ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ইসলাম ও সমাজ

পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক সংস্কৃতি ও ইসলাম

পরিচ্ছন্নতা, সামাজিক সংস্কৃতি ও ইসলাম
×
×

তোফায়েল আহমাদ মাক্কী

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২২ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটি সমাজ কতটা সভ্য ও মানবিক, তা শুধু তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক, আধুনিক শপিংমল, দৃষ্টিনন্দন মসজিদ কিংবা চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো কতটা নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণভাবে পূরণ করা হচ্ছে, সেটিও সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ পরিচায়ক।

দেশের পথে-ঘাটে, বাজারে, বাসস্ট্যান্ডে, অফিস-আদালতে, পর্যটনকেন্দ্রে– এমনকি অনেক বড় মসজিদ ও মার্কেটেও পর্যাপ্ত ও পরিচ্ছন্ন টয়লেট বা ওয়াশরুমের ব্যবস্থা নেই। কোথাও ব্যবস্থা থাকলেও দুর্গন্ধ, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পানি ও সাবানের সংকট, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে মানুষকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনা ও সমৃদ্ধ জনপদের মাঝেও একজন মানুষ যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে চান, তখন কোথায় যাবেন– এই সহজ অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর অনেক সময় আমাদের সমাজের কাছে নেই।

অথচ ওয়াশরুম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক শারীরিক প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িত। এ প্রয়োজন পূরণের জন্য নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন স্থান নিশ্চিত করা মানুষের স্বাভাবিক অধিকার এবং একটি সুস্থ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিক শৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবিক মর্যাদা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ।

ইসলামে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব 
ইসলামে পবিত্রতা নিছক বাহ্যিক সৌন্দর্য কিংবা সামাজিক শিষ্টাচার নয়; এটি ইমান, ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারিদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে, তাদেরও ভালোবাসেন’ (সুরা আল-বাকারা: ২২২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পবিত্রতা ইমানের অর্ধেক’ (সহিহ মুসলিম: ২২৩)।
পবিত্রতার প্রতি ইসলামের গুরুত্ব কত গভীর, তা বোঝা যায় প্রস্রাবের অপবিত্রতা থেকে যথাযথভাবে সতর্ক না থাকার পরিণতি সম্পর্কিত হাদিস থেকে। ইবনু আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, ‘নিশ্চয়ই এ দুজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তাদের এমন কোনো বিষয়ে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না, যা থেকে বেঁচে থাকা কঠিন; বরং তাদের একজন প্রস্রাব থেকে সতর্ক থাকত না, আর অন্যজন চোগলখুরি করত।’ (সহিহ বুখারি: ২১৬, সহিহ মুসলিম: ২৯২)
এই হাদিস আমাদের সতর্ক করে যে পবিত্রতার ব্যাপারে অবহেলা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়; বরং কখনও কখনও তা জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করার ভয়ানক কারণও হতে পারে! 
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের চলাচলের পথ ও বিশ্রামের স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা অভিশাপের কারণ হয়– এমন দুটি কাজ থেকে বেঁচে থাকো।’ সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলো কী? তিনি বললেন, ‘যে মানুষের চলাচলের পথে অথবা তাদের ছায়ার স্থানে মলত্যাগ করে’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৯)।
অতএব, জনসাধারণের চলাচলের পথ নোংরা করা, দুর্গন্ধ ছড়ানো কিংবা অন্যকে কষ্ট দেওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা ইসলামের পরিচ্ছন্নতা ও মানবিকতার শিক্ষার পরিপন্থি। 
মানুষকে শুধু নিষেধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; তার স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

মসজিদ হোক পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার আশ্রয়স্থল 
মুসলিম সমাজে মসজিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি পবিত্রতা, নৈতিকতা ও সামাজিক কল্যাণেরও কেন্দ্র। তাই কোনো মানুষ যখন বাইরে পরিচ্ছন্ন টয়লেট খুঁজে পান না, তখন যেন প্রয়োজনে মসজিদের কাছে এসে সম্মানজনকভাবে সেই সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন– এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চিন্তা আমাদের করা উচিত।
বাস্তবতা হলো, অনেক মসজিদে মুসল্লিদের জন্য সুন্দর নামাজের জায়গা ও উন্নত ওজুখানা থাকলেও টয়লেটের সংখ্যা অপর্যাপ্ত, অথবা সেগুলোর পরিচ্ছন্নতা সন্তোষজনক নয়। অথচ জুমা, তারাবি, ঈদ কিংবা বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মানুষ মসজিদে সমবেত হন। তাদের প্রয়োজন বিবেচনায় পর্যাপ্ত ওয়াশরুম এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
বাংলাদেশে অনেক মসজিদ মার্কেট রয়েছে, যেগুলো থেকে নিয়মিত আয়ও হয়। এসব স্থাপনায় পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনসাধারণের জন্য পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সামান্য ব্যবহার ফি নির্ধারণ করে তা থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বেতন, পানি, বিদ্যুৎ, সাবান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ একদিকে মসজিদ মার্কেটের আয়ের একটি নতুন ও জনকল্যাণমূলক ক্ষেত্র তৈরি করবে, অন্যদিকে নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সমস্যারও বাস্তবসম্মত সমাধানে ভূমিকা রাখবে। 

দানশীলতা, ওয়াকফ ও সদকায়ে জারিয়ার নতুন ক্ষেত্র 

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে চিন্তার দাবি রাখে। আমাদের সমাজে ধনী ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা মসজিদ নির্মাণ, কারুকাজ করা কিংবা এসি লাগানোর জন্য মুক্তহস্তে কোটি কোটি টাকা দান করেন। কিন্তু একটি পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট বা ওয়াশরুম তৈরির জন্য এগিয়ে আসার সংস্কৃতি এখনও সমাজে সেভাবে গড়ে ওঠেনি। অথচ মানুষের মৌলিক ও কষ্টদায়ক প্রয়োজন মেটানোর চেয়ে বড় সদকা বা জনকল্যাণ আর কী হতে পারে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন– ‘আল্লাহর কাছে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক প্রিয় সে ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য অধিক উপকারী’ (আল-মু‘জামুল আওসাত, তাবারানি: ৬০২৬‌)। 

মানুষের চরম বিপদের মুহূর্তে, বিশেষ করে দীর্ঘ পথচারী, অসুস্থ, বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের কষ্ট লাঘবে একটি পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম নির্মাণ বা তার রক্ষণাবেক্ষণে অর্থায়ন করা হতে পারে একটি শ্রেষ্ঠ সদকায়ে জারিয়া। তাই বিত্তবানদের মানসিকতা পরিবর্তন করে এই খাতে দান ও ওয়াকফ করার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা জরুরি। 

পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম– সামাজিক উদ্যোগ ও সম্ভাবনাময় ব্যবসা 

পরিচ্ছন্ন পাবলিক ওয়াশরুমের অভাবকে শুধু একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা উপেক্ষিত থেকে যায়। সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটিকে জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের পাশাপাশি একটি টেকসই ও লাভজনক ব্যবসায়ও রূপ দেওয়া সম্ভব। দেশের বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, বাজার, মহাসড়ক, পর্যটনকেন্দ্র, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল, বড় মসজিদ ও জনসমাগমস্থলে বাণিজ্যিক পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম সেবা চালু করা যেতে পারে। সঠিক ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের উদ্যোগ সামাজিক সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করতে পারে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়াশরুম নির্মাণ করাই যথেষ্ট নয়; সেটিকে নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা সচল রাখা, বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য প্রশিক্ষিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ, নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিষ্কার করার সময়সূচি, নিয়মিত তদারকি এবং ব্যবহারকারীদের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। 

প্রসঙ্গত, নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। নারীদের জন্য পৃথক ওয়াশরুম, প্রবেশপথ ও আশপাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, ওয়াশরুমের ভেতরে কোনো ক্যামেরা বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিঘ্নিত হয়– এমন কোনো ব্যবস্থা রাখা যাবে না। নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ এবং নারীদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা রাখতে হবে। এভাবে পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাকে সমন্বিত করে গড়ে তোলা ওয়াশরুম সেবা নারীদের নির্বিঘ্ন চলাচলে সহায়তা করবে এবং একই সঙ্গে এই ব্যবসায়িক উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা ও সামাজিক মূল্য বৃদ্ধি করবে। অর্থাৎ এই ব্যবসার সাফল্য শুধু অবকাঠামোর ওপর নয়, বরং ধারাবাহিক ও নির্ভরযোগ্য সেবার ওপর নির্ভর করবে।

পরিচ্ছন্নতার সমস্যায় নিজেদের আচরণও দায়ী 

পরিচ্ছন্ন পাবলিক ওয়াশরুমের সমস্যাটি শুধু অবকাঠামোর নয়; বরং আমাদের আচরণ ও মানসিকতারও। আমরা সাধারণত নিজেদের বাড়ির বাথরুম পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকি, কিন্তু পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেই সচেতনতা দেখাই না। পানি অপচয় করি, ময়লা ফেলে রাখি কিংবা ব্যবহারের পর অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় রেখে যাই। অথচ অন্যের জন্যও তেমন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ কামনা করা উচিত, যেমনটি আমরা নিজের জন্য কামনা করি।
ইসলাম মানুষকে শুধু নিজের কল্যাণ কামনা করতে শেখায় না; বরং অন্যের জন্যও নিজের পছন্দের কল্যাণ কামনা করতে শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করে’ (সহিহ বুখারি: ১৩; সহিহ মুসলিম: ৪৫)।
হাদিসের এই শিক্ষা আমাদের জনসাধারণের ব্যবহারের স্থানগুলোর প্রতিও দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। অতএব, আমাদের আচরণে যেন অন্যের কষ্টের কারণ সৃষ্টি না হয়। একটি পাবলিক টয়লেট নোংরা করার আগে ভাবা উচিত আমার মা, স্ত্রী, সন্তান কিংবা বৃদ্ধ বাবা যদি এই স্থানটি ব্যবহার করতেন, তাহলে কি আমি এমন অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ মেনে নিতে পারতাম? 

পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতাই হোক মুসলিম সমাজের পরিচয় 

বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধে ইসলামের প্রভাব গভীর। তাই আমাদের সমাজের বাহ্যিক পরিচয়েও ইসলামের পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার শিক্ষা প্রতিফলিত হওয়া উচিত। 

আমরা যদি বড় বড় মসজিদ নির্মাণ করতে পারি, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা গড়ে তুলতে পারি, প্রশস্ত সড়ক ও আধুনিক শপিংমল তৈরি করতে পারি, তাহলে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পাবলিক ওয়াশরুম প্রতিষ্ঠা করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, পরিকল্পিত উদ্যোগ এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা।

আসুন, পরিচ্ছন্নতাকে শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস কিংবা আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত করি। আমাদের দান-সদকা, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হোক পরিচ্ছন্ন পাবলিক ওয়াশরুম নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ। এটি মানুষের প্রতি সম্মান, ইসলামের পবিত্রতার শিক্ষা এবং একটি সভ্য সমাজের বাস্তব পরিচয়।

তোফায়েল আহমাদ মাক্কী: লেকচারার (খণ্ডকালীন), আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম

 

আরও পড়ুন

×