ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ভারত

বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর করণীয়

বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর করণীয়
×
×

শশী থারুর

শশী থারুর

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভূমিকা এবং অন্যায় উপায়ে ১৩ কোটি ভোটারের ভোটাধিকার হরণের খবর প্রকাশ্যে আসার পর ভারতে একটি উত্তপ্ত বিতর্কের জন্ম হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন–যে ব্যবস্থার ভিতই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বলে দাবি করা হচ্ছে, সেখানে বিরোধী দলগুলোর আদৌ নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত কিনা? সমালোচকরা গণতান্ত্রিক রক্ষাকবচগুলোর ধারাবাহিক ক্ষয়, অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠীগুলোর হাতে প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলদারি এবং সরকারের অনুকূলে ঝুঁকে থাকা এক বৈষম্যমূলক মাঠের দিকে আঙুল তুলছেন। তাদের প্রশ্ন–যে ব্যবস্থাটি আগেই কবজা করা হয়েছে বলে তারা মনে করেন, কারচুপির সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে বিরোধীরা কেন তার বৈধতা দেবে?

এই সমালোচকদের মতে, বর্তমান প্রশাসনের অধীনে নির্বাচনে লড়াই চালিয়ে যাওয়া মানে একটি অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র, যা তাদের ভাষায় এক ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’কে গণতান্ত্রিক বৈধতার পোশাক পরিয়ে দেয়। তারা নীতিগত স্পষ্টতার জায়গা থেকে নির্বাচন বয়কটের পক্ষে যুক্তি দেন। তাদের মতে, ব্যালট বাক্স থেকে সরে দাঁড়িয়ে বিরোধী পক্ষ শাসকগোষ্ঠীকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে গণতান্ত্রিক সম্মতির ছাপ ব্যবহার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বয়কট কোনো আত্মসমর্পণ নয়; বরং এটি অসহযোগিতার একটি কৌশল, যার লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানের পচন উন্মোচন করা, বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করা এবং গণতন্ত্রের ওপর ঘনিয়ে আসা অস্তিত্বের সংকট সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তোলা।

এই যুক্তি যতই আবেগ দিয়ে উপস্থাপন করা হোক না কেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল প্রকৃতি বুঝতে এটি বড় ধরনের ভুল করে। ফরাসি কূটনীতিক তালির‍্যান্ডের সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে– ‘যারা অনুপস্থিত থাকে, তারা সব সময় ভুল প্রমাণিত হয়।’ নির্বাচনের ময়দান থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর অর্থ শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা কেড়ে নেওয়া নয়; বরং প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রীয় কলকবজার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য পুরো মাঠ ফাঁকা করে দেওয়া। যে ব্যবস্থায় ক্ষমতার উৎস সাংবিধানিক কাঠামো, সেখানে লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালানো মানে জনগণকে রক্ষা করা, নীতিকে প্রভাবিত করা এবং কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার মতো প্রতিটি সুযোগ বা হাতিয়ার বিসর্জন দেওয়া। বয়কট সরকারের কলকবজা থামিয়ে দেয় না; এটি কেবল সেই ব্যবস্থাটির ভেতর থেকে সক্রিয় বিরোধীদের তরফ থেকে আসা চ্যালেঞ্জগুলো সরিয়ে দেয়।

বয়কটের সমর্থকেরা প্রায়ই যে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত টেনে আনেন–গান্ধীজি এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম–তাও প্রমাণ করে কেন একটি সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রে এই কৌশল ব্যর্থ হতে বাধ্য। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বয়কট ও বেসামরিক অমান্য আন্দোলন সফল হয়েছিল। কারণ উৎপীড়ক ছিল এক দখলদার বৈদেশিক শক্তি। ঔপনিবেশিক শাসনকে টিকিয়ে রাখার সহায়ক ভূমিকা প্রত্যাখ্যান করে তৎকালীন জাতীয়তাবাদীরা তাদের নৈতিক কর্তৃত্বের চরম অবস্থানটি তুলে ধরেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে বয়কটের লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক সরকারের অপর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা উন্মোচিত করে তাদের লজ্জিত করা।

তবে কোনো ভিনদেশি দখলদারের বিরুদ্ধে তৈরি করা কৌশল একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক দেশে প্রয়োগ করা যায় না, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর নাগরিকত্ব ও সাংবিধানিক কাঠামো অভিন্ন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নিজেও স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এই পার্থক্য উপলব্ধি করেছিল। ১৯১৯ সালের সীমাবদ্ধ মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারের অধীনে নির্বাচন বয়কট করে তারা ঔপনিবেশিকতার প্রতীকী রূপকে প্রত্যাখ্যান করেছিল ঠিকই; তবে ১৯৩৫ সালের গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্টের অধীনে সীমিত ভোটাধিকার ও সম্প্রদায়ভিত্তিক নির্বাচকমণ্ডলী থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতীয় নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে প্রতিনিধিত্বের অধিকার কম যোগ্য শক্তির হাতে চলে যাবে এবং জনগণ সরাসরি ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের অধীনে অসহায় হয়ে পড়বে। আমাদের সমসাময়িক সাংবিধানিক ব্যবস্থায় দেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো নৈতিক অবস্থান নয়, বরং এটি আত্মঘাতী এক চরম রাজনৈতিক পদক্ষেপ।

ইতিহাসের ভুল প্রয়োগের পাশাপাশি নির্বাচন বয়কটের আহ্বান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকে থাকার বাস্তব সত্যকে উপেক্ষা করে। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলো হলো গতিশীল সংগঠন, যা জনগণের সম্পৃক্ততা, কর্মীদের মনোবল এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর ভর করে টিকে থাকে। নির্বাচন বর্জন একটি দলের মূল প্রাণশক্তিই কেড়ে নেয়। দলীয় প্রচার, প্রার্থী ঘোষণা কিংবা স্থানীয় কার্যালয় ধরে রাখার আন্দোলন না থাকলে দলের কর্মী বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, স্থানীয় নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে এবং আর্থিক রসদ শুকিয়ে যায়। বছরের পর বছর নিষ্ক্রিয় থাকার পর একটি সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন, প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। যে দল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান থেকে পিছু হটে, তারা খুব দ্রুত সেই ভোটারদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে, যাদের প্রতিনিধিত্ব তারা করতে চায়।

শশী থারুর: ভারতের লোকসভার সদস্য; 
দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×