সাদাকালো
জ্ঞানেশ কুমার, এসআইআর এবং বিজেপির একিলিস হিল
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১০:৪৩
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর সম্ভবত নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের জন্য ‘একিলিস হিল’ হতে যাচ্ছে। অথচ কিছুদিন আগেও দলটির কাছে নির্বাচনী কর্মসূচিটি ছিল রাজনৈতিক আশীর্বাদস্বরূপ। বিশেষত, গত বছরের বিহার এবং এ বছরের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোটের পর এসআইআর হিন্দুত্ববাদী দলটির জন্য মোক্ষম আয়ুধ হয়ে ওঠে।
গোবলয়ের অন্য রাজ্যে ব্যাপক দাপট দেখালেও গত বছরের আগে বিজেপি বিহারে কখনও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। গত দুই মেয়াদে তাকে নিতীশ কুমারের জেডিইউর জুনিয়র শরিক হিসেবে থাকতে হয়েছে। ২০২৫ সালের ভোটে রাজ্যের একাধিকবারের মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডি ও বামপন্থি দলগুলোকে নিয়ে মহাজোট গঠন করেছিল কংগ্রেস। ‘পল্টিবাজ’ বলে পরিচিত নিতীশ কুমারের প্রতি জনগণের হতাশা এবং ২০২৪ সালের লোকসভার ভোটে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের বাজি ছিল মহাজোটের পক্ষে। কিন্তু ‘নির্ভুল’ ভোটার তালিকা প্রণয়নের নামে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন এসআইআরের মাধ্যমে প্রায় ৬৫ লাখ ভোটার বাদ দিয়ে সব হিসাব উল্টে দেয়। তখন বর্তমান লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এর বিরুদ্ধে ভোটাধিকার যাত্রা করে বিজেপির বিরুদ্ধে গুজরাট মডেলে ভোটচুরির অভিযোগ এনেছিলেন। কিন্তু তাতে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
বিহারের আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভোটেও বিজেপি তাক লাগানো ফল করে। সেখানেও ভোটের আগে এসআইআর হয়েছিল। রাহুল গান্ধীর বক্তব্য ছিল, ‘লোকসভা নির্বাচনের পর মহারাষ্ট্রের ভোটার তালিকায় অন্তত এক কোটি অতিরিক্ত নাম যোগ করা হয়েছে, যার পুরোটাই গেছে বিজেপির ঝুলিতে।’
এ বছরের মে মাসে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি, যা দলটির দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন জয়ের তুল্য। বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জনসংঘ ১৯৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গেই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হাতে। দলটির দাবি দলটি আঁতুরঘরে অবশেষে জয় পেল। বিরোধীদের অভিযোগ, বিজেপি এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে ওই এসআইআরের কল্যাণে। ওই প্রক্রিয়ায় সেখানে প্রথমে প্রায় এক কোটি ভোটার বাদ পড়ে, যাদের মধ্যে ২৭ লাখ কোনোভাবেই ভোটাধিকার ফিরে পায়নি।
উল্লেখ্য, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর যাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়, তাদের বৃহৎ অংশ মুসলিম এবং বিজেপিবিরোধীদের সমর্থক। স্বাভাবিকভাবেই ইসিআইয়ের এ রেসিপি বিজেপির বেশ পছন্দ হয়। এসআইআর বিস্তৃত হয় আরও নতুন কয়েকটি রাজ্যে, যেগুলোতে আগামী বছর বা তার পরবর্তী বছর ভোট হওয়ার কথা আছে। এর মধ্যে কংগ্রেসশাসিত কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানাও আছে। কর্ণাটকে বিজেপি একবার জিতলেও সামনে সুবিধা হবে বলে ভরসা পাচ্ছে না; তেলেঙ্গানায় বিজেপি বহু চেষ্টার পরও আজ পর্যন্ত দাঁত বসাতে পারেনি।
অভিযোগ উঠেছে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে ইসিআই এ পর্যন্ত ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দিয়েছে, যা অব্যাহত থাকলে আগামী লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে তেমন কোনো বেগ পেতে হবে না।

বলে রাখা দরকার, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সংসদে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের আইন পাস হওয়ার পর ২ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে তা কার্যকর রয়েছে। আইনটির খসড়া করেছিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, যেখানে নিয়োগ কমিটির তিন সদস্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ছিলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি। কিন্তু সংসদে তা পাস করার সময় মোদি সরকার প্রধান বিচারপতির জায়গায় একজন কেবিনেট মন্ত্রীকে রাখেন। এতে নির্বাচন কমিশন তথা ইসিআই নিয়োগ কার্যত ক্ষমতাসীন দলের কর্তৃত্বে চলে যায়। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই সদস্যকে নিয়োগ দিয়েছে মোদি সরকার। শুধু তা নয়, তাঁর সব কর্মকাণ্ডের জন্য আইনি সুরক্ষাও দিয়েছে। এতে তিনি বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের কোনো অভিযোগই পাত্তা দিচ্ছেন না।
সম্প্রতি ভারতজুড়ে যে প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, তা এই পটভূমিতেই জন্ম হয়েছে। তবে এর শুরু সহজ পথে হয়নি। যেমন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা বা সম্মিলিত বিরোধী দলের সব এমপি একযোগে বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধের আহ্বান জানালেও নির্বাচন কমিশন বিশেষত জ্ঞানেশ কুমার তাতে সাড়া দেননি। এর মধ্যে ভারতের প্রধান বিচারপতি এক মামলার শুনানিতে তরুণদের ব্যঙ্গ করে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেন, যা জেন-জি বলে খ্যাত তরুণদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে। জন্ম নেয় ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। এদের উদ্যোগেই মূল বিক্ষোভ শুরু হয়। সব বিরোধী দল সেখানে শামিল হয়। এখন বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও জেন-জির বার্তা হলো– প্রধানমন্ত্রী মোদির মনোনীত ব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রণ করলে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। তাই তারা শুধু জ্ঞানেশ কুমারেরই পদত্যাগ চাচ্ছেন না, নির্বাচন ব্যবস্থারও পরিবর্তন চান।
উল্লেখ্য, এরই মধ্যে ভারতের মেডিকেল কলেজগুলোর ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে সিজেপি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তুমুল বিক্ষোভ শুরু করে। এতে সাফল্যও আসে। সম্ভবত এ ঘটনাই সরকারবিরোধী সব পক্ষকে এসআইআর ইস্যুতে রাস্তায় নামার সাহস জোগায়। বিক্ষোভের পালে ইতোমধ্যে এতই হাওয়া লেগেছে যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও এখন জ্ঞানেশ কুমারবিরোধী বিভিন্ন আবেদন শুনে যাচ্ছেন। অথচ বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে বিরোধীরা সুপ্রিম কোর্টে গেলেও আদালতের বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত কার্যত নির্বাচন কমিশনেরই পক্ষে যায়। যে কারণে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পসম প্রতিবেদনে জ্ঞানেশ কুমার অন্য দুই কমিশনারের মতকে উপেক্ষা করে এসআইআর-সংক্রান্ত একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলার পর, নির্বাচন কমিশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছিল, তাদের অন্তত ফরম-৬-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে সুপ্রিম কোর্টের সম্মতি ছিল; যদিও সাম্প্রতিক শুনানিতে সর্বোচ্চ আদালত তা অস্বীকার করেছেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বলছে, সরকার ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নেই। সরকারও বর্তমান অবস্থানে কতদিন থাকবে, এ নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। মনে রাখতে হবে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারতে নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোট হয়ে আসছে। উপরন্তু, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠারা গণতন্ত্রের জন্য জরুরি প্রতিষ্ঠানগুলো মজবুত করার দিকে মনোযোগী ছিলেন। যে কারণে একই গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া পাকিস্তান ও বাংলাদেশে দশকের পর দশক সামরিক শাসন দেখা গেলেও ভারতে তা ঘটেনি। এ ব্যবস্থা সেখানকার জনগণকে অন্তত ভোটাধিকারের যে স্বাদ দিয়েছে, নরেন্দ্র মোদির পক্ষে তা ভুলিয়ে দেওয়া অসম্ভব। এতদিনে তিনি নিশ্চয় বুঝে গেছেন, সংখ্যাগুরুদের হিন্দুত্ববাদের নেশায় ভুলিয়ে ২০১৪ ও ২০১৯ সালে– দুই দফা বাজিমাত করা গেলেও তৃতীয় দফায় তা তেমন কাজ করেনি। চতুর্থ দফার জন্য এসআইআর অস্ত্র ব্যবহারের ফন্দি আঁটলেও এরই মধ্যে তা ধরা পড়ে গেছে। এখানে গোঁ ধরলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। ফলে কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধী দলের দাবি মেনে তিনি পদত্যাগ না করলেও নির্বাচন কমিশনকে বিরোধীদের মত নিয়ে ঢেলে সাজাতেই হবে।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- ভোটার তালিকা