ফিলিস্তিন
গাজার ট্রমা কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়
সাইদ আলসালুল
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
গাজায় চলমান গণহত্যামূলক ভয়াবহতার তিন বছর পার হতে চলল। তিন বছর ধরে শুধু মৃত্যু, ধ্বংস আর হতাশা। ৭৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪ শতাধিক মানুষ মারা গেছেন গত বছরের অক্টোবরে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে। স্বাস্থ্যসেবার অভাবে আরও অসংখ্য মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন, অথচ যা চিকিৎসা দিয়ে মোকাবিলা করা যেত।
আমরা যারা বেঁচে আছি, স্থায়ী ট্রমা বা গভীর মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছি। এটি এমন এক ট্রমা, যা থেকে সেরে ওঠার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, গণহত্যা এখনও থামেনি। এই মানসিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা বর্তমানে এই ‘মানসিক স্বাস্থ্য সংকট’-এর দিকে জরুরি মনোযোগ আকর্ষণে কিছু পরিসংখ্যান ব্যবহার শুরু করেছে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজার ১০ লাখের বেশি শিশুর মানসিক ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন এবং তাদের মধ্যে ৯৬ শতাংশ শিশু মনে করে, যে কোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে প্রায় ৬১ শতাংশ পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার বা আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপে; ৩৮ শতাংশ বিষণ্নতা এবং ৪১ শতাংশ দুশ্চিন্তায় ভুগছে।
একটি গবেষণার আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৮৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ পিটিএসডিতে আক্রান্ত। তারা সেই শিশু আর প্রাপ্তবয়স্ক, যারা আগের বারংবার চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধগুলোতেও মানসিকভাবে কঠিন আঘাত পেয়েছিল। ২০২০ সালের মধ্যে পরপর তিনটি কয়েক মাসব্যাপী যুদ্ধের পর গাজার অর্ধেক শিশুর পিটিএসডির লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল। ২০২২ সালের মধ্যে ৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছিলেন।
এসব পরিসংখ্যান যে কথাটি তুলে ধরতে পারে না, তা হলো যেখানে সুস্থ হয়ে ওঠার ন্যূনতম সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, সেখানে এই ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকাটা ঠিক কেমন! আমরা আগে যুদ্ধ দেখেছি, কিন্তু এমন সর্বাত্মক গণহত্যামূলক যুদ্ধ দেখিনি। এসব যুদ্ধের ভয়াবহতা এতটাই অভাবনীয়, আমাদের কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছিল না। ২০০৮ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যখন আক্রমণ করেছিল, তখন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া কিংবা ২০১২, ২০১৪ ও ২০২১ সালে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে যখন ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, তখন আত্মরক্ষার জন্যও আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। এই সর্বাত্মক ও নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ ছিল একেবারে আলাদা। এটি মানুষকে কাবু করে ফেলে; নিঃশেষ করে দেয়। কারণ এটি বেঁচে থাকার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নেয়।
আমি বইয়ে এমন যুদ্ধের কথা পড়েছিলাম। হেমিংওয়ের ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ উপন্যাসের কথা মনে পড়ে। আমার মনে আছে গোলাবর্ষণ ও গুলির নিখুঁত বর্ণনা, ছিন্নভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া লাশ আর ‘কসাই’-এর মতো রক্তে ভেসে যাওয়া চিকিৎসকদের কথা। গাজায় মৃত্যু কিন্তু মোটেও তেমন নয়। এখানকার মৃত্যুর একটা আলাদা গন্ধ আছে। বারুদ, পোড়া ইট-পাথর আর পচে যাওয়া কিছুর বিশ্রি গন্ধ। এর একটা ভয়াবহ শব্দ আছে। যেমন–ক্ষেপণাস্ত্রের সাঁ সাঁ শব্দ আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া অস্পষ্ট আর্তনাদ। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক খাঁটি আতঙ্কের অনুভূতি আছে এ মৃত্যুর। যেসব যুদ্ধের গল্প আমি পড়েছি, তার কোনো কিছুই আমাকে এখানে যা দেখেছি আর অভিজ্ঞতা পেয়েছি, তার জন্য প্রস্তুত করতে পারেনি।
যুদ্ধের প্রথম দুই মাসেই আমার ঠিক পাশের পাড়ার ছয়টি বাড়িতে বোমা ফেলা হয় এবং আমার ৬০ জন প্রতিবেশী নিহত হন। একটি বোমা আমাদের এত কাছে পড়েছিল যে, আমাদের বাড়ির দেয়াল ও জানালা ফেটে গিয়ে আমার মা, ছোট বোন এবং আমি নিজে আহত হই। দিন-রাত একাকার করে অনবরত বোমা ফুটছিল। দিনের বেলা বাতাসে ধোঁয়া জমে নীল আকাশ ঢেকে যেত। আর রাতে ঘন অন্ধকার ও ধুলোবালির মাঝে জ্বলে উঠত শুধু ফোনের ফ্ল্যাশলাইট, যখন আমরা প্রতিবেশীদের ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনার জন্য পাগলের মতো মাটি খুঁড়তাম।
সত্যিই, শুধু ট্রমা নয়, যা আমাদের এই ভেঙে পড়া মানুষদের গ্রাস করেছে; সঙ্গে যোগ হয়েছে বেঁচে থাকার অপরাধবোধ। আমাদের মাঝ থেকে সবচেয়ে সেরা এবং মহান মানুষদের কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমি হারিয়েছি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, ছাত্রছাত্রী, যারা ছিল সবচেয়ে মেধাবী, সবচেয়ে উদার ও সবচেয়ে দয়ালু।
আমি আর শেখার জন্য বা নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য বই পড়ি না। আমি পড়ি ভুলে থাকার জন্য। চোখ ঝাপসা হয়ে ঘুম না আসা পর্যন্ত আমি পড়ে যাই, যেন মাথার ভেতর থেকে মৃত্যুর ছবিগুলোকে বের করে রাখতে পারি। কল্পকাহিনি বা ফিকশন আমাকে আর আলোড়িত করে না, চমকে দেয় না। আমি তো মানবতাকে চোখের সামনে মরতে দেখেছি; বাকি বিশ্বকে দেখেছি উদাসীনভাবে তা এড়িয়ে গিয়ে উপভোগ করতে। এর চেয়ে বড় কল্পকাহিনি আর কী হতে পারে?
সাইদ আলসালুল: গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনি লেখক; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর
ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- ফিলিস্তিন