তথ্যপ্রযুক্তি
এআই নিয়ে দৌড়ের বদলে হাঁটা দরকার
এম এম শহিদুল হাসান
এম এম শহিদুল হাসান
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি ‘এআই’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতে একটি লক্ষণীয় ঘটনা ঘটেছে। যারা এআই তৈরি করছেন এবং আরও দ্রুত ও শক্তিশালী মডেল বাজারে আনার প্রতিযোগিতায় ছুটছেন, তারা এখন প্রকাশ্যে বলছেন– এই দৌড় কিছুটা সংযত হওয়া দরকার। প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন আত্মসমালোচনা খুব বেশি দেখা যায় না।
এনথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সম্প্রতি এক প্রবন্ধে এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা কমিয়ে ঝুঁকি ও সম্ভাব্য ক্ষতির দিকগুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। ওপেনএআইর স্যাম অল্টম্যান, গুগল ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিস, মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলাসহ এআই খাতের অন্যান্য শীর্ষ ব্যক্তিও দ্রুত অগ্রগতির সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই গ্রাহক, প্রতিভা ও বিনিয়োগের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরা যখন স্বীকার করেন– এআই উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতে পারে, তখন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
কারণ, এআইর প্রতিযোগিতা এখন শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে। তাই প্রশ্ন উঠছে, এ উদ্বেগের কারণ কী? এআই নির্মাতারা আসলে কী নিয়ে সতর্ক করছেন? আর বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদেরই বা এখন কী করণীয়?
হঠাৎ উদ্বেগ কেন
আমোদেইর মূল উদ্বেগ হলো, এআই এখন আগের তুলনায় অনেক কম মানবিক হস্তক্ষেপে নিজের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, শত শত এআই এজেন্ট সমন্বিতভাবে কাজ করে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালাতে সক্ষম হতে পারে। তাঁর বক্তব্য হলো, এআই উন্নয়ন বন্ধ নয়; নতুন প্রযুক্তি তৈরির পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নিরাপত্তাকে উপেক্ষা না করে।
বস্তুত এআই এখন শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা নির্দেশ পালনে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন প্রজন্মের এআই ব্যবস্থা নিজে থেকে পরিকল্পনা, সফটওয়্যার ব্যবহার, তথ্য সংগ্রহ এবং একের পর এক কাজ সম্পন্ন করতে পারছে। ক্রমে বেশি স্বায়ত্তশাসিত হয়ে উঠছে। এতে উৎপাদনশীলতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে অপব্যবহার ও ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি। ভবিষ্যতে এআই নিজেই আরও উন্নত এআই তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে, যাকে বলা হয় ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ বা স্ব-উন্নয়ন চক্র। এটি খুব দ্রুত ঘটলে মানুষের পক্ষে এআই ব্যবস্থার কার্যক্রম বোঝা, পূর্বাভাস দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
আরও তাৎক্ষণিক ঝুঁকি রয়েছে। এআই সাইবার হামলা, প্রতারণা ও অন্যান্য ক্ষতিকর কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। বিশেষত কোনো স্বায়ত্তশাসিত এআই যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক, তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন বা সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে একটি ভুলের পরিণতি একটি চ্যাটবটের ভুল উত্তরের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর হতে পারে।
এআই কেন ভুল করে
এআই শক্তিশালী, কিন্তু নির্ভুল নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে উপাত্ত বা ডেটার গুণমান, মডেলের নকশা, ব্যবহারকারীর নির্দেশনা বা প্রম্পট এবং প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপটের ওপর। এর পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষের বিচার-বুদ্ধি।
উপাত্ত অসম্পূর্ণ, ভুল, পুরোনো বা পক্ষপাতদুষ্ট হলে এআইর ফলাফলও অবিশ্বস্ত হতে পারে। জেনারেটিভ এআই এমন তথ্যও তৈরি করতে পারে, যা শুনতে যুক্তিসংগত মনে হলেও বাস্তবে ভুল। যেমন ভুল পরিসংখ্যান বা অস্তিত্বহীন সূত্র।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব উদ্বেগ আরও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য উপাত্ত, সাইবার নিরাপত্তা, কার্যকর সুশাসন ও প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া বড় পরিসরে এআই গ্রহণ করলে প্রতিষ্ঠানগুলো ভুল সিদ্ধান্ত, তথ্য চুরি এবং অকার্যকর বিনিয়োগের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আমাদের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উপাত্তের গুণমান। অনেক প্রতিষ্ঠানে তথ্য বিভিন্ন বিভাগে খণ্ড-বিখণ্ড, ভিন্ন ফরম্যাটে এবং অগোছালোভাবে সংরক্ষিত থাকে। কিছু তথ্য বাংলায়, কিছু ইংরেজিতে। ফলে সমস্যা শুধু উপাত্তের ঘাটতি নয়; নির্ভরযোগ্য, মানসম্মত ও সুশাসিত উপাত্তের ঘাটতিও বড় বাধা।
এই ভিত্তিগুলো শক্তিশালী না করে উন্নত এআই সরঞ্জাম আনলে প্রত্যাশিত রূপান্তর নাও ঘটতে পারে। বরং ভুল তথ্যকে আরও দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করে অধিক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
করণীয়
বাংলাদেশের উচিত এআই নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়া; আবার না বুঝে তাড়াহুড়ো করে এতে ঝাঁপিয়ে না পড়াও। আমাদের প্রয়োজন ‘দায়িত্বশীল ত্বরণ’, যেখানে এআই উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পারে, সেখানে দ্রুত এগোনো; কিন্তু মানুষের জীবিকা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, গোপনীয়তা বা নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা।
প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট নিয়মকানুন তৈরি। বাংলাদেশ একটি জাতীয় এআই নিরাপত্তা ও সুশাসন পরিষদ গঠনের কথা বিবেচনা করতে পারে। এতে প্রযুক্তি, শিল্প, সাইবার নিরাপত্তা, আইন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সরকারের বিশেষজ্ঞরা থাকতে পারেন।
পরিষদের কাজ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ধীর করা নয়; বরং এআই পরিচালনার সক্ষমতা যেন এর দ্রুত বর্ধনশীল শক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, তা নিশ্চিত করা। উচ্চঝুঁকির এআই প্রয়োগ চিহ্নিত করা, তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তার মানদণ্ড তৈরি, মানবিক তদারকির শর্ত নির্ধারণ এবং এআই-সংক্রান্ত গুরুতর ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থাও এর আওতায় থাকতে পারে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। তাদের এমন ক্ষেত্র দিয়ে এআই ব্যবহার শুরু করা উচিত, যেখানে সুফল স্পষ্ট এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। এআই ব্যবহারের আগে উপাত্তের গুণমান যাচাই, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, গোপনীয় তথ্য সুরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সামনের পথ
এআই নেতাদের সতর্কবার্তাকে এআই প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি একটি স্মারক। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দায়িত্বশীল প্রয়োগ এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশ এআই থেকে উৎপাদনশীলতার সুফল হারানোর সামর্থ্য রাখে না। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, রপ্তানিকারক, ব্যাংক, সেবাদানকারী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ক্রমেই এআইর প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত উপাত্ত, দক্ষতা, সাইবার নিরাপত্তা ও সুশাসন ছাড়া শক্তিশালী এআই ব্যবহারের ঝুঁকিও আমাদের উপেক্ষা করা উচিত নয়।
প্রকৃত বিপদ শুধু এআই মানুষের কাজ দখল করে নেবে– এটি নয়। আরও বড় বিপদ হলো, প্রতিষ্ঠানগুলো এমন দায়িত্ব ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী এআইকে দিয়ে দিতে পারে, যা নিরাপদে সামলানোর মতো উপাত্ত, অবকাঠামো, দক্ষ কর্মী বা সুশাসন কাঠামো তাদের এখনও নেই।
তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত ঝুঁকিমুক্ত এআই নয়। কারণ তা বাস্তবসম্মত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি এআই বাস্তুতন্ত্র, যেখানে ঝুঁকিগুলো সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই চিহ্নিত, মূল্যায়িত, পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বাংলাদেশের উচিত এআই গ্রহণ করা, তবে চোখ বুজে নয়। আমাদের যেখানে উপযোগী, সেখানে এআই গ্রহণের গতি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যে এআই পরিচালনা, সুরক্ষা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের সক্ষমতাও এর ক্রমবর্ধমান শক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোয়।
এম এম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও অধ্যাপক (অব.), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- তথ্যপ্রযুক্তি