ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা সরকারের দায়িত্ব

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা সরকারের দায়িত্ব
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৪ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ছিল এ দেশের মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। আওয়ামী লীগ শাসনামলে এই আইন ব্যবহার করে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন ও বাকস্বাধীনতা হরণের অনেক ঘটনা ঘটে। অবশ্য আইসিটি অ্যাক্ট নামে আইনটির গোড়াপত্তন ২০০৬ সালে। ২০১৩ সালে শেখ হাসিনার সরকার আইনের ৫৭ ধারায় ভিন্নমত দমনে কঠোর বিধি যুক্ত করে। ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত আইসিটি আইনে দায়ের হওয়া ১ হাজার ৪১৭টি মামলার ৬৫ শতাংশই হয়েছিল ৫৭ ধারায়। 

২০১৮ সালে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ প্রণীত হওয়ার পরবর্তী পাঁচ বছরে সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মূলত রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক ছাড়াও শিক্ষার্থী, শিল্পী, লেখক, কার্টুনিস্ট এই আইনের অধীনে নির্যাতনের শিকার হন। এই আইনের আওতায় ছয়বার জামিন নাকচ হওয়ার পর কারাগারে লেখক মুশতাক আহমদ মর্মান্তিকভবে প্রাণ হারান। ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে ২০২৩ সালে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ হিসেবে নাম বদল করা হলেও নিপীড়নমূলক চরিত্র অক্ষুণ্নই থাকে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে কিছু পরিবর্তন যুক্ত করলেও এর পরিসর ও সীমা সম্পর্কে অস্পষ্টতা বহাল রাখে। প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচিত সরকারের হাতে সাইবার নিরাপত্তা আইনটি নাগরিক অধিকার রক্ষায় সহায়ক হবে। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত খসড়া দেখে মনে হচ্ছে, মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার বদলে এটি নাগরিকদের অধিকার হরণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে। 

যেমন, প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনের ৮(১) ধারা মতে, মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত সাইবার সুরক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করলে তিনি তা অপসারণ, স্থানান্তর বা ব্লক করবার ব্যবস্থা নিতে পারবেন। ৮(২) ধারায় বলা হয়েছে– ‘যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিকট তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণসাপেক্ষে বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে, ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণামূলক বা জাতিগত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য যাহা সহিংসতার উদ্রেক করে’, তাহলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও বর্তমান আইনের সঙ্গে প্রস্তাবিত খসড়ার প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, নতুন খসড়ায় প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে ‘আশঙ্কা’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। কেবল জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করা নয়। যদি ‘ক্ষুণ্ন করবার আশঙ্কা’ থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। অর্থাৎ কেউ চুরি করেনি বটে; চুরি করতে পারে– আশঙ্কাতেই তাকে চোর সাব্যস্ত করে দেওয়ার বন্দোবস্ত রাখা হচ্ছে! এই খসড়া কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সীমাকে এতই বিস্তৃত করেছে যে, কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক কার্যক্রমকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘আশঙ্কাজনক’ ঘোষণা দিয়েই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। 

২.
অবশ্য সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ ও অনলাইন পরিসরে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপযুক্ত আইনের বিরোধিতা করবার সুযোগ নেই। বিশেষত দ্রুত সম্প্রসারমাণ অনলাইন মাধ্যমে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাক মেইলিং বা অশ্লীলতার মতো অপরাধের বিস্তৃতি মোকাবিলায় আইনি বন্দোবস্ত অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৫ নম্বর ধারায় প্রধানত রয়েছে অনলাইনে ব্ল্যাক মেইলিং, যৌন হয়রানি, যৌনতাপূর্ণ আধেয় প্রভৃতি। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘মানহানিকর তথ্য’, ‘অপমান’, ‘হেয় প্রতিপন্ন করবার অভিপ্রায়’ ও ‘বুলিং’। বলা হচ্ছে, কাউকে অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করতে পারে– এমন বক্তব্য প্রকাশনা ও প্রতিবেদনও এ ধারার আওতায় আসবে। অর্থাৎ কোনো তথ্য যদি রাজনীতিবিদ কিংবা সরকারের মন্ত্রী বা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিকেন্দ্রিক হয়, তাহলে সহজেই এই ধারায় এগুলোকে ‘মানহানিকর তথ্যে’র আওতায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অসাধু ব্যক্তিদের জন্য মানহানিকর অবশ্যই। তাহলে? ব্যঙ্গচিত্র একইভাবে মানহানিকর তথ্যের আওতায় পড়তে পারে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্য করে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে না। কোনো সাংবাদিক যাতে এর অপপ্রয়োগের শিকার না হন, সেটির ব্যাপারেও তারা আশ্বাস দিচ্ছে। অবশ্য আশ্বাস বা নিশ্চয়তা প্রদান আইনের পরিভাষা নয়। আইন তখনই জনবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন তা ক্ষমতার বলয়কে জবাবদিহির পরিধির মধ্যে নিয়ে আসার সক্ষমতায় থাকে এবং যার আওতায় দুর্নীতি, অনিয়ম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নির্ভয়ে প্রকাশ করা যায়। তথ্য প্রকাশ যদি ‘মানহানিকর’ হয়ে ওঠে, তাহলে মামলা ও হামলার আশঙ্কা থেকে সাংবাদিক নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবেন না। 

৩.
সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়ায় গুজব ও অপতথ্যকে শাস্তিমূলক বা ফৌজদারি আইন দিয়ে মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়েছে। একটি গুজব বা অপতথ্য হাজার হাজার মানুষ সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তারের চেষ্টা করবে; নাকি আরও যুক্তিসংগত উপায়ে গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলা করবে? আরও যুক্তিসংগত উপায় হচ্ছে, যাবতীয় গুজব ও অপতথ্য রোধ করবার জন্য আরও বেশি ও পেশাদার ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা। মতামত যে কোনো উপায়ে বন্ধ করবার পুরোনো চেষ্টা– অচল বুদ্ধিজাত ও অপ্রয়োজনীয়। মতামতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উত্তর হতে পারে আরও সমৃদ্ধ ও যুক্তিসংগত মতামতের পরিসর তৈরি করে দেওয়া।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনোভাবেই অসীম নয়; মতপ্রকাশের নামে কারও ক্ষতির চেষ্টার আইনি ব্যবস্থাপনা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এর আড়ালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবার অভিপ্রায়কে আইনি সুরক্ষা দেওয়া যাবে না। সরকারি বা বেসরকারি ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাহীন কাউকে সমালোচনা বা তথ্য প্রকাশের অধিকার নাগরিকের মতপ্রকাশের অংশ। একে অপরাধ হিসেবে গণ্য করবার সুযোগ নেই। তাই সাইবার সুরক্ষা আইনকে বৈশ্বিক মানবাধিকার মানদণ্ডের পরিপূরক করে তুলতে হবে।

অবশ্য সরকার ইতোমধ্যে অংশীজনের সঙ্গে এই আইন নিয়ে আরও আলোচনার কথা জানিয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সমন্বয় কমিটিও করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়োর কোনো সুযোগ নেই। সংশোধনী প্রসঙ্গে সাংবাদিকসহ নাগরিক ও পেশাজীবী সমাজের সব অংশের মতামত নিতে হবে। জাতীয় সংসদের এই আইন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না– আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাকস্বাধীনতা হরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সময়ের আবর্তে সেই আইন সংশোধনের সুযোগ এসেছে জাতির সামনে। 

মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক নাগরিক সামাজিক মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লিখবার অধিকার রাখেন। প্রতিবাদ সংগঠন ও সমাজে এর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মানুষের ক্ষোভ ও বিদ্রোহ প্রকাশের প্রধান মাধ্যমই ছিল সামাজিক মাধ্যম। বর্তমান ও আগামী দিনেও মানুষ একইভাবে নিজের অধিকার, ক্ষোভ ও দাবির কথা জানাতে চাইবে। মতপ্রকাশের এই স্বাধীনতা অবারিত করবার দায়িত্ব বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের। 

সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচারের ভার নির্বাহী বিভাগে ন্যস্ত। এই বিচার প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন দলের অনুকূলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি করে। এর পরিবর্তে আইনি স্বচ্ছতা ও বিস্তৃত পরিসর তৈরি করে নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার যাবতীয় বন্দোবস্ত সরকারের পক্ষ থেকে করতে হবে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে নির্বাচিত সরকারের কাছে দেশের মানুষের এটি অন্যতম প্রত্যাশা। 

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×