ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

স্মরণ

লালনের মানবতাবাদ

লালনের মানবতাবাদ
×
×

ইউসুফ আলমগীর

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

মহাত্মা ফকির লালন শাহ এ উপমহাদেশ বিশেষত বাংলার লোকসংস্কৃতির এক মহাসাধক। তাঁর গান ও দর্শন শুধু আধ্যাত্মিক সাধনা নয়; বরং সমাজব্যবস্থা, জাতি-ধর্ম-বিভেদ এবং মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে একটি ধ্রুব নীতি। কেবল ঐতিহাসিক পুরোনো সম্পদ হিসেবে নয়, বর্তমান যুগের বিষণ্নতা, শত্রুতার রাজনীতি, আধুনিক বিভাজনের সময়ে লালনের বাক্য-মানুষকেন্দ্রিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও অন্তর্দর্শী আত্ম-অন্বেষণে একটি কার্যকরী প্রতিধ্বনি হিসেবে কাজ করে।

এই প্রজন্মে এসেও লালনের দর্শন ও গানের উপাদানগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ উঠছে। বিশেষত বাঙালি জীবনের ক্রান্তিকালে, যখন ‘শত্রু’ নির্মাণ করে সামাজিক সুতা ছিন্ন করা হচ্ছে! লালনের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ‘মানুষ’–এটি শুধু নৈতিক উচ্চশিক্ষার বক্তব্য মাত্র নয়; তাঁর আধ্যাত্মিক ও নৈতিক প্রস্তাবনার মূল চাবি। লালন বলে ওঠেন–‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। সেই সারল্যেই তাঁর মুক্তির রূপরেখা আছে: ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’–এখানে ‘ভজনা’ কোনো ভাবপূর্বক বিধান নয়; বরং প্রত্যক্ষ মানুষের প্রতি প্রেম, সহমর্মিতা ও আত্মচিন্তার মাধ্যম। 

লালনের ‘গুরুবাদী’ আধ্যাত্মিকতা যেভাবে তিনি ব্যাখ্যা করেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। গুরু আর রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এক নয়; মানুষই হলো গুরু অর্থাৎ মানব-আচরণকেই ধ্যান-উপাসনার কেন্দ্র বানাতে বলেন তিনি। ‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, সর্ব সাধন সিদ্ধি হয় তার...’। এখানে লালন ‘গুরু’কে অভ্যন্তরীণ মানবত্বের প্রতীক করেন; গুরুরূপ মানুষই মুক্তির দিশা। ফলে আধ্যাত্মিকতা হতে পারে নিরপেক্ষ, ব্যক্তিভিত্তিক ও সমঅধিকারপ্রধান। 

লালনের কাব্যভাষা সরল হলেও তত্ত্বগতভাবে গভীর। তাঁর ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ রূপকতা দেহ ও আত্মার দ্বৈতাবস্থা বোঝাতে অসাধারণ: ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়?/ তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়।’ এই চিত্রে দেহকে খাঁচা, প্রাণকে পাখি এবং জীবনের উদ্দেশ্য সেই অচিন পাখিকে চিনে তাকে মুক্ত করা। কিন্তু লালন সে মুক্তি কেবল বিমূর্ত ভাবনায় দেননি; তাঁর গান মনে করিয়ে দেয় যে দেহের খাঁচা ভাঙার পূর্বশর্ত হলো মানুষের মধ্যে মানবিকতা, আত্মচিন্তা ও প্রেমের অনুশীলন। এই দার্শনিক বিমূর্ততার সঙ্গে বাউল-কথ্যশৈলীর সরলতা মিশে লালনের গানকে সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলে। এতে তিনি বুদ্ধিজীবী ও গ্রামীণ শ্রোতা দুদিকে একই ভাষায় কথা বলেন। 

লালনের সমাজবিরোধিতা অথবা সমাজসংস্কারের রূপরেখা সরাসরি রাজনৈতিকও বটে। তবে সেটি মোরাল ও আধ্যাত্মিক ভাষায় উপস্থাপন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণকাল ও ধর্মীয় বিভাজনের সময় লালন শুধু তির্যক নন; সে সময়কার সাম্যহীনতা, গোঁড়া কুসংস্কারের প্রতি তাঁর ছিল বলিষ্ঠ উচ্চারণ। ‘জাত গেল জাত গেল’ কটাক্ষে তিনি জাতি-ধর্মের পবিত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তাঁর আক্রমণ ছিল মূলত মানবতার উচ্চতর আদলে–ঘটনাটি কেবল ধর্মীয় ইস্যু নয়; এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক এক বিশাল সমালোচনা। ফলে লালন এখনকার ‘শত্রু-শত্রু’ খেলায়–যেখানে রাজনীতি, মিডিয়া বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী প্রতিবেশীকে শত্রু বানায়, সেখানে একটি নৈতিক প্রতিকাররূপে কার্যকর। 

লালনের গান শুধু নীতিগত বাণী নয়; তাঁর ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা ও স্থূল জীবন অনুশীলন থেকে উদ্ভূত। তাই তাঁর কথায় আছে–‘সত্য বল, সুপথে চল’। এ ধরনের বাণী আত্ম-উন্নয়ন ও সামাজিক নৈতিকতার ওপর জোর দেয়। লালন নিজে নিরক্ষর ছিলেন কিন্তু তাঁর ভাবনা ভাষা ও গীতিকথন এতটাই সংকলিত ও জটিল যে শিক্ষিত পণ্ডিতরাও মুগ্ধ হয়েছেন; লালনের ভাবধারা লোকজ ও উচ্চশিক্ষিত জগৎ দুটি ছাড়িয়েও বিস্তৃত। 

বাংলার অন্দরে প্রতীয়মান সংস্কৃতিগত বিভাজন, রাজনৈতিক ধর্মীয় উস্কানি বা সাংস্কৃতিক ‘টেকনিক্যালি’ বিভেদের বন্ধুর সময়েও লালনের অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা জনবিক্ষোভ ও সংহতিতে এক মানসিক সমর্থন দেয়। 
বঙ্গভূমির ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আজ যখন গোটা সমাজ ‘শত্রু তৈরি’ ও বিভাজনের রাজনীতি দেখে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন লালনের বার্তা মানুষকে প্রেম করতে শেখায়, ভেদাভেদ ভুলে মানবিক চরিত্র প্রতিষ্ঠা করে।
 
ইউসুফ আলমগীর: সভাপতি, লালন একাডেমি, কুড়িগ্রাম
[email protected]

আরও পড়ুন

×