ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্রে মেয়েরা কোথায় যাবে

নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্রে মেয়েরা কোথায় যাবে
×
×

মো. আবু নাসের

মো. আবু নাসের

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৬ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:৫৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুমিল্লার লালমাইয়ের জগতপুরের ধানক্ষেতে ১৩ বছরের জান্নাতুল তাজমিনের লাশ পাওয়া গেল। পুলিশের ভাষ্য এবং আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, চালক সুমন মিয়া ধর্ষণের পর গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে তাজমিনকে। মৃত্যুর আগে মেয়েটি বাবাকে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল। সেই ঠিকানাই ছিল মেয়েটির মৃত্যুর লোকেশন। এমন হত্যার পরও আমরা কেবল শোক প্রকাশ করেছি। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছি ঠিকই; এর মধ্যে অন্য সংবাদে চোখ সরে গেছে আমাদের। 

তাজমিনের মৃত্যু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কুমিল্লাতেই জুনে নাঙ্গলকোটে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে অটোরিকশায় তুলে রাতভর দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ১৩ বছরের এক কিশোর অপ্রতিমের লাশ মিলেছে। বরুড়ায় ৬ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী এক অটোচালকের বিরুদ্ধে। এর কয়েক দিন আগে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসার নৃশংস হত্যার শোক না কাটতেই এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে সারাদেশে। 

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ধর্ষণের অভিযোগে সাত হাজার ৬৮টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার ৫৬৬। অর্থাৎ এক বছরে নথিভুক্ত ধর্ষণ মামলার সংখ্যা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে, এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ২৩৬ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৭৯ জন, যাদের ৪৭ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। ১৩ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে পাঁচজনকে, আর একজন ধর্ষণের শিকার নারী আত্মহত্যা করেছেন। একই মাসে মব সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৯ জনের। শিশুদের হিসাব আরও ভয়ংকর। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংগঠনটি তিন হাজার ৪৮৭ শিশুর ধর্ষণের তথ্য নথিবদ্ধ করেছে। লোকলজ্জা, ভয়, থানার হয়রানির আশঙ্কায় যেসব ঘটনা চাপা পড়ে যায়, তা এর বাইরে। প্রকৃত চিত্র নিশ্চয় আরও ভয়াবহ।

প্রশ্ন হলো, এত অপরাধের পরও নাগরিক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না কেন? রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল পুলিশ হবে পেশাদার, প্রশাসন হবে নিরপেক্ষ, বিচারব্যবস্থা হবে কার্যকর এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র হবে দৃঢ়। রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অপব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ মুক্তি চেয়েছিল। বাস্তবে মানুষের এ প্রত্যাশার কিছুই পূরণ হয়নি। 

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশ বাহিনী ভেঙে পড়ে। জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে সময় সারাদেশের মোট ৬৩৯টি থানার মধ্যে ৪৫০টি থানা হামলায় ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কয়েকশ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। সে সময় পুলিশ বাহিনীর অসংখ্য সদস্য দিনের পর দিন কর্মস্থলের বাইরে ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেই শূন্যতা পূরণ করার দায়িত্ব ছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের। তারা তা করেনি। ফল হয়েছে মব। রাস্তায় কেউ কাউকে ধরে মারছে, ঘর ভাঙছে, মানুষ মারছে– রাষ্ট্র তাকিয়ে দেখছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মানুষ একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্র ফিরে পাওয়ার আশা করেছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এ সরকারেরও মনোযোগ অন্যত্র। রাজনৈতিক বিরোধীদের ধরপাকড়, মামলা আর দলীয় হিসাব মেটাতে পুলিশ যত ব্যস্ত; ধর্ষক ও খুনিকে ধরতে ততটা নয়। 

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির হার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের মোট ৭৫টি কারাগারে ৪৫ হাজার ১৮৬ জন বন্দি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর কারাগারগুলোয় এক লাখ ছয় হাজারের বেশি মানুষ বন্দি ছিলেন। বলার অপেক্ষা নেই; ২৪-এর পর কারাগারে বন্দির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এইচআরএসএসের হিসাবে, সেপ্টেম্বর মাসে ৬৮টি রাজনৈতিক সহিংসতায় চারজন নিহত ও পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছেন। এভাবে রাজনীতির সংঘাত সামলাতেই যখন দেশের শক্তি ফুরিয়ে যায়, তখন কিশোরীর চিৎকার থানায় পৌঁছায় না। 

ঘটনার পর গ্রেপ্তারকে সাফল্য হিসেবে দেখানোর একটি অভ্যাসও তৈরি হয়েছে। তাজমিন হত্যার ঘটনায় সুমন মিয়া চট্টগ্রাম থেকে ধরা পড়েছে; ভালো কথা। কিন্তু মেয়েটি তো ফিরবে না। রাষ্ট্রের কাজ হলো অপরাধ ঘটার আগে তা প্রতিরোধ করা। নির্জন সড়কে টহল, অটোরিকশার নিবন্ধন ও চালকের তথ্য যাচাই, থানার জরুরি সাড়া, ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার– এর কোনোটিই দৃশ্যমান নয়। দেশে ধর্ষণ মামলার সাজার হার দীর্ঘদিন ধরেই হতাশাজনক। ফলে অপরাধী জানে– ধরা পড়লেও বছরের পর বছর মামলা ঝুলবে আর সাক্ষী ক্লান্ত হয়ে পড়বে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না। তাঁর মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা। পুলিশের আইজি আলী হোসেন ফকিরও জবাবদিহির বাইরে নন। পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে মাঠ পর্যায়ের নিষ্ক্রিয়তার দায় তাঁর। যারা নিরাপত্তা দিতে পারেন না, তাদের পদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। নাগরিকের আস্থা ভাঙলে চেয়ার ধরে রাখা যায় না। আমাদের দেশে উল্টো। এখানে মন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। পুলিশ বলে, তদন্ত চলছে, আর মেয়েরা মরতে থাকে। সরকার যদি এখনই জরুরি ভিত্তিতে বাস্তব পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাবে। এ জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। গণপরিবহন ও সড়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। থানায় নারী ও শিশুবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে হবে। মব সহিংসতায় জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। এগুলো দাবি নয়; রাষ্ট্রের ন্যূনতম কর্তব্য।

ড. মো. আবু নাসের: ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের যোগাযোগ
অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারপারসন
 

আরও পড়ুন

×