সমকালীন প্রসঙ্গ
শিক্ষাঙ্গনে মব সন্ত্রাসের রাজনৈতিক তাৎপর্য
খুশী কবির
খুশী কবির
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর জোরপূর্বক পদত্যাগ, মব সহিংসতা, শারীরিক লাঞ্ছনা এবং হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ও সামাজিক টানাপোড়েন থাকলেও এখনকার মতো এমন মব সহিংসতা কিংবা সার্বিক আইনশৃঙ্খলাহীনতার বিস্তার ছিল কিনা, সন্দেহ। ১৯৯১ সাল কিংবা পরবর্তী বিভিন্ন শাসনকালে রাষ্ট্রীয় নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বহাল ছিল।
আমাদের জাতীয় ও সামাজিক জীবনে সাম্প্রতিক সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আর সেটি হলো ‘মব’ বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা। দেশের নানা প্রান্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ রাজপথ– সর্বত্র এক শ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী আইন হাতে তুলে নেওয়ার অশুভ চর্চায় মেতে উঠেছে। সাধারণ নাগরিকরা তো বটেই, এমনকি দেশের সম্মানিত শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষার্থীরাও আজ এই অনভিপ্রেত উচ্ছৃঙ্খলতার শিকার হচ্ছেন। একের পর এক ঘটে যাওয়া মবের ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বর্তমানে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা ভঙ্গুর ও নাজুক।
শিক্ষক, গুরুজন ও গুণীজনের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন করা আমাদের হাজার বছরের আবহমান সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো মানুষের আদর্শ, রাজনৈতিক চিন্তাধারা কিংবা পাঠদানের কৌশল নিয়ে কারও দ্বিমত বা ভিন্নমত থাকতেই পারে। তাই বলে আদর্শগত ভিন্নতার অজুহাতে শিক্ষক বা যে কোনো নাগরিকের ওপর চড়াও হওয়া, জনসমক্ষে শারীরিক বা মানসিকভাবে লাঞ্ছনা কিংবা মব তৈরির মাধ্যমে প্রকাশ্য সহিংসতা চালানো আমাদের মানবিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় নির্দেশ করে।
অথচ বর্তমান সময়ে আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, সামান্য অজুহাতে সংঘবদ্ধ হয়ে মব তৈরি হচ্ছে। তারা মানুষকে হেনস্তা করছে। এমনকি নির্মমভাবে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। তাদের মধ্যে দেশের প্রচলিত আইন, রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান কিংবা ন্যূনতম নৈতিকতার কোনো তোয়াক্কা দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে গভীর চিন্তার বিষয়, এই উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠীর অপকর্মের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রশাসনের এ ধরনের অকার্যকারিতা ও নীরব ভূমিকা আদতে অপরাধীদের আরও বেশি সাহসী করে তুলছে এবং তাদের পরোক্ষ প্রশ্রয় জোগাচ্ছে। ধর্ষকরা খুব সহজে দায়মুক্তি পাচ্ছে। ফলে এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। যখন অপরাধীরা বুঝতে পারে– সংঘবদ্ধ হয়ে যে কোনো অপরাধ করলেও সহজে পার পাওয়া সম্ভব, তখন সমাজে বিচারহীনতার বিষাক্ত সংস্কৃতি স্থায়ী রূপ নেয়। এই সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারা।
যে কোনো একটি দায়িত্বশীল সরকারের প্রথম ও প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা বিধান এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। সরকারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের চরম শিথিলতা সাধারণ নাগরিকদের মনে গভীর অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় যদি দৃশ্যমান তদারকি না থাকে এবং জঘন্য অপরাধের আসামিরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়, তবে অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই মব সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। অবিলম্বে এই সামাজিক ব্যাধি থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দলীয় ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। অপরাধের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রেখে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি। শিক্ষাঙ্গনসহ সমাজের সর্বস্তরে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে না পারলে এই বিশৃঙ্খলা পুরো জাতিকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে।

মবের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে আমাদের তরুণ সমাজ ও নতুন প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে। তবে এটাও বলে রাখা দরকার, বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরাও এখন এ পথে হাঁটছে; বিশেষত রাজনৈতিক পদ-পদবির সুযোগ নিয়ে। চোখের সামনে অপরাধ সংঘটিত হতে দেখেও যখন বিচার হয় না, তখন তরুণদের মনে আইন ভাঙার প্রবণতা তৈরি হয়। তাদের কাছে এই ধারণা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে– ভিড় বা জনসমাবেশ তৈরি করতে পারলে যে কোনো অন্যায় বা সহিংসতাকেই উগ্রতা দিয়ে যৌক্তিক রূপ দেওয়া সম্ভব। এভাবে একটি দেশ বা সমাজ থেকে যুক্তি, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
একই সঙ্গে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে যেভাবে উস্কানি ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা মব তৈরির ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। অনেক সময়ই কোনো একটি অসত্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করে মুহূর্তের মধ্যে জনমানসে হিংসার দাবানল জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব অপপ্রচার প্রতিরোধে সরকারের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের যে তৎপরতা ও মনিটরিং থাকা উচিত ছিল, তার অভাবও স্পষ্ট। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে তাই শুধু রাজপথে নয়, বরং গুজব মোকাবিলায় ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতেও কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কোনো অসৎ চক্র বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে। তবে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কোনো পদক্ষেপ যেন গণবিরোধী হয়ে না ওঠে। সর্বোপরি এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক সচেতনতাও সমানভাবে জরুরি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে রাজপথে নামতে হবে। অপরাধী যে পরিচয় বা মতাদর্শেরই হোক না কেন, তাকে একজন সাধারণ অপরাধী হিসেবে গণ্য করতে হবে। মব তৈরির নেপথ্যে যারা এবং এতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সরকারকেই এ বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি হলো মানবিক মর্যাদা ও আইনের সার্বভৌমত্ব। সেই ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমাদের সব অর্থনৈতিক অর্জন ও সামাজিক অগ্রগতি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
খুশী কবির: মানবাধিকারকর্মী;
সমন্বয়ক, নিজেরা করি
- বিষয় :
- খুশী কবির