চোখ কালো কাপড়ে বাঁধা যে কারণে জরুরি
মো. সুমন জিহাদী
মো. সুমন জিহাদী
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে সাধারণ ও বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন, যার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি দেশ-বিদেশের নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা দেখে মনে হয়, সাধারণ বা বৈষয়িক জ্ঞানের পাশাপাশি আমাদের ‘অজ্ঞতার জ্ঞান’ থাকাও জরুরি। বিশেষত চাকরিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর ভেরিফিকেশনের কারণে গেজেট বিলম্বিত; বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগ পুনরায় কমিটির কাছে হস্তান্তরের আলোচনা; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগ বা কমিটি গঠন; আইনশৃঙ্খলা ইস্যু বা উন্নয়ন কার্যক্রমে দলীয় প্রভাব প্রভৃতি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নতুন উপায় সন্ধানের তাগিদ দেয়। এ ক্ষেত্রে ‘অজ্ঞতার জ্ঞান’ অর্থাৎ কারও সামাজিক পরিচয় ও অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে নিরঙ্কুশভাবে মানুষের জন্য কাজ করা। এর মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার আর স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে প্রভাবশালী রাষ্ট্রচিন্তাবিদরা মত দিয়েছেন।
বাংলাদেশের মতো দেশে স্বজনতোষণ, দলীয়করণ ও সরকারি ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যবহার বহুলচর্চিত অন্যায় আচরণ। অন্যদিকে ন্যায়বিচার নিয়ে আইন, লেখনী ও জ্ঞানমূলক বয়ানের ভিড়ে সবচেয়ে সরল ব্যাখ্যা দিয়েছেন সক্রেটিস– ‘যার যা প্রাপ্য তাঁকে দেওয়াই ন্যায়বিচার’। হেলমেট ব্যবহার না করার শাস্তি যতটুকু; মোটরসাইকেল চালক ততটুকুই পাবেন। তার বেশি নয়। জনগণ যেহেতু কর দেয়; সরকারের কাছে সেতু বা কমিউনিটি ক্লিনিক চাওয়া তাদের অধিকার। সেই অধিকার বুঝিয়ে দেওয়াই ন্যায়বিচার। সুতরাং কেউ চুরি করলে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যেমন ন্যায়বিচার নয়; কাউকে হত্যা করেও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে দিব্যি ঘুরে বেড়ানোও ন্যায়বিচার নয়।
কল্যাণ রাষ্ট্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সবাইকে সমান চোখে দেখাটা জরুরি। এ কথা অনস্বীকার্য, মানুষ পদে ও অবস্থানে সমান হবে না। কিন্তু অসমতা তখনই গ্রহণযোগ্য যখন সেটি জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠিত হবে। সুতরাং অসমতা মাত্রই বৈষম্য নয়, অবিচার নয়। আমেরিকান দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ জন রাওলস বলেছেন, কল্যাণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সাময়িক সময়ের জন্য কিছু অর্জিত ও চর্চিত জ্ঞান ভুলে যেতে হয়। একটি অজানা জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করে শূন্য থেকে বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হয়। তাঁর মতে, সমাজে বৈষম্য দূর ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে প্রয়োজন ‘ভেইল অব ইগনরেন্স’ বা ‘অজ্ঞতার চাদর’। এ ধরনের অজ্ঞতার চাদর আমাদের সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। কেননা, এ সমাজে জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠিত অসম পদ-পদবি ও অবস্থা-অবস্থানের মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবের কারণে অসমতার পরিবর্তে বৈষম্য ও বিভাজন তৈরি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
ন্যায়বিচারের তীব্রতা ছোট-বড় সব পরিসরে সমান। একজন স্কুলশিক্ষক থেকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ব্যবসায়ী থেকে আমলা সবাই কোনো না কোনো সময় সমাজে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। পক্ষান্তরে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে তাদেরও প্রয়োজন হয় ন্যায়বিচারের। শিক্ষক স্কুলে ছাত্রদের স্বার্থ রক্ষায় বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করছেন; ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দরিদ্র মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করছেন; পুলিশ অভিযুক্তকে ধরছে। তখন তারা আর্থসামাজিক বা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বৈষম্যমূলক আচরণ করছেন কিনা, সেটি দেখার বিষয়। একইভাবে তারাও নানা অন্যায় আচরণের শিকার হতে পারেন। অবিচার ও বৈষম্য চক্রাকারে ও ক্রমবর্ধমান হারে সংক্রমণ ঘটায়।
প্রত্যেকের সামাজিক দায় ও দায়িত্বের কারণে সমাজে সব সময়ই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হয়। যার ওপর ভিত্তি করে অনেকের জীবনের গতিও পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ কারণে আমাদের বিবেক দিয়ে বিচার করার দক্ষতা কম থাকলে ‘বৈষম্যের বোধ’ জমাট বাঁধতে থাকে। এর আইনি প্রতিকার সম্ভব, তবে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ন্যায়বিচারের চর্চা। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে অন্যকে বিচার না করা। এমনকি নিজের সামাজিক সংশ্লিষ্টতা ভুলে গিয়ে অজ্ঞতার চাদরে ঢেকে ফেলা। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে বসানো ও বর্তমানে অপসৃত ‘লেডি জাস্টিস স্ট্যাচু’ অনেকে দেখেছেন। এর চোখের কালো কাপড়টিও মূলত ‘ভেইল অব ইগনরেন্স’।
মনে রাখতে হবে, আত্মীয়তা, শ্রেণি বা রাজনীতির পক্ষপাত সমাজে কখনোই জনগণকে রাষ্ট্রের প্রতি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে দেয়নি। স্বজনতোষণের দায় শুধু সরকারের নয়। অনেক সময় জ্ঞাতি-গোষ্ঠী বা সমর্থকের হুমকির মুখেও সরকারকে বাধ্য হয়ে পক্ষপাত করতে হয়। এই পক্ষপাত বা দলীয়করণের নির্দিষ্ট গতিপথ, অনুঘটক, চালক রয়েছে। পক্ষপাতকরণ থাকলে পারিবারিক বন্ধন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, সামাজিক লক্ষ্য নষ্ট হতে পারে। আর রাষ্ট্রে পক্ষপাতকরণ থাকলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস হতে বাধ্য। সেই রাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রের গোড়ার দিক থেকেই সরকার ব্যবস্থা দুর্বল করার ক্ষেত্রে সরকারের অভ্যন্তরের ধনিক শ্রেণি গুরুতর ভূমিকা পালন করে এসেছে। পারিষদ ও ধনিকদের খোঁড়া কবরে রাজার সমাধি হয়েছে অনেকবার– ইতিহাস তাই বলে।
আশার কথা, অনেক দেশই এ সংকট অনেকাংশে মোকাবিলা করতে পেরেছে। বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কীভাবে ‘অজ্ঞতার জ্ঞান’ অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সে প্রচেষ্টা চলছে। বিবেক তো রয়েছেই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেও জননীতি তৈরি; বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। উন্নত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টির প্রয়াসও লক্ষণীয়। বিভিন্ন পরিসরে আইনের শক্ত প্রয়োগের ফলেও বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। তবে মানুষকেই শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক পরিচয় সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে চোখে কালো কাপড় বেঁধে চিনে নিতে হয়– আমাদের সামনে যিনি সেবাপ্রার্থী বা বিচারপ্রার্থী দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর আসল পরিচয় তিনি একজন মানুষ।
মো. সুমন জিহাদী: পিএইচডি ফেলো, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, থাইল্যান্ড
- বিষয় :
- মতামত
- রাষ্ট্র ব্যবস্থা
- আইনের শাসন