সমকালীন প্রসঙ্গ
জমির নিবন্ধনে মান্ধাতা-প্রীতি!
উপজেলা পর্যায়ের সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় যেন পুরেনোকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখেছে।
মুহাম্মদ আবু সাঈদ
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৫৯
মান্ধাতা বহু আগের মানুষ। পৌরাণিক কাহিনির অযোধ্যা নগরের রাজা। রামায়ণ রচনার বহু বছর পরও তাঁরই নাম বলা হয়; বলা হয় ‘মান্ধাতার আমল’। এটা যেন চোখ বন্ধ রেখে অযথা পুরোনোকে আঁকড়ে ধরার অদ্ভুত এক মানসিকতা। যুগ বদলে গেছে। বদলে গেছে মানুষের চাওয়া-পাওয়া, রুচি, বোধ, সংস্কৃতি; যা কিছু ভালো তা গ্রহণ করার প্রবহমান ধারাতে এগিয়ে গেছে সভ্যতা। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় যেন পুরেনোকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখেছে। এটা মান্ধাতাপ্রীতি কিনা–উঠছে সেই প্রশ্ন।
সরকারি দপ্তর থেকে এখন আর হাতে লেখা কাগজ তেমন সরবরাহ করা হয় না। এমনকি গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষেরাও কোথাও সাধারণত হাতে লেখা চিঠি বা আবেদন জমা দেন না। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে আপনি পাবেন হাতে লেখা কাগজ। দলিলের ‘নকল’ উঠাতে গেলে পাবেন এমন হাতের লেখা যা অনেক সময় ঠিকমতো পড়া যায় না।
একসময় কার্বন পেপার দিয়ে একাধিক কপি করা হলেও এখন ক্ষেত্রবিশেষ ছাড়া সেটি কেউ ব্যবহার করেন না। কারণ ফটোকপি মেশিন এখন গ্রামের দোকানেও পাওয়া যায়। অথচ নিবন্ধিত দলিলের কপি একজন দেখে দেখে বালাম বইতে ওঠান, আরেকজন সেটি পাঠ করেন, আরও একজন সেটি যাচাই করে দেখেন ঠিক আছে কিনা। বালাম বইতে উঠলে তারপর আপনি পাবেন মূল দলিল। এক্ষেত্রে দাতা-গ্রহীতা একাধিক কপি নিয়ে আসতে পারতেন, প্রয়োজনে ফটোকপি করে যাচাইয়ের মাধ্যমে স্বাক্ষর দিয়ে সেটা দেওয়া যেত। কিন্তু আইন-বিধিতে পরিবর্তন এনে সেটি করা হয়নি। এটি তো গেল অনলাইন ছাড়াই কীভাবে কয়েক দশক আগেও নিবন্ধন করা যেত সেটি। মূল আলোচনা করতে চাই জমির নিবন্ধনের অনলাইন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে। তার আগে ভূমিব্যবস্থাপনায় নামজারির বিষয়ে আসি। একজন ব্যক্তি জমি পাওয়ার পর দলিল নিবন্ধন করলে হয়ে যান জমির মালিক। সরকারের রেকর্ড হালনাগাদ করে তাঁর নাম যুক্ত করতে হয়। এটিই নামজারি।
আবেদন করা হলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে দেন। সরেজমিনে পরিদর্শনসহ প্রতিবেদন দিলে সংশ্লিষ্টদের শুনানি করে নতুন খতিয়ান সৃষ্টি করা হয়। সেই কপি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলে নতুন মালিকের নামে ভূমি উন্নয়ন কর নেওয়া হয়। কয়েক ধাপের এ প্রক্রিয়া যেখানে প্রায় এক যুগ আগে থেকেই অনলাইনে হচ্ছে, সেখানে জমি নিবন্ধন এখনও অনলাইনে হয়নি। অথচ নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনেকটা ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’-এর মতো। দলিল দাখিল করা হলে সংযুক্ত কাগজপত্র দেখে অনুমোদন দেওয়াই মূল কাজ। এ ধরনের সেবার প্রক্রিয়াতেও নিবন্ধন পুরোনো পদ্ধতিতে হচ্ছে; যা গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ জমি কিনতে গেলে জানতে চান, এই জমি আরও কারও কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কিনা। নামজারি না হয়ে থাকলে এই তথ্য সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় ছাড়া অন্য কোথাও নেই। দলিল দেখে দেখে সেই তথ্য বের করা অত্যন্ত কঠিন।
অথচ সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২-এর ৩ ধারা অনুযায়ী নিবন্ধিত দলিলকে নোটিশ হিসেবে গণ্য করা হয়। জমি আগেই হস্তান্তর করা হয়েছে, আপনি নতুন ক্রেতা সেটি জানেন না; তাহলে সেই দোষ আপনার। এই দোষ নিয়ে জমির মালিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন দিন দিন। সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে জমি কিনেছেন, কিন্তু দেখলেন দু’দিন আগে সেটি বিক্রি করা হয়েছে। ৫০ বছর আগের একটি দলিলে আপনার বাবার জমি ছিল; কিন্তু বালাম বই কে বা কারা ঘষামাজা করে দাগ নম্বরটি পরিবর্তন করেছেন। ভূমিব্যবস্থাপনাতেও এই সমস্যা ছিল। এখন তেমনটা নেই। রেকর্ড বা নামজারির অনেক তথ্য অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় শত বছর আগের কাগজও আপনি পাবেন অনলাইনে। যদিও এক্ষেত্রে কিছু অভিযোগ রয়েছে। সে-কারণে চালু হয়েছে অনলাইনে ভূমি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা। যেকোনো ব্যক্তি অনলাইনে অভিযোগ জানাতে পারেন। যথাসময়ে নিষ্পত্তির বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ে বসেও নজরদারি করা যায়। নামজারি আবেদন ও ভূমি উন্নয়ন করও দিতে পারবেন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে। আপনার আবেদনটি কোথায় আছে, কার কাছে কতদিন ধরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় আছে-–সেটিও জানতে পারবেন মুহূর্তেই। অথচ এই যুগেও আপনাকে মূল দলিল পেতে হয় কয়েক বছরে, দলিলের নকল নিতে হয় হাতের লেখা অক্ষরে, আপনি জানতে পারেন না আপনার কিনতে যাওয়া জমি আগে কারও কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কিনা, আপনাকে দলিল সম্পাদন করতে হয় তৃতীয় পক্ষকে ধরে। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে জমির নিবন্ধনে যে ‘মান্ধাতাপ্রীতি’ চলছে, জনসাধারণ সেটা বললে কী ভুল হবে?
পত্রিকার খবরে জানা গেছে, ২০২১ সালে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়; তাতে ১৭টি উপজেলায় পাইলট আকারে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছিল। সেই সফটওয়্যার প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ, প্রকল্পের নিয়োগ পাওয়া লোকজনও আর নেই। সম্প্রতি আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আগের প্রকল্প ব্যর্থ হয়ে থাকলে সেটির কারণ অনুসন্ধান ছাড়াও নতুন প্রকল্প যাতে সফল হয় সেই লক্ষ্যে ব্যবস্থাগ্রহণ জরুরি। কারণ, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সময়েও পুরোনো পদ্ধতিতে জমির নিবন্ধন নেতিবাচক বার্তা দেয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়্যাব তাঁর ‘দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন’ গ্রন্থে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সুফল থেকে পৃথিবীতে শতকরা কত ভাগ মানুষ বঞ্চিত সেই চিত্র তুলে ধরেছেন।
সুফলভোগীর এই তারতম্যের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থানগতসহ নানা কারণ রয়েছে। কিন্তু একই দেশে একই সেবাপ্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘দ্বৈততা’ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভূমির ব্যবস্থাপনা ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া একই ছাতার নিচে আনার বিষয়টি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ২০২৩ সালে একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গাইবান্ধা সদর উপজেলায় সে সময়কার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রেজাউল করিম ১০ হাজার ২১৪ জন নামজারি আবেদনকারীর মধ্যে জরিপ করেন। তাতে দেখা যায়, দলিলে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি বিক্রি ১৫ শতাংশ, শ্রেণির ভুল ১১ শতাংশ, দাগের ভুল ৬ শতাংশ, খতিয়ান নম্বরের ভুল ২ শতাংশ, দাতার নামে ভুল ৩ শতাংশসহ মোট ৭৯ ভাগ আবেদনকারীর কাগজপত্রে ত্রুটি রয়েছে। দলিল নিবন্ধন ও নামজারি-–একই সেবার এ দুটো অংশ একই প্ল্যাটফর্মে না থাকায় দলিল ও নামজারিতে এ-ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, আর ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অনলাইন ব্যবস্থাপনা চালু হলে দলিল লেখক ও বালাম লেখকদের এলএসএফসি (ল্যান্ড সার্ভিস ফ্যাসিলিটেটিং সেন্টার) অর্থাৎ ইতোমধ্যে চালু হওয়া ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্রের মতো লাইসেন্স দিয়ে আলাদা ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সিস্টেমের পরিবর্তন না হলে শুধু লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলির বিষয়টি হয়রানি কমাতে পারবে না। বরং তুলনামূলক কম দক্ষরা বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। আমরা চাই, পরিস্থিতির উন্নতি হোক। নিবন্ধন ও নামজারি একই প্ল্যাটফর্মে এলে এক শ্রেণির ভূমিমালিকদের তথ্য সহজে প্রকাশযোগ্য হয়ে তাদের ‘ক্ষতি’ হবে ঠিকই, কিন্তু উপকৃত হবেন জনসাধারণ। আমরা চাই, ছোট এই দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী সীমিত ভূমির সঠিক সেবা পাবেন, মুক্ত থাকবেন সব ধরনের হয়রানি থেকে।
মুহাম্মদ আবু সাঈদ: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়