ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

চারদিক

পাটকল চালুই শেষ কথা নয়

পাটকল চালুই শেষ কথা নয়
×
×

মো. আল-মামুন

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে আবার উৎপাদনের ধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত কারখানা, জমি ও শিল্প অবকাঠামো কাজে লাগানো গেলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও পাটভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতাধীন বন্ধ মিলগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ তাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর সুফল পেতে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বাস্তবভিত্তিক বিনিয়োগ, শ্রমিকস্বার্থের সুরক্ষা ও কার্যকর জবাবদিহি।

বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিকে দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক রাখা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। উৎপাদন ব্যয়, প্রযুক্তি, কাঁচামালের সরবরাহ, দক্ষ জনবল, অর্থায়ন, বাজারসংযোগ, ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর এর সাফল্য নির্ভর করবে। ফলে কতটি মিল চালু হলো, তার চেয়ে কতটি মিল দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকল; সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রকৃত মানদণ্ড।
বিজেএমসির আওতাধীন ২৫টি বন্ধ পাটকলের মধ্যে ২০টি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৭টির ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং ৯টি মিলে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এসব মিলে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে পরিবহন, সরবরাহ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য সহায়ক খাতেও কর্মসংস্থান বাড়বে।

চলতি বছর ১১ আগস্ট সরকার তিনটি পাটকল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে প্রাণ-আরএফএল ও হ্যামকো গ্রুপের সঙ্গে ইজারা চুক্তি করেছে। সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলস ও খুলনার স্টার জুট মিলস প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এবং খুলনার প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলস হ্যামকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনটি মিলে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬১৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং ১১ হাজার ৬২৯ জনের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। বার্ষিক মোট আয় প্রায় ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট হিসাব থেকে জানা যায়।

জাতীয় জুট মিলসে প্রায় ১৫৭ কোটি, স্টার জুট মিলসে ২৫০ কোটি এবং প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলসে প্রায় ২১২ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। তিন মিলে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য। তবে এসব সংখ্যা মূলত পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার প্রতিফলন। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, উৎপাদন শুরু এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর।
বন্ধ পাটকল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিছক কোনো প্রশাসনিক বা শিল্প ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে পাটচাষি, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, ভোক্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থ জড়িত। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, দায়িত্বশীল অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক আস্থা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা, প্লাস্টিকবিরোধী প্রবণতা এবং টেকসই উৎপাদনের গুরুত্ব বাংলাদেশের পাটশিল্পের সামনে নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি করেছে।

বন্ধ পাটকলের দরজা খোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। কিন্তু আসল সাফল্য উৎপাদনের চাকা দীর্ঘদিন সচল রাখা। ঘোষিত বিনিয়োগ বাস্তবায়ন, টেকসই কর্মসংস্থান, শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণ, কৃষকের ন্যায্য প্রাপ্যতা এবং দেশি-বিদেশি বাজারে পাটপণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো; সবকিছুকে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা, তদারকি ও জবাবদিহি; উদ্যোক্তাদেরও দেখাতে হবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার অঙ্গীকার।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, উদ্যোক্তার দায়িত্বশীলতা, শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা, পাটচাষিদের ন্যায্য প্রাপ্যতা এবং বাজারমুখী শিল্পায়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলে বন্ধ পাটকলের পুনর্জাগরণ কেবল কয়েকটি কারখানা চালুর ঘটনা হয়ে থাকবে না; এটি বাংলাদেশের পাটশিল্পকে আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই পথে এগিয়ে নেওয়ার কার্যকর সুযোগে পরিণত হতে পারে।

ড. মো. আল-মামুন: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ
পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা

আরও পড়ুন

×