স্মরণ
কমরেড ফরহাদের রাজনীতি ও তাঁর রাজনৈতিক দল
রুস্তম আলী খোকন
রুস্তম আলী খোকন
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ সেই রাজনীতিক, যার শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি বাংলাদেশের রাজনীতিতে। সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সাম্যবাদী রাজনীতিকে আদর্শ হিসেবে স্থির করে তিনি মানবমুক্তির জন্য লড়াই করেছেন আমৃত্যু। ১৯৮৭ সালের ৯ অক্টোবর মস্কো থেকে যখন তাঁর মৃত্যুসংবাদ ঢাকায় পৌঁছে; সকল সাম্যবাদী গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির নেতাকর্মীর মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। বাংলাদেশ পারেনি আরেকজন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ সৃষ্টি করতে। যার জন্য মাশুল গুনতে হচ্ছে আজও। তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা, সততা, দেশপ্রেম আর ত্যাগে মহিমান্বিত আদর্শিক জীবন চর্চা থেকে আজকের তরুণ-তরুণীরাও উজ্জীবিত হতে পারে।
এটা সত্য, কমরেড ফরহাদের মৃত্যুর চার বছর পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক পূর্ব ইউরোপের পতনের পর শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বের সাম্যবাদী রাজনীতি সংকটে নিপতিত হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বামপন্থি রাজনীতি নিঃশেষ হয়ে যায়নি; নতুন আদলে তা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চর্চা হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও তারা ক্ষমতায় যাচ্ছে জনগণের ভোটে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা এবং সেই সময়ের বাংলাদেশের বাস্তবতার সংমিশ্রণে ফরহাদের অনুসারীরা সম্ভবত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছিলেন। অথবা মোহাম্মদ ফরহাদ হয়তো আরও কিছু ফরহাদ গড়ে তুলতে পারেননি। যদি পারতেন তাহলে দিগ্ভ্রান্ত হয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির এমন পরিস্থিতির হয়তো সৃষ্টি হতো না।
সেই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে স্কুলজীবনে পঞ্চগড়ের মতো প্রত্যন্ত জেলায় মোহাম্মদ ফরহাদ জড়িয়ে যান রাজনীতিতে। ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়নে কাজ করতে করতে খুব স্বল্প সময়ে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি তাঁকে আকৃষ্ট করে। পঞ্চাশের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে স্থান করে নেন।
ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। সেই আন্দোলনের ‘মস্তিষ্ক’ ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। বিনিময়ে জেল-জুলুম-হুলিয়া তাঁর জীবনসঙ্গী হয়ে উঠেছিল।
কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ জানতেন কোন সময়ে কোন কাজটি করতে হবে। তিনি বুঝতেন কাকে দিয়ে কোন কাজটি সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। অসম্ভব সাংগঠনিক দক্ষতা আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণের দক্ষতার কারণে নিজ দলের বাইরেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়েছিল।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের ১১ দফা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ গড়ে তুলেছিলেন বিশেষ গেরিলা বাহিনী। ন্যাপ সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে এ বাহিনী যুদ্ধ করেছে রণাঙ্গনে।
মুক্তিযুদ্ধের পর বাহাত্তরের সংবিধানে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ, ব্যাংক-বীমা, পাট-বস্ত্র খাতসহ কলকারখানাকে জাতীয়করণের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রমুখী অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশকে ধাবিত করতে আওয়ামী লীগ সরকারকে প্রভাবিত করতে পেরেছিল মণি সিংহ-ফরহাদের নেতৃত্বাধীন সিপিবি।
আশির দশকের শুরুতে কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ পেরেছিলেন এক দল তরুণ-তরুণীকে দেশপ্রেমে ও সাম্যবাদী সমাজ গঠনে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কামলা বা ক্ষেতমজুর ভূমি হারিয়ে সর্বহারা শ্রেণিতে পরিণত হয়ে শ্রমিক শ্রেণির বাইরেও যে আরেকটি সর্বহারা শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে বাংলাদেশে– তা নির্ণয় করতে পেরেছিলেন তিনি। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির আদর্শে দীক্ষিত করে শহরের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীকে পাঠিয়ে দিতে পেরেছিলেন গ্রামে গ্রামে। যেখানে সংগঠিত হচ্ছিল ক্ষেতমজুররা ভাত-কাপড়, জমি, কাজের দাবিতে।
মোহাম্মদ ফরহাদের আকস্মিক মৃত্যুতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ বিশেষত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন। তাঁর মৃত্যুর পর সিপিবি ভেঙে গেছে; তাঁর অনুসারীদের এক দল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই বলেছেন– ‘সমাজতন্ত্রের আদর্শিক ধারাটি ভুল ছিল’। দল বিলোপ করে বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল গঠন করতে গিয়ে তাঁর সহকর্মীদের বড় অংশ ছিটকে গেছেন রাজনীতি থেকেই। আরেক দল সিপিবি ধরে রাখলেও আশির দশকের সাফল্য ধরে রাখেতে পারেনি। সেই দলও এখন ঐক্য-অনৈক্য আর বিশৃঙ্খলায় হাবুডুবু খাচ্ছে। এক দল হয়েছে বিলোপবাদী, আরেক দল হয়েছে আলাপবাদী।
আজকের বাংলাদেশে যখন ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান ঘটেছে, সেই সময়ে সিপিবিসহ প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য জরুরি। সিপিবির বর্তমান নেতৃত্বকে অবশ্যই দলকে ঐক্যবদ্ধ করায় মনোযোগ দেওয়া জরুরি। মোহাম্মদ ফরহাদ বেঁচে থাকলে আজ সেটাই করতেন। সেটাই হবে এই মহান নেতার প্রতি সিপিবির সত্যিকারের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।
রুস্তম আলী খোকন: লেখক ও সংগঠক
- বিষয় :
- স্মরণ