ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

প্রেসের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আক্রমণগুলো চরম হতাশারই বহিঃপ্রকাশ

প্রেসের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আক্রমণগুলো চরম হতাশারই বহিঃপ্রকাশ
×
×

মার্গারেট সুলিভান

মার্গারেট সুলিভান

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:৪৭ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩:০৩

মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে আপনি যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো গভীরভাবে ঘৃণা করবেন এবং প্রতিশোধ নিতে চাইবেন, তখন কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আদালতের কোনো রায় নয়, জনমত নয়, এমনকি সংবাদমাধ্যমের কভারেজ কমে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতিও নয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী কীভাবে কাজ করার কথা, সে সম্পর্কিত কোনো নূন্যতম বোধ তো নয়ই।

চলতি সপ্তাহে ট্রাম্পের এই প্রতিশোধের খেলা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। গত সোমবার বিকেলে নেব্রাস্কায় একটি নির্বাচনী প্রচারণায় যাওয়ার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে তার সবচেয়ে অপছন্দের সংবাদমাধ্যম— 'পলিটিকো'কে উঠতে বাধা দেন তিনি। অথচ ওই সফরে পুরো প্রেস ট্রুপের জন্য 'পুল কভারেজ' নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল পলিটিকোর ওপর।

ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের জবাবে বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম অভূতপূর্ব সংহতি প্রদর্শন করে। পলিটিকোর খালি হওয়া সেই আসনে অন্য কাউকে না বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস স্বভাবসুলভ জানায়, প্রেসকে কাজ করার নজিরবিহীন সুযোগ প্রদান অব্যাহত রাখবেন ট্রাম্প।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়, অভ্যাসবশত মূলধারার সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে আবার বিষোদগার করা হয়। ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, 'দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং অন্য অনেক ভুয়া মিডিয়া আউটলেটের অসাধুতা ও দেশের প্রতি অকৃতজ্ঞতার জন্য তাদের গ্রেপ্তার করা উচিত'।

এই ঘটনা ঘটল গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পলিটিকো, সিএনএন ও এমএস নাও-কে হোয়াইট হাউসে নিষিদ্ধ করার চেষ্টার পর। সে সময় সংবাদমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের ওই পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক অ্যাখ্যা দিয়ে আদালতে মামলা পর্যন্ত করে।

পরে ট্রাম্পের নিয়োগ করা বিচারক টিমোথি কেলি সংবাদমাধ্যমের পক্ষে রায় দিয়ে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কেড়ে নেওয়া প্রেস পাস সাংবাদিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য হোয়াইট হাউসকে নির্দেশ দেন।

তবে এই ঘটনার পর বেশ কয়েকদফা সিএনএনের সাংবাদিককে এয়ার ফোর্স ওয়ানে চড়তে বাধা দেওয়া হয়। হোয়াইট হাউসের যুক্তি হলো- হোয়াইট হাউসে প্রবেশাধিকার আর প্রেসিডেন্টের প্লেনে ওঠার অনুমতি, সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর আইনজীবী ও সংবাদমাধ্যম তিনটির প্রতিনিধি টেড বুট্রাস এক বিবৃতিতে বলেছেন, 'আইন খুবই স্পষ্ট। আমাদের মক্কেল, প্রথম সংশোধনী এবং সামগ্রিকভাবে সাধারণ জনগণের যে ক্ষতি করা হচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুতর।' অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো- প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সফর করা একটি 'বিশেষ সুযোগ', এটি কোনো 'অধিকার' নয়।

আইনি এই লড়াই এখনও শেষ হয়নি। মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সুরক্ষায় একটি অন্তর্বর্তী আদেশ চেয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর আবেদনের শুনানি হবে শিগগিরই, বিচারক সেই টিমোথি কেলি।

ট্রাম্প অবশ্য বছরের পর বছর এভাবেই সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে রয়েছেন। এখনও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও ডিজনির (এবিসি নিউজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক) সঙ্গে তার আইনি বিবাদ চলছে।

তবে এবার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে বিরাট এক সংহতি দেখা যাচ্ছে, যা সচরাচর দেখা যায় না। 'কলাম্বিয়া জার্নালিজম রিভিউ' বিষয়টিকে 'হোয়াইট হাউস প্রেস কর্পসের এক অসাধারণ ও অনুপ্রেরণাদায়ী সংহতি' হিসেবে অভিহিত করেছে।

গত মাসে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে যখন হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দেওয়া হয়, তখন প্রেস পুলের অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো সিএনএনের জায়গায় না বসার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে কিছু সময়ের জন্য কভারেজ পুরোপুরি বন্ধও ছিল।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রবীণ সাংবাদিক পিটার বেকার বলেছেন, হোয়াইট হাউস কভার করার ৩০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম প্রেসিডেন্টের প্রতিদিনের অফিশিয়াল কাজ বা সফর কভারেজে কোনো টিভি ক্যামেরা থাকবে না।

ওই তিন সংবাদ প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা মামলা সমর্থন করে এরইমধ্য প্রায় ৫০টি সংবাদ প্রতিষ্ঠান আদালতে 'অ্যামিকাস ব্রিফ' বা বন্ধুভাবাপন্ন বক্তব্য দাখিল করেছে।

কম কভারেজ এবং এই ধরনের ঝগড়া ট্রাম্পের জন্য কীভাবে সুবিধা করে দিচ্ছে- তা বোঝা কঠিন, তবে দৃশ্যত তিনি ভিন্ন হিসাব-নিকাশ করছেন। যেমন, প্রেসের বিরুদ্ধে তার এই পদক্ষেপগুলো প্রচুর প্রচার পায়, যা বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মতো। আর খবরগুলো নেতিবাচক হলেও তাতে তার কিছু আসে যায় না।

সম্প্রতি এক র‍্যালিতে ট্রাম্প দাবি করেন, বিশ্বকে রক্ষা করার জন্য ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রয়োজন ছিল। এমনকি ইঙ্গিত দেন যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগোকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এর জবাবে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্রেটিক গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে 'বিক্ষিপ্ত ও বিপজ্জনক' বলে অভিহিত করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকায় ট্রাম্পের মধ্যে চরম হতাশার ছাপ স্পষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা যেন তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বাস্তবতা যখন তার মনের মতো হয় না, তখন এটাই তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

প্রেস কর্পসের এই সংহতি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক, বিশেষ করে যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায় প্রতিদিন প্রেসকে হেয় করার নতুন নতুন উপায় উদ্ভাবন করছেন। এমন অবস্থায়, আগামী দিনগুলোতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে দাঁড়ানো ছাড়া সাংবাদিকদের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই।

মার্গারেট সুলিভান: গার্ডিয়ান ইউএসের কলামিস্ট

আরও পড়ুন

×