শিক্ষাঙ্গন
চুয়েটে অচলাবস্থা: শিক্ষা প্রশাসন কী করছে?
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-চুয়েটের অচলাবস্থা তিন সপ্তাহের কাছাকাছি হয়ে গেল। টানা এই অচলাবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও শিক্ষা প্রশাসনের টনক নড়ছে না। ৫ অক্টোবর সমকালের প্রতিবেদন ছিল, শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে হারাতে যাচ্ছে তিন মাস। সেখানে বলা হয়, দ্রুত সমাধান না হলে পূজার ছুটি যোগ হয়ে শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে পড়বেন। সেই ছুটিরও বেশি দেরি নেই, কিন্তু দেরি হচ্ছে সমাধানের পথ।
সমাধান কীসে? গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েটে শিক্ষার্থীদের ‘সর্বাত্মক শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে। কারণ সেখানকার উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে ৫৬ দিনের মাথায় কোনো কারণ না দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন উপাচার্য হিসেবে চুয়েটে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তিনি ইতোমধ্যে তাঁর কর্মকাণ্ডের কারণে বিতর্কিত। সেখানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম নিয়োগ পেয়েছেন। অন্যদিকে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম চুয়েটেরই শিক্ষক এবং তিনি শিক্ষার্থীদের কথা সরাসরি শুনতেন। তাঁকে পুনর্বহালের জন্যই আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। বলা বাহুল্য, কেবল শিক্ষার্থীরা নয়, শিক্ষকরাও এ আন্দোলনে রয়েছেন। তাদের আন্দোলনের মুখে নতুন উপাচার্য এখনও ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারছেন না। সুতরাং সমাধান এখানে স্পষ্ট।
যেখানে নিজস্ব উপাচার্য দিয়ে চুয়েট দীর্ঘদিন পরিচালিত হচ্ছিল, সেখানে হঠাৎ বাইরে থেকে কেন আরেকজন উপাচার্য নিয়োগ দিতে হলো? কেনইবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়? শিক্ষাঙ্গনে নিয়োগ নিয়ে বর্তমান সরকার যে হযবরল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এটি তারই উদাহরণ। গত জুন মাসে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) ভিসি নিয়োগ নিয়েও এক ধরনের তামাশা আমরা দেখেছি। ১৪ মে সেখানে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে। পরে ৬ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেনকে জাবিপ্রবির নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে আবার নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। অল্প কয়েকদিন উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেই মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে ফিরে যেতে হয়।
জামালপুর ইউনিভার্সিটির ঘটনায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হয়নি বলেই হয়তো সহজ সমাধান হয়েছে। আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও ‘টাইপিং মিসটেক’ বলে পার পেয়ে গেছে। আসল ঘটনা যদিও ভিন্ন। গবেষণাপত্র জালিয়াতিসহ স্পর্শকাতর কিছু অভিযোগের কারণে মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েও দ্রুত সরানো হয়। তখনকার ঘটনায় সরকার দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে সরাচ্ছে না? বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের উপাচার্য ও অন্যান্য প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দিয়েছে, তাতে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চাইতে দলীয় আনুগত্য প্রধান হয়ে উঠেছে। দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুরোনো সেই দখলের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে নিয়োগ বিষয়ে এত সমালোচনা সত্ত্বেও চুয়েটে যেভাবে অচলাবস্থা চলছে এবং সরকার দেখেও না দেখার ভান করছে, তা দুঃখজনক। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা যাকে উপাচার্য হিসেবে চাইছেন না, তাঁকে জোর করে পদায়নের প্রচেষ্টা ভালো হবে না। আর যাঁর বিরুদ্ধে এতদিন ধরে আন্দোলন হচ্ছে, তিনিও যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির অংশীজনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে উপাচার্য হতে চাইছেন, সেটিও ভালো বিষয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সম্মানের জায়গা থেকে তিনি শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে পদত্যাগ করে এর সমাধান করতে পারেন।
তিন সপ্তাহ ধরে চুয়েটের অচলাবস্থায় শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, তা শিক্ষানুরাগী কেউই চাইবেন না। শিক্ষামন্ত্রী নিশ্চয়ই চুয়েটের আন্দোলনের খবর সংবাদমাধ্যমে দেখছেন এবং তাঁর প্রশাসনের মাধ্যমেও জানতে পারছেন। তারপরও নীরবতা কেন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশের ব্যত্যয় ঘটলে সে ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) যেহেতু উচ্চশিক্ষার তদারকি প্রতিষ্ঠান, তারাও উদ্যোগ নিয়ে সমাধানের পথ বের করতে পারে। এতদিন যেহেতু সংকট চলছে, এখন চুয়েটের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি উঠছে। দেশের প্রধান ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছাড়া যেন এই অচলাবস্থা কাটানোর কেউ নেই।
গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে এ ধরনের আচরণ অপ্রত্যাশিত। শিক্ষাঙ্গনকে দলীয় কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বাইরে রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি ও পেশিশক্তি প্রাধান্য পেলে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। সে কারণে চুয়েটের অচলাবস্থা আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদেরও উচিত নিয়মিত পরীক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রম ঠিক রেখে আন্দোলন করা। পড়াশোনায় পিছিয়ে গেলে তারাই পিছিয়ে পড়বেন।
চুয়েটের পরিস্থিতি যে পর্যায়ে গড়িয়েছে, এখন আর শিক্ষা প্রশাসনের নীরবতার সময় নেই। সেখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে চূড়ান্ত সমাধান করতে হবে। এখানে সরকারের জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। শিক্ষাঙ্গনে নিয়োগসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ক্ষমতা আছে বলেই হুট করে কাউকে নামানো আর কাউকে বসানোর সিদ্ধান্ত মঙ্গলজনক নয়। আর সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে যে সেটা সব ক্ষমতা প্রয়োগ করে বাস্তবায়ন করতে হবে, এমন মানসিকতাও পরিহার করা চাই। সব দিক বিবেচনায় চুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি দ্রুত মেনে সমাধানে আসাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। গত বছর কুয়েটে অচলাবস্থা নিয়ে যে সময়ক্ষেপণ হয়েছে, এবার চুয়েট নিয়ে তার পুনরাবৃত্তি নয়।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক