আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মতো ব্যক্তিরা। ২০২৩ সালে সরকার আইন পরিবর্তন করে প্রধান বিচারপতির জায়গায় একজন মন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করে। যার ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার পুরো নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে যায়। জ্ঞানেশ কুমার এবং তাঁর পূর্বসূরিদের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হিসেবেই দেখা হতো এবং যারা মূলত সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করছিলেন, যা নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা ভয়াবহভাবে ধসিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের জরিপেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে, যেখানে এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, তারা নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা হারিয়েছেন, যা ২০১৯ সালের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা হালনাগাদ বা এসআইআর শুরুর পর কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আরও বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। এসআইআর ভোটার যোগ্যতার চেয়ে নাগরিকত্বের পরীক্ষা হিসেবে বেশি মনে হচ্ছিল। অথচ কারও নাগরিকত্ব নির্ধারণ করার কোনো আইনি একচ্ছত্র এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই।
কয়েক মাস আগে ছাত্র আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা ককরোচ জনতা পার্টি এই ইস্যুটি লুফে নেয় এবং দেশব্যাপী আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেয়। আগামী দিনে বিষয়টি কোন দিকে মোড় নেবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে বিরোধী দলগুলো কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে এবং এই বিষয়ে সাধারণ মানুষকে কতটা মাঠে নামাতে পারছে, তার ওপর। সরকার হয়তো আশা করছে, বিষয়টি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনিতেই ঠান্ডা হয়ে আসবে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ঘটনা বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও অক্ষুণ্নতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
কাশিফ ইসলাম: গুরগাঁওভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত; দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট
থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- প্রতিবেশী