কাঠামোগত হত্যা
কক্সবাজারের আগুন কি পরিকল্পনাহীনতার ফাঁদ
ইফতেখারুল ইসলাম
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
শনিবার বেলা ১১টা নাগাদ কক্সবাজারের ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি এক রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০ জনের নির্মম মৃত্যু এবং একাধিক পর্যটকের গুরুতর দগ্ধ হওয়ার ঘটনা অসংখ্য মানুষের মনকে ব্যথিত করেছে। ছুটির আনন্দে অবকাশ যাপনে গিয়ে একের পর এক তাজা প্রাণের ছাই হয়ে যাওয়া প্রতিটি পরিবারের সারাজীবনের জন্য ট্রমা। আরও দুঃখের ব্যাপার হলো, বিশেষত নগরাঞ্চলে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরও এর সংখ্যা কোনোভাবেই কমছে না। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে বহু প্রশ্ন সামনে আসে।
ইতোমধ্যে যেসব অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেছে, সেগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফায়ার সেফটি বা এ ধরনের ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে তদারকির ভয়াবহ ঘাটতি। দেশের বাণিজ্যিক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। অথচ জীবন রক্ষাকারী এসব উদ্যোগে মালিকপক্ষের অনীহা। ফলে অগ্নিকাণ্ডের মতো এ ধরনের ঘটনা কি আকস্মিক ‘দুর্ঘটনা’ নাকি ‘কাঠামোগত হত্যা’– এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক।
প্রযুক্তিবিশ্ব এখন বেশ উন্নত। রিসোর্ট, শপিংমল কিংবা গার্মেন্টস কারখানার মতো জনবহুল ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর জন্য রয়েছে উৎকৃষ্ট অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। যেমন– স্মোক ও হিট ডিটেক্টর, ফায়ার এক্সটিংগুইশারের পাশাপাশি রয়েছে স্প্রিংকলার সিস্টেম, যা ছাদের নিচে বসানো নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছালে (যেমন ৬৮° সে.) গ্লাস বাল্ব ভেঙে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছিটাতে শুরু করে। দেশের বহু সরকারি, বেসরকারি ভবনে এসব নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়নি, যদিও প্রকল্পগুলোতে তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করেছেন।
ফায়ার সার্ভিস আইনে ছয়তলার ওপরে ভবনকে বহুতল ধরা হয়। তবে ১০ তলার নিচের ভবনকে বহুতল হিসেবে বিবেচনা করে না রাজউক। এতে ১০ তলা পর্যন্ত সব ভবনের নির্মাণ পরিকল্পনা রাজউকের অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছাড়াই (এখন টিভি, ৭ মার্চ ২০২৪)। ২০২৫ সালে সারাদেশে ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবন পরিদর্শন করে তিন হাজার ৯৩৮টি ভবন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। এর মধ্যে ৬২২টি ভবন ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ (বাসস, ৪ অক্টোবর ২০২৬)।
কক্সবাজারের কাঠের রিসোর্ট, রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের বহুতল শপিংমল কিংবা তৈরি পোশাক কারখানা– স্থান ও প্রেক্ষিত ভিন্ন হলেও এসব অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্য কারণগুলো অভিন্ন। প্রাথমিক তদন্তে প্রায়ই দেখা যায়, রান্নার চুলাজনিত অবহেলা, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং, শর্টসার্কিট কিংবা গ্যাস লিক থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে এগুলো কেবল আগুনের উপক্রম মাত্র; আসল বিপর্যয় তৈরি করে অবকাঠামোগত নকশা ও সুরক্ষা ব্যবস্থার চরম অভাব। ইনানীর মতো আধুনিক ও জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে কাঠের তৈরি রিসোর্টগুলোতে নান্দনিকতার দিকে যতটা নজর দেওয়া হয়, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার দিকে তার সিকিভাগও নজর দেওয়া হয় না। শপিংমল ও গার্মেন্টস ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়।
শপিংমল ও রিসোর্ট মালিকদের প্রধান লক্ষ্য থাকে স্বল্প খরচে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন। কাঠের তৈরি কটেজ দেখতে দৃষ্টিনন্দন হলেও সেখানে অগ্নিনিরোধক প্রলেপ প্রয়োগ কিংবা বিকল্প নিরাপদ নকশা অনুসরণ না করা বাণিজ্যিক মানসিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে কারখানাগুলোতে ফায়ার ড্রিল বা অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণকে কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা দৃশ্যমান।
পর্যটন এলাকা বা ঘিঞ্জি শহরগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের পর্যাপ্ত ইউনিট না থাকা এবং অগ্নিকাণ্ড ঘটলে পানির অপ্রতুলতা ও যাতায়াতের সরু পথ উদ্ধারে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইনানীর ঘটনার সময়ও দেখা গেছে স্থানীয় বাসিন্দারা ও পুলিশ প্রাথমিক উদ্ধারকাজ না চালালে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বহুগুণ হতে পারত।
প্রতিটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠন, রিপোর্ট তৈরি ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়। বাস্তব চিত্রে কোনো পরিবর্তন আসে না। ইনানী, তাজরীন কিংবা বঙ্গবাজারের ছাইচাপা দীর্ঘশ্বাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জরুরি কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া প্রতিটি বাণিজ্যিক ভবন একেকটি সম্ভাব্য শ্মশান।
দেশের বেশির ভাগ রিসোর্ট, হাসপাতাল, শপিংমল কিংবা গার্মেন্টস হাউসে কোনো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রেখে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ডের মতো যেসব ঘটনা ঘটে, তা সরাসরি ‘কাঠামোগত হত্যা’। দেশে বহুবার এ ধরনের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, কিন্তু বিভিন্ন সময়ের ক্ষমতাসীন সরকার তাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। দেশে বহুবার এ ধরনের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, কিন্তু বিভিন্ন সময়ের ক্ষমতাসীন সরকার তাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে এসব কাঠামোগত হত্যার ‘কারিগররা’ বিভিন্নভাবে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা লঘু কিংবা গুরু দায়মুক্তি পান। এই দায়মুক্তি ও জবাবদিহির অভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক কাঠামোগত হত্যা ঘটেই চলেছে। শহর-ইনানীজুড়ে যেভাবে আইনের তোয়াক্কা না করে রেস্টুরেন্ট ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, তার দায় পৌরসভা, কউক, জেলা প্রশাসন এড়িয়ে যেতে পারে না।
উন্নয়নের ফাঁদে পড়ে ইতোমধ্যে আমরা ঢাকাকে অবাসযোগ্য তালিকার শীর্ষে নিয়ে এসেছি। গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি যে পথে হাঁটছে, তাতেও নতুন কিছু দেখা যাচ্ছে না। বরং উন্নয়নের একই গল্পের ফাঁদ! কক্সবাজারে ‘উন্নয়ন’-এর নামে এই সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। জাপানি সংস্থা জাইকার ফান্ডে কক্সবাজার পৌরসভা সিবিচ বালিয়াড়িতে এক সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করেছিল, যা স্থানীয় পরিবেশের জন্য ভয়াবহ রকমের ক্ষতি বয়ে আনবে। হাইকোর্টের এক রায়ে কাজ স্থগিত করা হয়েছে, যা আপিল বিভাগেও বহাল। আবার চকরিয়া-মহেশখালী এলাকায় বন উজাড় করে তৈরি করা হচ্ছে আরেকটি সড়ক। ঢাকা, চট্টগ্রামের পাশাপাশি উপশহরগুলোতেও উন্নয়নের নামে এসব প্রকল্প হচ্ছে। কক্সবাজারও কি নিকট ভবিষ্যতে অবাসযোগ্য তালিকায় নাম লেখাবে– সে প্রশ্ন তৈরি হয়।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক,
দৈনিক সমকাল
- বিষয় :
- ইফতেখারুল ইসলাম