ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে যা হচ্ছে

পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে যা হচ্ছে
×
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে দুইজন চাকরিপ্রার্থীর সব যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েও পুলিশ ভেরিফিকেশন টপকাতে না পারার ঘটনা সংগত কারণেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছিল। এ দুই ঘটনা বলতে গেলে সরকারি নিয়োগের গোটা প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

উল্লেখ্য, শুধু এই দুইজন নয়; কোনো ধরনের মামলা কিংবা অপরাধের রেকর্ড না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ব্যাচের বিসিএস পরীক্ষার্থী গেজেডভুক্ত হয়েও পুলিশ ভেরিফিকেশন নেতিবাচক হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন। জানা যায়,  বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৪৩তম বিসিএসে ৬৫ জন (প্রথম আলো, ২ জানুয়ারি ২০২৫) এবং ৪৪তম বিসিএসে ১৬৫ জনকে (প্রথম আলো, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) চূড়ান্ত নিয়োগ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আর এ বছর ২ অক্টোবর সমকাল জানিয়েছে, ৪৮তম  বিসিএসে বাদ দেওয়া হয়েছে ২১ জনকে। 

বলা হয়ে থাকে, পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্য মূলত দুটো। প্রথমত, চাকরির আবেদনে প্রার্থীর দেওয়া তথ্য ঠিক আছে কিনা এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে কিনা, সেগুলো দেখা। কিন্তু ওপরে বর্ণিত তিন ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা এ দুই পরীক্ষায় পাস করেছেন, তবুও তাদের ভাগ্যে কাঙ্ক্ষিত চাকরি জোটেনি।

আমাদের দেশের বিসিএসসহ প্রায় সব সরকারি চাকরি প্রক্রিয়া অনেকটা লম্বা। দুই থেকে তিন বছর লেগে যায়। এ কারণে হয়তো যে প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলকে তার ঠিকানা দিয়ে চাকরির আবেদন করেছে, সে তিন বছর পর আর হলে থাকে না। খুব স্বাভাবিক সেটি। সে এখন কোথায় আছে, কী করছে, সেটি কিন্তু জানা যায়। কারণ এখন যোগাযোগ অনেকটাই ইমেইল এবং মোবাইল ফোননির্ভর। তবে সরকারি বা বেসরকারি কাজে এখনও ডাক সেবার ব্যবহার শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই প্রচলিত।

গত কয়েক দশক ধরেই বাংলাদেশে সরকারি চাকরিক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনে, যেটি সবচেয়ে বেশি ঘটছে তা হলো প্রার্থীর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনা। শুধু প্রার্থীর নয়, তার আত্মীয়স্বজন কারা কী রাজনীতি করে বা করেছে; সেটিও বিবেচনায় আনা হয়। এমনকি রাজনীতিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু জেলা, থানাকে টার্গেট করা হয়। এখন যেমন করা হচ্ছে গোপালগঞ্জকে, অন্য সময় করা হতো বগুড়াকে। 
মূলত প্রার্থী কিংবা প্রার্থীর আত্মীয়স্বজনের বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পর্ক দেখতেই ভেরিফিকেশনকে ব্যবহার করা হয়; যদিও ভেরিফিকেশন ফর্মে এ ধরনের কোনো শর্তই নেই।  আগের আমলে এগুলো দেদার ঘটেছে; এখনও ঘটছে। কিন্তু এটি নিয়ে প্রতিবাদ হয় না। কারণ ধরেই নেওয়া হয়, পুলিশি ভেরিফিকেশন মানেই গোপন রিপোর্ট। কিন্তু একজন প্রার্থী যে কিনা গেজেটভুক্ত হয়েছে, সে নিশ্চিত– তার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো মামলা নেই। তবে কেন চাকরি থেকে বাদ পড়ল, সেটি জানার অধিকার তার নেই?

মিশন আচার্য এবং ক্লিন্টন সাহা জানতে পেরেছেন তাদের নিয়োগ না দেওয়ার কারণ। সেগুলো গণমাধ্যমের বরাতে তারা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পেরেছেন, এই ধরনের বৈষম্য সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। সংবিধানের এই অংশে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না বলে স্পষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক মানুষেরই তো স্থায়ী ঠিকানা না থাকতে পারে। ঢাকা শহরে অসংখ্য মানুষ বস্তিতে থাকে; অনেকেই এখনও রেললাইন এবং ফুটপাতে ঘুমায়। সেই জায়গা থেকে যদি কেউ সরকারি চাকরি পায়, তাহলে তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে না? 

আগেই বলা হয়েছে, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে যে বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তা ভেরিফিকশন ফর্মে নেই। কিন্তু এটাই প্রধানত গুরুত্ব পাচ্ছে। চলছে যুগের পর যুগ। ভেরিফিকেশন খোঁজে আসলে নিয়োগ প্রার্থীর রাজনৈতিক সনদ। যদি যুক্তির খাতিরে ধরেই নিই, বাদপড়া প্রার্থীরা ভিন্ন মতাদর্শের কিংবা তাদের বাড়ি একটি নির্দিষ্ট জেলায়, তাহলে এর প্রভাব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সেবায় কীভাবে পড়ে? এতে তো বহু মেধাবী কর্মকর্তার সেবা থেকেও রাষ্ট্র বঞ্চিত হয়। আসলে এখানে যারাই ক্ষমতায় যায় তাদের কাজই হয়ে ওঠে নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কীভাবে কতটা প্রতিশোধ নিতে পারা যায়। ‘অমুক সরকারের সময় তো অমুক হয়েছিল, তাহলে আমরা করলে সমস্যা কোথায়’– এই বাক্যই আসলে মানুষকে ক্রমশ অধিকারহীন করে তুলছে।

বলা বাহুল্য, গেজেটে বিসিএস উত্তীর্ণ নাম দেখে সব প্রার্থীর মধ্যেই অনেক স্বপ্ন জাগে। তাদের মধ্যে যারা অনেক প্রান্তিক পরিবার থেকে এসেছে, সেসব পরিবারের লোকজনও হয়তো ভেবেছে, এবার একটু সুখের মুখ দেখবে। কিন্তু সব আশা শেষ। তারা জানে না, তাদের ছেলেমেয়ের অপরাধ কী।

কিন্তু এগুলোর জবাব কোথায় মিলবে? প্রতিটা বিসিএস বা এ রকম নিয়োগ পরীক্ষার পর পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে কথা ওঠে। এক সময় তা থেমেও যায়। এত বড় বৈষম্যের ঘটনায় সংবিধানের অভিভাবক সর্বোচ্চ আদালত যেমন কোনো রা করেন না, তেমনি সচেতন নাগরিকরাও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন না। 

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

আরও পড়ুন

×