ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

তৃতীয় মেরু

গঙ্গা চুক্তি নবায়ন: টু বি অর নট টু বি

গঙ্গা চুক্তি নবায়ন: টু বি অর নট টু বি
×
×

শেখ রোকন

শেখ রোকন

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

গঙ্গা অববাহিকার ভূ-প্রকৃতিতে যখন হিম হিম হেমন্ত নেমে আসছে; তখন মেয়াদ শেষের দিনগুলোতে নবায়িত কিংবা নতুন গঙ্গা চুক্তির সম্ভাবনা কিংবা আশঙ্কা ঘিরে ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠছে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম তো বটেই, বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক জগৎকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে সেই আঁচ।

যেমন–বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করতে গ্যারান্টি ক্লজসহ ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নতুন গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি চায় বাংলাদেশ। বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন একটি ব্যবস্থা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে নিয়মিত কাজ করছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক ওই সেমিনারে আমারও যোগ দেওয়ার সুযোগ ঘটেছিল। সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পানিসম্পদমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘আমরা আশাবাদী এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকের ভিত্তিতে ১২ ডিসেম্বরের আগেই চুক্তিটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে’ (বাসস, ৮ অক্টোবর ২০২৬)।

গঙ্গা নিয়ে ‘নতুন চুক্তি’ দূরে থাক, নবায়নই যে সহজ নয়–সেটা বোঝা যায় সীমান্তের ওপাশে কান পাতলে। যেমন বিহারের জনতা দল ইউনাইটেড থেকে মনোনীত সদস্য সঞ্জয় ঝা গত ৬ আগস্ট দেশটির উচ্চকক্ষ রাজসভায় ‘স্পেশাল মেনশন’ হিসেবে আহ্বান জানিয়েছিলেন, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি যেন নবায়ন না হয়। কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি বিহারে ‘নেতিবাচক প্রভাব’ ফেলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখে জানিয়েছেন, গঙ্গা চুক্তির ব্যাপারে বিহারের ‘উদ্বেগ সম্পূর্ণ আমলযোগ্য’ এবং সরকার এসব বিষয় ‘মাথায় রেখেই’ উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে (দি ইকোনমিক টাইমস অব ইন্ডিয়া, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় পানিসম্পদমন্ত্রীর বক্তব্যের জের ধরে নয়াদিল্লিতে শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়স্বলকে বাঙালি সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বাংলাদেশের পানিসম্পদমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন যে, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ১২ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই পুনঃস্বাক্ষরিত হবে। আপনি কি তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত?’ জবাবে জয়স্বল বলেছেন, ‘যেমনটি আগেও বলেছি, আপনি জানেন, নদীবিষয়ক ও পানিবিষয়ক সকল আলোচনা যৌথ নদী কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে আলোচনা হয়ে থাকে’ (ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট, ৯ অক্টোবর ২০২৬)।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ডিসেম্বরের ১১ তারিখের মধ্যে গঙ্গা নিয়ে ‘নতুন’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না; ভবিষ্যতে কতদিনে হবে, সেটা স্পষ্টতই অনিশ্চিত। আর বিদ্যমান পানিবণ্টন চুক্তিটি নবায়ন হবে কিনা, সেটাও নির্ভর করছে খোদ গঙ্গা নদী ছাড়া অন্য অনেক কিছুর ওপর। প্রধানত দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আকস্মিক উন্নতির ওপর; যদিও সেই লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে মনে করা যায় ১৯৭৭ সালের গঙ্গা চুক্তির মেয়াদের শেষ দিনগুলোর কথা। ওই চুক্তির মেয়াদ যদিও ১৯৮২ সালের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত ছিল, চুক্তির আওতায় পানি ভাগাভাগির মৌসুম ওই বছরের মে মাসেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। চুক্তিটির ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, মেয়াদপূর্তির ছয় মাস আগে চুক্তিটি পর্যালোচনা হবে; আর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ওই পর্যালোচনার ভিত্তিতে উভয় পক্ষের সম্মতিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে।

গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ১৯৯৬ বাস্তবায়নসংক্রান্ত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমিটির ৯০তম নিয়মিত বৈঠক; ২২ মে ২০২৬, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ। যৌথ নদী কমিশনের ফেসবুক পেইজ থেকে প্রাপ্ত আলোকচিত্র

বাংলাদেশ পক্ষ ওই দুই অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি দিয়ে মে মাসের মধ্যে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করলে ভারতীয় পক্ষ তাতে রাজি হয়নি; এর বদলে নতুন করে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ অগত্যা ১৯৮২ সালের অক্টোবর মাসে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এতে বলা হয়, ১৯৮৪ সালের মে মাস পর্যন্ত আগের ফর্মুলাতেই পানি ভাগাভাগী হবে (ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটার ইস্যুজ ইন সাউথ এশিয়া, তৌহিদুল আনোয়ার খান, বেলা ২০০৭)।

লক্ষণীয়, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তিতেও উভয় পক্ষের সম্মতিতে ‘অবশ্যই নবায়নযোগ্য’ বলা হয়েছে, ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে। আশঙ্কার বিষয়, ১৯৭৭ সালের চুক্তির ১৫ অনুচ্ছেদের মতো বিদ্যমান চুক্তির ১২ অনুচ্ছেদও ভারত অগ্রাহ্য করতে পারে।

ক্ষুদ্র বিদ্যা ও পর্যবেক্ষণে আমি যতদূর বুঝি, এর মধ্যেও ‘নাটকীয়’ কিছু ঘটলেও ঘটতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নিয়ে যেতে নয়াদিল্লি যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে; আমার ধারণা, গঙ্গা চুক্তির ব্যাপারে ‘কিছু একটা’ নিশ্চিত না করে তিনি এই সফরে যাবেন না। ভারতীয় সরকারি-বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, তারাও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি কাজে লাগাতে আগ্রহী। তবে সেটা গঙ্গা নিয়ে নতুন চুক্তি কিংবা বিদ্যমান চুক্তির নবায়ন পর্যন্ত যাবে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের জন্য ‘মুখরক্ষামূলক’ কিছু ঘটতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি ডিসেম্বরের আগেই ভারত সফরে যান, আমার ধারণা ১৯৮২ সালের মতোই আরেকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। সেখানে ১৯৮২ সালের মতোই বলা হতে পারে যে, আগামী দু-তিন শুকনো মৌসুমে বিদ্যমান ফর্মুলাতেই পানি ভাগাভাগি হতে থাকবে। আর ওই সময়ের মধ্যে ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি পর্যালোচনা করে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর কিংবা পুরোনো চুক্তি নবায়ন হবে।

সন্দেহ নেই, বিদ্যমান গঙ্গা চুক্তির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন–চুক্তি সাধারণত মেয়াদি হয় না, ভারত-পাকিস্তানের সিন্ধু চুক্তিই এর প্রমাণ; কিন্তু ১৯৭৭ ও ১৯৯৭ উভয় চুক্তিই মেয়াদি, যথাক্রমে পাঁচ বছর ও ৩০ বছর। যেমন–নেপাল গঙ্গা অববাহিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও চুক্তিটি ত্রিপক্ষীয় হওয়ার বদলে দ্বিপক্ষীয় হয়েছে। যেমন–উভয় চুক্তিতে চুক্তিটিতে ফারাক্কা পয়েন্টে এসে পৌঁছানো প্রবাহ ভাগাভাগির কথা বলা হয়েছে; অথচ উচিত ছিল গোটা গঙ্গার পানির হিসাব বিবেচনায় নেওয়া। আরেকটি সীমাবদ্ধতার কথা বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ফারুক সোবহানও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন; সালিশি ধারার অনুপস্থিতি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির অন্যতম প্রধান সমস্যা (দ্য হিন্দু, ৬ অক্টোবর ২০২৬)।

আমার মতে, বিদ্যমান চুক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো অবশ্যই পর্যালোচনা করা উচিত; কিন্তু সেটা চুক্তিটি নবায়নের পরে। সীমান্তের উভয় পাশের রাজনীতির ডামাডোলে আমাদের অবশ্যই মনে রাখা জরুরি, চুক্তিহীন পরিস্থিতি ভাটির দেশের জন্য মঙ্গল হবে না। ভূ-প্রাকৃতিক ও জলবায়ু পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৯৮২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত গঙ্গায় চুক্তিহীন পরিস্থিতি যতটা সহনীয় ছিল, ২০২৭ সাল-পরবর্তী সময়ে সেটা ততটা সহনীয় নাও হতে পারে। চুক্তিহীন পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, তিস্তার বর্তমান অবস্থা এর প্রমাণ।

অভিন্ন বা আন্তঃসীমান্ত নদীর বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে একটি কথা চালু আছে; চুক্তিহীনতার চেয়ে সীমাবদ্ধতাসহ চুক্তি ভালো। এর সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে নতুন চুক্তির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষার চেয়ে বিদ্যমান চুক্তি নবায়ন করেই নতুন চুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা ভালো। 

শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×