ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

রান্নায় এলপিজি: নির্ধারিত মূল্যে কেউ কি পান

রান্নায় এলপিজি: নির্ধারিত মূল্যে কেউ কি পান
×

রোকেয়া রহমান বর্ণা

রোকেয়া রহমান বর্ণা

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:১৫ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:১২

রাজধানী ঢাকায় নতুন অনেক বাসা ও অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে পাইপলাইনের গ্যাস নেই। না খেয়ে থাকা তো আর সম্ভব না, কাজেই রান্না করতে হলে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার কিনতে হয়। সেগুলো বাসার আশপাশের দোকানে পাওয়া যায় এবং কোনো কোনো বাসার নিচে একসঙ্গে সারিবদ্ধভাবে জড়ো করা থাকে। বাসাবাড়ির গ্যাস ফুরোলে কল দিলেই বাসার নিচে মজুত থাকা সিলিন্ডার থেকে ঘরের চুলায় সংযোগ দেওয়া হয় এলপিজি অথবা বাসায় এসে নতুন সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে যান দোকানের কর্মচারীরা। 

সরল মনে আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে– সরকার নির্ধারিত দামে বাসাবাড়ির জন্য এলপিজি সিলিন্ডার কারা কিনতে পারেন? আর এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে যে অনিয়ম হয় না, সেটির প্রমাণ নিশ্চিত করার জন্য রসিদ পান কারা?

বাংলাদেশে ২০১৫ সালে আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ হওয়ার পর রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এবং প্রায় এক কোটি গ্রাহক এই জ্বালানি ব্যবহার করেন। দেশে ব্যবহৃত এলপিজির সবচেয়ে বড় অংশ যায় গৃহস্থালির রান্নায়। মোট ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশ এ খাতে ব্যবহৃত হয়। এর বাইরে পরিবহন ও শিল্প খাতেও এলপিজি ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল এক হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বাজারে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ১২ কেজির সিলিন্ডার কোথাও দুই হাজার, কোথাও দুই হাজার ২০০ টাকা এবং কোথাও কোথাও প্রায় আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার তথ্য এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে গত ৪ অক্টোবর বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৫৮৫ থেকে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ এবং নতুন দাম সেদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর করেছে বিইআরসি।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও এলপিজির দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। তবে এলপিজির সাম্প্রতিক দাম নির্ধারণে সৌদি আরামকোর কনট্রাক্ট প্রাইস বৃদ্ধি এবং শিপিং ও ট্রেডার প্রিমিয়ামের উচ্চ ব্যয় বিবেচনা করেছে বিইআরসি। 

এপ্রিলে দেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়ানো হয়। মাসের শুরুতে ৩৮৭ টাকা এবং ১৯ এপ্রিল আরও ২১২ টাকা। এরপর জুন ও জুলাইয়ে টানা দুই মাস দাম কমে। সব শেষ গত সেপ্টেম্বরে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম কমেছিল ১৩ টাকা। কিন্তু রোববার আবারও কেজিপ্রতি এলপিজি সিলিন্ডার প্রায় ২১ টাকা করে বাড়ানো হলো। এ ছাড়া সাড়ে পাঁচ কেজি থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন সাইজের এলপিজি সিলিন্ডারের দামও সমন্বয় করা হলো।

বাংলাদেশে এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণ করা হলেও সাধারণ গ্রাহকের জন্য সেই দাম বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ বাড়তি দাম নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বরাবরই একটি যুক্তি থাকে। তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে তারা সরবরাহকারীর কাছ থেকে বেশি দামে কেনেন। ফলে বেশি দামে বিক্রি না করলে তাদের ব্যবসা করা কঠিন।

এই যুক্তি বিবেচনার দাবি রাখে। যদি খুচরা বিক্রেতাই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে সেই অতিরিক্ত দাম তৈরি হচ্ছে? আর যদি সরবরাহ পর্যায়ে দাম বেড়ে থাকে, তাহলে শুধু খুচরা বিক্রেতাকে নির্ধারিত দামে বিক্রির কথা বললেই কি সমস্যার সমাধান হবে?

সম্প্রতি সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছিল। গত ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে জেলা প্রশাসকদের এলপিজি সিলিন্ডারের কথিত কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ তদন্ত করতে বলা হয়। 

পরদিন গত ১ অক্টোবর এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত আগস্টে এক লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে এক লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ নেই। তাহলে সরবরাহ পর্যায়ে কোথায় সমস্যা হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এ ক্ষেত্রে একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করতে চাই। গত ২ অক্টোবর ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশের প্রধান খবরে শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে এলপিজি মজুতের অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেই অভিযোগ সামনে আসার দুদিনের মাথায় সরকারিভাবে বাড়ানো হলো দাম।

লেখাটি যে সমস্যা নিয়ে শুরু হয়েছিল, সেখানে ফিরে যাই– বাসাবাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার কেনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের পরিবর্তে অতিরিক্ত দাম দিতে গিয়ে ভোক্তা আরেকটি বাস্তব সমস্যায় পড়েন, তা হলো রসিদ। রসিদ না থাকলে একজন ক্রেতা যদি নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দেন, পরে কীভাবে তিনি অভিযোগটি প্রমাণ করবেন?

এই সমস্যা যে বাস্তব, সাম্প্রতিক সরকারি তৎপরতাতে তার ইঙ্গিত আছে। গত ৩ অক্টোবর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ২৩টি দল ঢাকা মহানগর ও ১৬ জেলায় ডিলার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় অভিযান চালায়। সেখানে শুধু দাম নয়, মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণ ও দেওয়ার বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়। ওই অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের জন্য ৩৯টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে মোট চার লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। ভোক্তাদের রসিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ জানাতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ১৬১২১ নম্বরে যোগাযোগের কথা বলা হয়েছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। 

তবে প্রশ্ন হলো, ফোন করে বাসায় এলপিজি সিলিন্ডার আনালে রসিদপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায় কি? কারণ দোকান থেকে কিনছেন, নাকি বাসায় ডেলিভারি নিচ্ছেন– তাতে তো ভোক্তার অধিকার বদলে যাওয়ার কথা নয়। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয়ের যুক্তি থাকলে সেটিও স্বচ্ছভাবে যাচাই করা দরকার। কোথায় কত দামে এলপিজি সিলিন্ডিার বিক্রি হচ্ছে, কোন পর্যায়ে দাম বাড়ছে এবং কেন বাড়ছে– এই তথ্যগুলো প্রকাশ্য হলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই পরিস্থিতি পরিষ্কার হবে।

আসলে দরকার একটি সহজ ব্যবস্থা– প্রতিটি এলপিজি সিলিন্ডারের বিক্রির রসিদ। সেখানে নির্ধারিত মূল্য, প্রকৃত বিক্রয়মূল্য এবং প্রয়োজনে ডেলিভারি চার্জ আলাদা করে লেখা থাকতে পারে। রসিদ শুধু ভোক্তার সুবিধার বিষয় নয়, এর সঙ্গে আইনি জবাবদিহির প্রশ্নও যুক্ত। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪০ ধারা অনুযায়ী আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

কাজেই সরকার মূল্য নির্ধারণ করবে, ব্যবসায়ী সেই মূল্য কার্যকর করবেন, আর ভোক্তা রসিদসহ নির্ধারিত দামে পণ্য কিনতে পারবেন– ব্যবস্থাটির লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত এতটাই সরল হওয়া উচিত। নইলে প্রশ্নটি থেকেই যাবে– সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার আসলে পান কে? 

রোকেয়া রহমান বর্ণা: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×