ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

মানব সম্পদ

শিক্ষিত বেকারের পাহাড়ে উচ্চশিক্ষার অন্ধ দৌড়

শিক্ষিত বেকারের পাহাড়ে উচ্চশিক্ষার অন্ধ দৌড়
×
×

মাহফুজুর রহমান মানিক

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

রোববার সমকালে প্রকাশিত ‘যত বেশি শিক্ষিত তত বেশি বেকার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বিবিএসের ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপের ফলই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বেকারদের মধ্যে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৩ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করা বেকারদের হার ৭ শতাংশের একটু বেশি, যেখানে মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়ালেখা করে বেকার প্রায় ২ শতাংশ। আর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই যাদের, তাদের হার সর্বনিম্ন ১.২৫ শতাংশ। 

শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের সংকট ও বেকারত্বের সমস্যা অনেক বছর ধরেই আমরা দেখছি। দিন দিন সমস্যা আরও বাড়ছে। কারণ শিক্ষিতরা পড়াশোনা করে যেই হারে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন, সেই হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। প্রতিবছর ২০ লাখ কর্মক্ষম যুবকের মধ্যে ৯ লাখ কাজের সুযোগ পান; তার মানে অর্ধেকের বেশিই বেকার। এদের মধ্যে শিক্ষিতরাই যে এগিয়ে, ওপরের পরিসংখ্যান তাই বলছে। 

শিক্ষিত বেকারের বিষয় যখনই আসে, তখন শিক্ষার কথাও আসে। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে আমাদের কর্মবাজারের অসংগতি প্রকট। কর্মবাজারের আলোকে দেশে পরিকল্পিতভাবে উচ্চশিক্ষা সাজানো হয়নি। আরও বড় যে প্রশ্ন ইতোমধ্যে উঠেছে, সেটা হলো– সবার জন্য উচ্চশিক্ষার আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা। উচ্চ মাধ্যমিকের পর এখন অধিকাংশই উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হচ্ছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কুলোতে না পারলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। হুজুগে সবাই উচ্চশিক্ষায় আসার কারণে সংকটও বেড়েছে নানাদিক থেকে। বিশেষ করে মান নিয়ে প্রশ্ন, বাজার ও সময়ের সঙ্গে বিষয় ও কোর্সের অসংগতি এবং বেকারত্বের হার বৃদ্ধি– এই তিনটি সংকট তৈরি হয়েছে।  

বলার অপেক্ষা রাখে না, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, তেমনি উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরির ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। গত বছরের নভেম্বরে এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য জানিয়েছেন, দেশের উচ্চশিক্ষার ৭০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতেই আমরা জেনেছি, উচ্চশিক্ষিত বেকারদের ৬২ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। এখানে এককভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির দায় নেই। বরং সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্মবাজার উপযোগী শিক্ষা ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছে। এখানে দায় সামষ্টিক। উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরিকল্পনার অভাবেই এ চিত্র আমরা দেখছি।

উচ্চশিক্ষিতদের সাম্প্রতিক প্রবণতা হচ্ছে সরকারি চাকরি। বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে প্রভাব- প্রতিপত্তি ও সাম্প্রতিক সময়ে সুযোগ-সুবিধা বেশি হওয়ায় সেদিকে অনেকেই ঝুঁকছেন। সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং চাকরি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় প্রস্তুতি ও নিয়োগ পেতে দেরি হয়। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেও অনেককে কয়েক বছর বেকার থাকতে হয়। 

যদিও সরকারি চাকরির বাইরে বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতেই বেশি কর্মসংস্থান হয়। সেখানে যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, তার ঘাটতি রয়েছে অনেকের মধ্যে। দক্ষতার অভাব ও শিল্প খাতের উপযোগী গ্র্যাজুয়েট না থাকার কারণে দেখা যাচ্ছে, কর্মসংস্থান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থীর সংকট দেখা দেয়। যে কারণে বেসরকারি খাতে বিদেশিরা কাজ করছে। অথচ দেশে বেকারত্ব তুঙ্গে। তবে বেসরকারি খাতেও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। কারণ দেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি বিনিয়োগ সীমিত।

তবে শিক্ষিতদের বেকারত্ব গ্রহণ করার চাইতে ভালো বিকল্প ছিল উদ্যোক্তা হওয়া। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র এই উদ্যোক্তা হওয়ার পথ কঠিন করে তুলেছে। ইতোপূর্বে লিখেছি, ‘কর্মসংস্থানের সামাজিক বয়ান ভাঙা দরকার’ (সমকাল, ৩০ অক্টোবর ২০২৪)। অর্থাৎ সামাজিক ও পারিবারিক চাপের কারণে উচ্চশিক্ষিতরা চাইলেই যে কোনো পেশা বেছে নেওয়ার সাহস দেখাতে পারেন না। সমাজে ভালো কর্মসংস্থান সম্পর্কে যে বয়ান তৈরি হয়েছে, তরুণ প্রজন্ম সে স্রোতেই গা ভাসাচ্ছে। যে কারণে কৃষি বা ব্যবসায় নামা সম্ভব হচ্ছে না। রাষ্ট্র থেকে ঋণসহ অন্যান্য সহায়তাও তারা সেভাবে পাচ্ছেন না। অথচ যাদের তেমন শিক্ষা নেই তারা চাইলেই অনানুষ্ঠানিক কাজ, দিনমজুরি বা ছোটখাটো পেশায় যুক্ত হয়ে যান। যে কারণে তাদের আনুষ্ঠানিক বেকারের তালিকায় কমই দেখা যায়। 

সরকার শিক্ষিত বেকারত্বের সংকট ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত বলেই নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিবছর ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার করেছে। যদিও সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান নিয়ে আশাবাদ দেখানো হয়নি। তাদের পূর্বাভাস– নিম্নমুখী বেসরকারি বিনিয়োগ, নিষ্প্রভ শিল্প কার্যক্রম এবং জ্বালানি খাতের ধারাবাহিক সংকট কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিকে সীমিত করতে পারে। 

আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য, দেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তরুণদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। তারুণ্যের শক্তির অপচয় হচ্ছে বেকারত্ব ও হতাশায়। শিক্ষিত বেকারদের নিয়ে তাই সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিন্তা করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে হলেও উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিকল্প ভাবতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজালেও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পেতে পারে। পাশাপাশি তরুণদের বেকারত্ব থেকে মুক্তির জন্য নিজেদেরও উদ্যোগী হতে হবে। সময়ের আলোক দক্ষতা, প্রযুক্তির জ্ঞান ও যোগাযোগে ভালো হলে নিজের কর্মসংস্থান করা কঠিন নয়। তারুণ্যের সময় অপচয়ের নয়। শিক্ষিত তরুণদের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। সেভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে বেকারত্ব থেকে মুক্তি মিলবে সহজেই। 

মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]

আরও পড়ুন

×