শ্রদ্ধাঞ্জলি
নাগরিক সাংবাদিকতারও পথিকৃৎ
তৌফিক ইমরোজ খালিদী (১৯৬৭-২০২৬)
আইরিন সুলতানা
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত খন ব্লগিং ও অ্যাক্টিভিজমে অনলাইন কমিউনিটির টগবগে সময়। ইউরোপ-আমেরিকা ততদিনে মুখে মুখে বাকস্বাধীনতার ‘টাং টুইস্টার’ তুলে দিয়েছে। এই বাকস্বাধীনতা অনেকের বেশ ভালো লাগছিল; কারও ভ্রুকুটি হচ্ছিল। ওরকম সময় তৌফিক ইমরোজ খালিদী বললেন– ‘স্পিচ মাস্ট বি রেসপন্সিবল টু বি ফ্রি’। তাঁর বক্তব্য নিয়ে অনলাইন কমিউনিটিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। টিপ্পনী উঠল, তিনি বাকস্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণ চাইছেন।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী সহকর্মীদের কাছে ‘টিআইকে’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পোশাকে ছিলেন কেতাদুরস্ত, খাদ্যাভ্যাসেও বনেদিয়ানা ছিল। বিডিনিউজে বেতন না দিতে পারার দিনেও সাদামাটা আয়োজন করতে গিয়ে তাঁকে বলতে শুনেছি, ‘আমরা কম খাব, তবে ভালো খাব।’
ইংরেজি বা বাংলা শব্দ চয়নেও মুনশিয়ানা ছিল টিআইকের। বিদেশযাপন ও বিবিসির সাংবাদিকতা থেকে পেশাদারিত্বের শিখন তিনি পরেও দোর্দণ্ড প্রতাপে বহন করেছেন। এ কারণে তাঁর নির্বাচিত শব্দের ভিন্নার্থকরণ তিনি স্বাভাবিকভাবে মেনে নেননি। একবার এক অনুষ্ঠানে নিজেই স্পষ্টভাবে বললেন, ‘অনেকে মনে করেন, আমি সরকারি নিয়ন্ত্রণের কথা বলছি। আমি কখনোই সরকারি নিয়ন্ত্রণের কথা বলি না। রেগুলেশন এবং কন্ট্রোল– দুটো দুই শব্দ। আমাদের সবাইকে রেগুলেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আইন সবার মানতে হবে।’
আমার সাবেক কর্মস্থল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারনেট সংবাদপত্র। মূলধারার সংবাদমাধ্যম হয়েও নাগরিক সাংবাদিকতার পথিকৃৎও হয়েছিল বিডিনিউজ। অনেকে নাগরিক সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্মকে ‘ব্লগ’ বলতেন। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাগরিক সাংবাদিকতার বর্ষপূর্তিতে টিআইকে খোলাসা করেছিলেন, ‘এই ব্লগ অন্য আর পাঁচটি ব্লগের মতো হবে না। এখানে ব্লগাররা শুধুই তাদের মতামত দেবেন না; শুধুই অন্য কোনো ঘটনা, কোনো বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবেন না; তারা তথ্যও দেবেন। তারাও এক ধরনের সাংবাদিকতা করবেন।’
২০১৬ সালে এই প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাগরিক সাংবাদিকদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে নগর নাব্য সংকলন প্রকাশের পরিকল্পনা করলাম। সংকলনটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছিলেন দুজন। একজন মোনেম অপু, অপরজন জাহেদ উর রহমান, যিনি আজকের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা।
এরপর নাগরিক সমস্যা ও সমাধানপ্রত্যাশী নাগরিক প্রতিবেদন নিয়ে ২০১৭ সালে ছাপা হলো নগর নাব্য মেয়র সমীপেষু। ২০১৮ সালে ছাপা হয় নগর নাব্য চলচ্চিত্র চালচিত্র। দেশীয় চলচ্চিত্র ও সিনেমা হল সমস্যা নিয়ে নাগরিক সাংবাদিকদের প্রতিবেদন সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র চালচিত্র সংকলনটি সংগ্রহে রাখার মতো নাগরিক গবেষণা। ওই বছর এপ্রিলে এ নিয়ে বিডিনিউজ কার্যালয়ে একটি গোলটেবিল হলো আমার সঞ্চালনায়।
একবার বার্তাকক্ষে নদী-পরিবেশ নিয়ে আরও খবর করার কথা বলছিলেন টিআইকে। সে সময় তিনি বললেন, নাগরিক সাংবাদিকরাও নদীর দখল-দূষণ তুলে আনুক। এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নদীর কথা জানিয়ে নাগরিক প্রতিবেদন এলো। শীতলক্ষ্যা থেকে করতোয়ার দূষণ নিয়ে লেখা, ছবি, ভিডিও পাঠালেন নাগরিক সাংবাদিকরা। এমনকি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইছামতী নিয়ে ওপার বাংলার বনগাঁ থেকেও ভিডিও পেলাম।
সাংবাদিকতার আদি অধ্যায় নাগরিক সাংবাদিকতা। টিআইকে মূলধারার সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব পরিচয়ে স্মরিত হলেও তিনি নাগরিক সাংবাদিকতারও পথিকৃৎ। তাঁর সময়েই দেশে নাগরিক সাংবাদিকতার বহুমুখী চর্চা হয়েছে। কেউ কেউ সে সময় প্রতিষ্ঠানের অধীনে নাগরিক সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্ম নিয়ে সমালোচনা তুলেছিলেন। সব ডিঙিয়েই নাগরিক সাংবাদিকতা চর্চায় দৃষ্টান্ত গড়েছিল বিডিনিউজ।
বার্তাকক্ষে হেঁটে হেঁটে, কখনও বড় টিভির সামনে দাঁড়িয়ে থেকে টিআইকে বলতেন, ‘কমেন্ট ইজ চিপ, ইনফরমেশন ইজ এক্সপেনসিভ।’ প্রযুক্তি আজকে অবাধে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট দিচ্ছে। কমেন্ট ও কনটেন্টের অবাধ প্রবাহ এতই বেড়েছে যে, রীতিমতো বিড়ম্বনা হয়ে উঠেছে। এই হট্টগোলে বিশ্বে নাগরিক সাংবাদিকতার আবেদন ফিকে হয়েছে। এখন সবার আলাদা করে ফ্যাক্ট চেকিং দরকার হচ্ছে। এই অস্থির বেলায় তাই নাগরিক থেকে সাংবাদিক সবার জন্য আবশ্যক উচ্চারণ হয়ে উঠেছে টিআইকের মন্ত্র।
স্বাস্থ্য নিয়ে ফিচার হয়, খবর হয়। নারীস্বাস্থ্য নিয়ে দিবসকেন্দ্রিক, সরকারি উদ্যোগকেন্দ্রিক প্রতিবেদন হয়। বিবিসি, গার্ডিয়ান, সিএনএন পড়ে নারীস্বাস্থ্য নিয়ে খবর যতটা ‘আউট অব দ্য বক্স’ মনে হতো, দেশের খবর ততটাই ঘাটতিতে রয়েছে বলে ভাবতাম। একটা নারীস্বাস্থ্য পাতা চালু করা যায় কি? পরিকল্পনা, আলোচনা হলো। কয়েকজনের প্রস্তাব থেকে নামও ঠিক হলো– ‘নারীস্পন্দন’। আদ্যোপান্ত প্রস্তুতির পেছনে টিআইকের পর্যালোচনা ও অনুমোদন ছিল। এ কারণেই কি নারীস্বাস্থ্য নিয়ে নারীস্পন্দনের মতো একটি পাতা আর কোথাও মিলছে না?
বিডিনিউজ পরিবার ২০২০ সালে বসন্তের প্রাক্কালে লঞ্চে কুয়াকাটার উদ্দেশে ভ্রমণ করেছিল। নদীযাত্রার মাঝেও লঞ্চে অস্থায়ী ‘নিউজ রুম’ বসেছিল। টিআইকে বলতেন, বার্তাকক্ষ ঘুমাতে পারে না। টিআইকে চোখ বুজলেন বটে; বার্তাকক্ষ নিশ্চয়ই ঘুমাবে না।
আইরিন সুলতানা: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি