ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যের দেশে বিমান কেনার বিলাসিতা

ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্যের দেশে বিমান কেনার বিলাসিতা
×
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৯ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ১৪:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে টানা চার বছর দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ জানিয়ে বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বলেছে, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নিম্নমুখী। এই চার বছরে দেশের ৮০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে আছেন প্রায় ছয় কোটি ২০ লাখ মানুষ। যে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদির চাপে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ২০০১ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। পরবর্তী দুই দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমতে কমতে ২০২২ সালে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছিল। এর পরের বছর থেকে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করে। এ বছর দারিদ্র্যের হার ২২ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, এই হার ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী; সংস্থাটির হিসাবে, দেশে বর্তমানে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ কোটি।

বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে যেতে পারে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ গত ৩৩ বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন স্থবিরতায় কর্মী ছাঁটাইসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই অবস্থায় ব্যয়ের সঙ্গে সরকারি রাজস্ব আয়ের তাল মেলানো কঠিন হয়েছে। এতে বাড়ছে ব্যাংকনির্ভর সরকারি অর্থায়ন, সুদ পরিশোধের চাপ ও ভর্তুকি। বিশ্বব্যাংক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ব্যাংক খাত, জ্বালানি ও রাজস্ব ব্যবস্থায় দ্রুত সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে। 

দুর্বল ব্যাংক খাতকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অন্যতম ঝুঁকি বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুন মাস শেষে তা পৌঁছেছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে। এই খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই দেশের মাত্র ১০টি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে বলা হয়, দ্রুত সম্পদের মান পর্যালোচনা করে কোন ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। লোকসানের দায় মালিক ও বিনিয়োগকারীদের বহন করতে হবে। সুদহারের ব্যবধানের সীমা তুলে নেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। 

২.
অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলছেন, জনগণের অর্থ লুটপাট হয়েছে। আর সেই লুটপাটের টাকা জনগণকেই এখন দিতে হবে। তিনি বলেছেন, ‘আমি যখন দায়িত্ব নিই, তখন দেখলাম ব্যাংকের তিন ভাগের এক ভাগ টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে কিছু লোক। এটাকে ঠিক চুরি বলা যাবে না; এটা লুট হয়েছে। ব্যাংকের টাকা লুট থেকেই আর্থিক সমস্যার শুরু’ (প্রথম আলো, ১১ অক্টোবর, ২৬)। ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়ে গভর্নর আরও বলেছেন, ‘লুট করে নিয়ে গেছে অন্য কয়েকজন, আর এখন সেই ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে জনগণের করের টাকা দিয়ে। জরিমানা দিচ্ছেন মূলত দেশের সাধারণ নাগরিকরা’ (সমকাল, ১১ অক্টোবর, ২৬)।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে লুটপাট করেছে এক দল ক্ষমতাবান মানুষ; তার দায় কেন বহন করবে দেশের সাধারণ মানুষ? আবারও যে ব্যাংক খাত ক্ষমতাবান মানুষদের লুটের আখড়া হয়ে উঠবে না, সে নিশ্চয়তা কে দেবে? পাচার হওয়া টাকা বা সম্পদ ফেরত পাবার সরকারি উদ্যোগগুলোর ফলাফলও দৃশ্যমান হতে হবে। এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে, দেশে-বিদেশে থাকা প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ বা ক্রোক করবার আদেশ দিয়েছেন আদালত। বিদেশে থাকা সম্পদ ফেরত আনা কঠিন হলেও লুটেরাদের দেশে থাকা ৫৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ উদ্ধার করা কঠিন নয়। দেশে থাকা টাকা উদ্ধার না করে লুটের টাকার দায় নিরীহ জনগণের কাঁধে সমর্পণ করা অবশ্যই কাজের কথা নয়। একই সঙ্গে রুগ্‌ণ ব্যাংকগুলোকে যে কোনো উপায়ে টিকিয়ে রাখবার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। খোঁড়া ঘোড়া দৌড়ে টিকে থাকে না; খোঁড়া ব্যাংকের দায় জনগণের কাঁধে চাপানোর যুক্তি নেই। 

যদি রুগ্‌ণ ব্যাংক টিকিয়ে রাখতেই হয়, তবে মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ সামনে নিয়ে খারাপ ঋণ দূর করবার পাশাপাশি মূলধন ও কাঠামো বদলের সিদ্ধান্ত বিবেচনায় নিতে হবে। অবশ্যই দোষী ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে। বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে আর্থিক খাত সংস্কারে কমিশন গঠন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগ বিলুপ্ত করবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আগামীতে এই প্রুতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক খাতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পুরোনো সংস্কৃতি থেকে সরকারকে অবশ্যই মুক্ত থাকতে হবে। 

৩.
একদিকে গত চার বছরে দেশে আরও ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পৌঁছেছেন; আরেকদিকে দেশের গুটিকয় লুটেরা ব্যাংক খাত ফোকলা করে ছয় লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। এই ভয়াবহ দুর্নীতির বিচার যেমন অতি জরুরি, একই সঙ্গে এই সংকটকালে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমে দরিদ্র মানুষের মূমুর্ষু বর্তমানকেই প্রাধান্য দেওয়া সংগত। অবশ্য সরকারকে ভবিষ্যৎমুখী বৃহৎ প্রকল্পের কথা নিশ্চয়ই ভাবতে হবে, তবে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রও সরকারকে সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। 

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং এবং ইউরোপ থেকে এয়ারবাস ক্রয়ের দুই চুক্তি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ– সংশ্লিষ্টরা ভেবে দেখতে পারেন। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিক ও বড় করবার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে সরকার; এর সম্ভাব্য মূল্য কমবেশি ৭৫ হাজার কোটি টাকা। গত বুধবার ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হলেও কত অর্থ খরচ হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি বিমান বা এয়ারবাস।  
দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রাধিকার যে কোনো বিবেচনায় সবার আগে আসা প্রয়োজন। জ্বালানি সংকট সমাধান ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ব্যাপারেও বাস্তবানুগ ও দ্রুত উদ্যোগ জরুরি। উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্বে সুনাম অর্জনকারী বাংলাদেশের দীর্ঘকালীন আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নকে গণতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। গণতন্ত্র ও সুশাসনের অভাব দেশের ব্যাংক খাতসহ মূল অর্থনৈতিক প্রবাহকে লুটতরাজের স্বর্গ বানিয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে মানুষের মৌলিক প্রত্যাশা রয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন মূল্যস্ফীতি আর কর্মসংস্থানের অভাবে পিষ্ট হবে না। বর্তমানে জনসাধারণের আবশ্যিক চাহিদাগুলোর জোগানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা সরকারের প্রধান আগ্রহের ক্ষেত্র হওয়া অনেক বেশি প্রয়োজন। 

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×