মৎস্য সম্পদ
মা ইলিশ রক্ষায় তিন সপ্তাহের বিবেচ্য
মীর মোহাম্মদ আলী
মীর মোহাম্মদ আলী
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্রামবাংলায় সন্তান জন্মের সময় ঘনিয়ে এলে এখনও অনেক নারী নাইওর যান বাবার বাড়িতে। শ্বশুরবাড়ির দূর পথ পেরিয়ে তারা ফেরেন সেই উঠোনে, যেখানে কেটেছে তাদের শৈশব। মায়ের আঁচল, বাবার ছায়া আর চেনা ঘরের নিরাপত্তায় জন্ম নেয় নতুন প্রাণ। পরিবার তখন সব কাজ ফেলে হবু মায়ের পাশে দাঁড়ায়। কেউ জোরে কথা বলে না, কেউ তাঁকে কষ্ট দেয় না। কারণ সবাই জানে, এই কয়েকটা দিন শুধু একজন মায়ের নয়, পুরো পরিবারের ভবিষ্যতের দিন।
মা ইলিশের গল্পও ঠিক এমনই। সারাবছর সে থাকে বঙ্গোপসাগরের লোনাজলে, সেটাই যেন তার শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু আশ্বিনের পূর্ণিমা ঘনিয়ে এলে তার শরীরে জাগে এক প্রাচীন ডাক। পেটভরা ডিম নিয়ে সে উজান ঠেলে ফেরে মেঘনা, পদ্মা আর তেঁতুলিয়ার মিঠা জলে। সেই নদীতে, যেখানে একদিন সে নিজে জন্মেছিল। এ যেন মা ইলিশের নাইওর, বাপের বাড়ির পথে এক দীর্ঘ যাত্রা। নদীই তার আঁতুড়ঘর। এখানেই সে নিশ্চিন্তে ডিম ছাড়বে আর সেই ডিম থেকে জন্ম নেবে লাখো নতুন ইলিশ।
এই নাইওরের দিনগুলোকে রাষ্ট্র আগলে রাখে। ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর–এই ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত, কেনাবেচা ও বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উপকূলের প্রায় সাত হাজার বর্গকিলোমিটারের মূল প্রজননক্ষেত্র এই কদিন হয়ে ওঠে মা ইলিশের নিরাপদ উঠোন। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই বাবার বাড়ির মতো তাকে আগলে রাখতে পারছি?
ইতিহাস বলছে, পারলে কী ফল মেলে। ২০০৮-০৯ সালে যখন মাত্র ১১ দিন মা ইলিশ রক্ষা করা হতো, তখন মাত্র ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারত। নিষেধাজ্ঞা ২২ দিনে বাড়ানোর পর এই হার ধাপে ধাপে বেড়ে ২০২৩ সালে রেকর্ড ৫২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়। গবেষকদের হিসাবে ২০১৭-১৮ সালের এক মৌসুমেই মা ইলিশ নদীতে রেখে গিয়েছিল প্রায় ৭ লাখ ২৮ হাজার কেজি ডিম, আর তা থেকে ইলিশের সংসারে যুক্ত হয়েছিল প্রায় ৩৬ হাজার কোটি জাটকা। ভাবুন তো, একটি নাইওরের মৌসুম থেকে কত অগণিত প্রাণ! সেই প্রক্রিয়াতে দেশের ইলিশ উৎপাদন ২০০৭-০৮ অর্থবছরের প্রায় ২ লাখ ৯৫ হাজার টন থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছেছিল। কিন্তু আজ সেই নাইওরের পথ আর আগের মতো নিরাপদ নেই। বাপের বাড়ির পথে ওত পেতে থাকে কারেন্ট জাল আর বেহুন্দি জাল, রাতের অন্ধকারে নদীজুড়ে বিছিয়ে রাখা অদৃশ্য ফাঁদ।
আঁতুড়ঘরের দিকে ছুটে আসা মা ইলিশ সেই ফাঁদে আটকে যায়, ডিমসহ উঠে যায় নৌকায়, তারপর চলে যায় গোপন আড়তে। যে মা ইলিশ লাখো সন্তানের জন্ম দিতে এসেছিল, সে আর ফেরে না। এর ফল আমরা দেখছি। মাত্র দুই বছরে ইলিশ উৎপাদন কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমেছে; হারিয়ে গেছে প্রায় ৭১ হাজার টন ইলিশ।
শুধু জাল নয়, বাপের বাড়িটাও আর আগের মতো নেই। যে নদী একসময় ছিল গভীর, স্বচ্ছ আর প্রবহমান, সেখানে আজ জেগেছে ডুবোচর। দখলে সংকুচিত হয়েছে নদীর বুক, শিল্পবর্জ্য আর দূষণে ঘোলা হয়েছে জল, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তলদেশ। যে উঠোনে নিশ্চিন্তে সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা, সেই উঠোনই যদি ভাঙাচোরা হয়, মা কোথায় যাবে? মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরাও নাব্য হ্রাস, দূষণ আর অভিপ্রয়াণপথের বাধাকে ইলিশ কমার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
যে সন্তান জন্ম নেয়, তাদের শৈশবও নিরাপদ নয়। নাইওর শেষে যে শিশুকে সবাই আদরে বড় করে তোলে, ইলিশের সেই শিশুরাই জাটকা। নভেম্বর থেকে তারা উপকূলের নদী আর মোহনায় ঘুরে বেড়ায়, বড় হয়ে একদিন সাগরে ফিরবে বলে। তাদের রক্ষায় ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত টানা আট মাস জাটকা ধরা নিষিদ্ধ। অথচ হাটে-বাজারে এখনও প্রকাশ্যে বিকোয় জাটকা। মা ইলিশকে নাইওরে আগলে রেখে তার সন্তানকে শৈশবেই কেড়ে নেওয়া মানে আঁতুড়ঘরের সব যত্ন বৃথা করে দেওয়া।
তবু সবকিছুর শুরু এই ২২ দিন। মা নিরাপদে সন্তান জন্ম না দিলে শৈশব রক্ষার প্রশ্নই ওঠে না। তাই এই ২২ দিনের সাফল্যই ইলিশের সুদিন ফেরার প্রথম ধাপ। এই কদিন আমাদের কাছে চায় বাবার বাড়ির সেই মমতা। প্রশাসন হবে বাড়ির কর্তা, যার সজাগ পাহারায় রাতের নদীতে কোনো অবৈধ জাল নামবে না। জেলেরা হবেন বাড়ির আপনজন, যারা জানেন, আজ নদী থেকে দূরে থাকা মানে আগামী মৌসুমে ভরা জালের প্রতিশ্রুতি। তাদের হাতে সময়মতো খাদ্যসহায়তা পৌঁছানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ ক্ষুধার্ত মানুষকে ধৈর্যের কথা শোনানো যায় না। প্রতিবেশীরা হবেন পাহারাদার, অবৈধ জাল দেখলে যারা চুপ থাকবেন না আর শহরের ক্রেতা হবেন সেই আত্মীয়, যিনি এই কদিন ইলিশ কিনে মা ইলিশের ঘাতকদের হাতে টাকা তুলে দেবেন না।
‘অবৈধ জাল বন্ধ করো, মৎস্য সম্পদ রক্ষা করো’ আন্দোলনে নদীর তীরে তীরে ঘুরে দেখেছি, মানুষ ইলিশকে ভালোবাসে। ইলিশ আমাদের কাছে শুধু খাবার নয়; সে আমাদের স্মৃতি, উৎসব আর নদীমাতৃক পরিচয়ের প্রতীক। সেই ভালোবাসাকে যদি এই ২২ দিনের যত্নে রূপ দিতে পারি, তবে মা ইলিশ আবার নিশ্চিন্তে নাইওর আসবে, আঁতুড়ঘরে জন্ম নেবে অগণিত প্রাণ আর নদী ভরে উঠবে রুপালি ঝিলিকে।
মায়েরা নাইওর থেকে ফেরেন কোলে নতুন প্রাণ নিয়ে। আসুন, মা ইলিশকেও তেমনি নিরাপদে ফিরতে দিই। এ ২২ দিনের সাফল্যেই শুরু হোক ইলিশের সুদিন ফেরার পথচলা।
মীর মোহাম্মদ আলী: সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, অ্যাকুয়াকালচার বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ