উন্নয়ন
ঘর যেখানে শুধু জীবন বাঁচায় না, মর্যাদাও বাড়ায়
একেএম নুরুজ্জামান
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে আবাসন ঋণের চাহিদা অনেক। কিন্তু ছোট অঙ্কের ঋণ বাণিজ্যিক ব্যাংক দিতে চায় না। ব্যাংক চায় জমির দলিল ও বন্ধক, গরিব মানুষের যা থাকে না। এ অবস্থায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে শুরু করে ‘লো-ইনকাম কমিউনিটি হাউজিং সাপোর্ট প্রজেক্ট’ (এলআইসিএইচএসপি)। সহজ শর্তের এ ঋণে বন্ধক লাগে না। মেয়াদ প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণের তুলনায় দীর্ঘ, সুদ কম। সাতটি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ১৩টি শহরে আবাসন ঋণ দেওয়া হয়। ২০২১ সালের মে পর্যন্ত ১২ হাজার দুজন সদস্য ২৫৫ কোটি টাকা ঋণ পান। ৫৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ ঋণ গেছে স্বল্প আয়ের পরিবারে (যাদের মাসিক আয় ২৫,০০০ টাকা), যদিও লক্ষ্য ছিল ৪০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের মিশন প্রকল্পটিকে ‘অত্যন্ত সন্তোষজনক’ বলেছে। বাংলাদেশে এটি বিশ্বব্যাংকের দেওয়া সর্বোচ্চ রেটিং।
প্রকল্পটির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পিকেএসএফ ২০১৯ সালে নিজস্ব তহবিলে চালু করে ‘আবাসন ঋণ’ কর্মসূচি। জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৪২টি জেলার ১৬০টি উপজেলায় ৫২ হাজার ১৮৪টি পরিবার ঋণ পেয়েছে। বিতরণ হয়েছে প্রায় এক হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা।
ঘর কি দারিদ্র্য কমায়? পিকেএসএফ দেখেছে: ঘর পরিবারকে সমাজে পরিচিতি দেয়, নারীর ক্ষমতায়ন করে। নিরাপদ ও নিরিবিলি ঘর তাঁর মর্যাদা রক্ষা করে। ঘরের মালিকানা বা যৌথ মালিকানা থাকলে তাঁর দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে। ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস থাকলে শিশুর পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হয়। বন্যায় বা সাইক্লোনে ঘর মেরামত করতে না হওয়ায় টাকা চলে যায় সন্তানের শিক্ষায়। স্যাঁতসেঁতে ও ঘিঞ্জি ঘরে না থাকতে হওয়ায় স্বাস্থ্যের সুরক্ষা বাড়ে। গরিবের বড় সম্পদ ঘর, যা থেকে গড়ে ওঠে আরও সম্পদ। ঘর কর্মসংস্থান তৈরি করে। রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, শ্রমিক ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায়ী আয় করেন। অনেকের ঘরে চলে সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন বা ছোট দোকান।
বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু ঝুঁকির দেশ। উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা। উত্তরাঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙন। দরকার তাই সাধারণ ঘর নয়, জলবায়ু-সহনশীল ঘর। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (জিসিএফ) অর্থায়নে চলছে ‘রেজিলিয়েন্ট হোমস্টেড অ্যান্ড লাইভলিহুড সাপোর্ট টু দ্য ভালনারেবল কোস্টাল পিপল অব বাংলাদেশ’ (আরএইচএল) প্রকল্প। এর লক্ষ্য খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা ও কক্সবাজারের ২১টি উপজেলায় তিন হাজার বসতভিটা গড়া, যেখানে থাকবে উঁচু ভিটা, শক্ত কাঠামো, নিরাপদ স্যানিটেশন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ ও উন্নত চুলা। দুই লাখ ৫০ হাজারের বেশি ঝড়-প্রতিরোধী গাছ ইতোমধ্যে লাগানো হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় সাত জেলায় ৫০ হাজারের বেশি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত করলেও আরএইচএল ঘরে নিরাপদ ছিল ৭০০ পরিবার। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্পে অটুট ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনির ইটের ঘর।
ঘরের পাশাপাশি আছে উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তা। উঁচু মাচায় ছাগল-ভেড়া পালন, লবণসহিষ্ণু সবজি চাষ, বস্তায় আদা চাষ ও কাঁকড়া চাষে সহায়তা। ২০২৫ সালে ছয় হাজার ১৮৮ জন আদা চাষি প্রায় তিন কোটি ৬০ লাখ টাকা আয় করেছেন।
উত্তরাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ এলাকায় একই দর্শন নিয়ে কাজ করেছে ইসিসিসিপি-ফ্লাড। জিসিএফ ও পিকেএসএফের মোট ১৩ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প চলেছে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও জামালপুরে। এ পর্যন্ত ১৫ হাজার ৫৬৩টি ভিটা আগের সর্বোচ্চ বন্যার উচ্চতার ওপরে উঁচু করা হয়েছে। ভিটার ওপর বসেছে নলকূপ ও জলবায়ু-সহনশীল পায়খানা। ফলে সারাবছর নিরাপদ পানি মিলছে। একই সঙ্গে বন্যা-সহনশীল ধানের বীজ দেওয়া হয়েছে। চরে সবজি চাষের প্রশিক্ষণ হয়েছে। প্রায় দুই হাজার মাচা-ঘর তৈরি করে ছাগল-ভেড়া পালনে ঋণ দেওয়া হয়েছে। নারীপ্রধান পরিবার পেয়েছে অগ্রাধিকার। একই ধরনের সিসিসি প্রকল্পে ৫৭৫৯টি ভিটা উঁচু করা হয়েছে।
এখন আসছে নতুন সম্ভাবনা, আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ। এডিবি দিচ্ছে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ। এর অধীনে ২০৩১ সালের মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার পরিবার আবাসন ঋণ পাবে, যাদের অন্তত ৩২ হাজার নারী। অন্তত ২৪ হাজার ঋণগ্রহীতা থাকবেন দুর্যোগপ্রবণ এলাকায়। বন্ধকহীন ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। নারীর আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হবে।
একটি ঘর একসঙ্গে নিজস্ব পরিচয়, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সম্পদ ও কর্মসংস্থান গড়ে তোলে। জলবায়ু সহনশীল ঘর সেই অর্জনকে দুর্যোগের হাত থেকেও বাঁচায়। আবাসনব্যবস্থা উন্নয়নে তারপরও রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। চাহিদার তুলনায় তহবিল কম। নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ছে। জলবায়ুর ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই চাই আরও উপযুক্ত বিনিয়োগ। চাই সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও সহযোগী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ।
ড. একেএম নুরুজ্জামান: সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক, পিকেএসএফ
- বিষয় :
- উন্নয়ন